পেশ করছি পরবর্তী পর্ব।
কেস ৪: অঘোরী রুদ্রের ছায়া
পর্ব ৬৩: শিকারি
রাত নেমে এসেছে।
শহরের রেলওয়ে কন্ট্রোল ইয়ার্ড প্রায় জনশূন্য।
দূরে সারি সারি মালবাহী বগি।
মাঝে মাঝে ইঞ্জিনের ধাতব শব্দ নীরবতাকে ভেঙে দিচ্ছে।
মেহেদী ধীরে ধীরে ইয়ার্ডের ভেতরে প্রবেশ করল।
দেখতে মনে হচ্ছে সে একাই এসেছে।
কিন্তু বাস্তবে...
চারপাশে দূর থেকে নজর রাখছে মারুফের দল।
---
মেহেদী নিজের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বলল,
"সব ইউনিট প্রস্তুত?"
কানে থাকা ছোট ইয়ারপিসে মারুফের কণ্ঠ ভেসে এল।
"সবাই অবস্থানে আছে।"
"তবে আমরা তোমার নির্দেশ ছাড়া এগোব না।"
---
মেহেদী সামনে এগিয়ে গেল।
একটি পরিত্যক্ত কন্ট্রোল ভবনের সামনে এসে থামল।
ভবনের দরজা খোলা।
ভেতরে অন্ধকার।
ঠিক তখনই স্পিকারে একটি পরিচিত কণ্ঠ শোনা গেল।
ড. কামরান হক।
"স্বাগতম, মেহেদী।"
"তুমি এসেছ।"
---
মেহেদী শান্ত গলায় বলল,
"তুমি জানতেই আমি আসব।"
---
"অবশ্যই।"
"কারণ তুমি কৌতূহলী।"
"আর কৌতূহলী মানুষ সব সময় শেষ দরজাটা খুলে দেখে।"
---
মেহেদী কোনো উত্তর দিল না।
সে ধীরে ভবনের ভেতরে ঢুকল।
ঘরটি ফাঁকা।
মাঝখানে একটি দাবার বোর্ড।
দুটি চেয়ার।
বোর্ডে সব গুটি সাজানো।
কিন্তু একটি মাত্র কালো গুটি নেই।
কালো রাজা।
---
টেবিলের ওপর একটি চিঠি।
মেহেদী খুলে পড়ল।
«"তুমি যদি এই চিঠি পড়ে থাকো, তাহলে বুঝব তুমি এখনো পর্যবেক্ষণ করছ।
এখন চারপাশে তাকাও।"»
---
মেহেদী ধীরে মাথা তুলল।
চারদিকে অসংখ্য আয়না।
প্রতিটি আয়নায় তারই প্রতিচ্ছবি।
কিন্তু...
সব প্রতিচ্ছবি এক রকম নয়।
কোনোটিতে সে দাঁড়িয়ে আছে।
কোনোটিতে হাঁটছে।
কোনোটিতে মাথা নিচু।
---
মিতুর কণ্ঠ ইয়ারপিসে ভেসে এল।
"মেহেদী, সাবধান।"
"আয়নাগুলো সাধারণ আয়না নয়।"
"কিছুতে একমুখী কাচ ব্যবহার করা হয়েছে।"
---
মেহেদী ধীরে বলল,
"অর্থাৎ..."
"কেউ আমাদের দেখছে।"
---
হঠাৎ ঘরের এক কোণে একটি হাততালি শোনা গেল।
ঠাস!
ঠাস!
অন্ধকার থেকে একজন মানুষ বেরিয়ে এল।
মুখোশ নেই।
কালো কোট পরা।
চোখে শান্ত দৃষ্টি।
ড. কামরান হক।
---
তিনি মৃদু হেসে বললেন,
"অবশেষে সামনাসামনি দেখা হলো।"
---
মারুফ ইয়ারপিসে চিৎকার করলেন,
"মেহেদী! আমরা ঢুকছি!"
---
"না!"
মেহেদী সঙ্গে সঙ্গে থামাল।
"কেউ ভেতরে আসবে না।"
---
কামরান হেসে বললেন,
"ভালো।"
"আমি জানতে চেয়েছিলাম..."
"...তুমি এখনও নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নাও কি না।"
---
মেহেদী তার দিকে তাকিয়ে বলল,
"এই সব হত্যাকাণ্ড কেন?"
---
কামরানের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
"আমি কাউকে হত্যা করতে চাইনি।"
"আমি শুধু..."
"...একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিলাম।"
---
"কোন প্রশ্ন?"
---
"যদি একজন মানুষের চিন্তাভাবনা বদলে দেওয়া যায়..."
"...তাহলে কি তার ভাগ্যও বদলে দেওয়া যায়?"
---
মেহেদী দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
"মানুষ কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষার বস্তু নয়।"
---
কামরান ধীরে মাথা নাড়লেন।
"এই উত্তরটাই আমি তোমার কাছ থেকে আশা করেছিলাম।"
---
ঠিক তখনই ঘরের সব আলো নিভে গেল।
সম্পূর্ণ অন্ধকার।
মাত্র তিন সেকেন্ড।
তারপর আলো ফিরে এল।
কিন্তু...
কামরান নেই।
চেয়ার খালি।
দরজা বন্ধ।
কেউ বের হওয়ার শব্দও শোনা যায়নি।
---
মেহেদী চারদিকে তাকাল।
তারপর দাবার বোর্ডের দিকে চোখ পড়তেই থেমে গেল।
আগে যে কালো রাজা গুটিটি ছিল না...
এখন সেটি বোর্ডের মাঝখানে রাখা।
তার নিচে একটি ছোট কাগজ।
মেহেদী কাগজটি খুলল।
তাতে লেখা।
«"তুমি আমাকে খুঁজে পাওনি, মেহেদী।"»
«"আমি-ই তোমাকে খুঁজে পেয়েছি।"»
ঠিক সেই মুহূর্তে ইয়ারপিসে মারুফের আতঙ্কিত কণ্ঠ ভেসে এল।
"মেহেদী!"
"তাড়াতাড়ি বের হও!"
"থানায় হামলা হয়েছে!"
মেহেদীর বুক কেঁপে উঠল।
কারণ...
থানাতেই রাখা আছে Project Mirror-এর আসল ফাইল, হার্ডড্রাইভ, আর এই তদন্তের সব প্রমাণ।
আর সে বুঝে গেল...
রেলওয়ে ইয়ার্ডে ডেকে আনা ছিল শুধু একটি বিভ্রান্তিমূলক চাল।
আসল খেলা শুরু হয়েছে অন্য কোথাও।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।