কেস ৩: অভিশপ্ত বৃত্ত
পর্ব ১০: হারিয়ে যাওয়া ভাই
তদন্তকক্ষে এমন নীরবতা নেমে এলো, যেন কেউ কথা বললে সেই শব্দও প্রমাণ নষ্ট করে দেবে।
মারুফ অনেকক্ষণ ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর মুখে এমন এক অভিব্যক্তি, যা মেহেদী আগে কখনও দেখেনি।
অবশেষে তিনি ধীরে বললেন,
"আমি এতদিন এই বিষয়টা কাউকে বলিনি।"
সৌরভ চুপচাপ বসে পড়ল।
মিতু ল্যাপটপ বন্ধ করে মনোযোগ দিয়ে শুনতে লাগল।
---
"আমার বড় ভাইয়ের নাম ছিল মাহির রহমান।"
"ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। পরে নিউরোসায়েন্স আর ইলেকট্রনিক্স নিয়ে গবেষণা শুরু করেন।"
"ড. আরিফ সালেহের সঙ্গে তাঁর পরিচয় সেখান থেকেই।"
মেহেদী জিজ্ঞেস করল,
"তারপর?"
মারুফ গভীর শ্বাস নিলেন।
"একদিন তিনি বাড়ি থেকে বের হলেন। বললেন, কয়েক দিনের জন্য গবেষণার কাজে যাচ্ছেন।"
"তারপর আর ফিরে আসেননি।"
---
"পুলিশে অভিযোগ করেছিলেন?"
"করেছিলাম।"
"কিছুই পাওয়া যায়নি।"
"না লাশ, না কোনো চিঠি, না কোনো ফোন।"
মেহেদী ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলল,
"কিন্তু এই ছবি প্রমাণ করছে, তিনি অন্তত ড. আরিফের সঙ্গে কাজ করতেন।"
মারুফ ধীরে মাথা নাড়লেন।
"হ্যাঁ।"
---
ঠিক তখনই শাহীনুর ছবির এক কোণে ছোট্ট একটি জিনিস খেয়াল করল।
"এক মিনিট!"
সবাই এগিয়ে এল।
ছবির পেছনে একটি ভবনের দেয়ালে খুব ছোট করে লেখা ছিল...
LAB-7
সৌরভ বলল,
"এটা কি কোনো ল্যাবের নাম?"
মিতু উত্তর দিল,
"সম্ভব।"
"কিন্তু এত পুরোনো ল্যাব এখন কোথায় আছে?"
---
মেহেদী ছবিটা স্ক্যান করে বড় করল।
দেয়ালের নিচে আরেকটি লাইন দেখা গেল।
Restricted Zone
তার নিচে অস্পষ্টভাবে একটি লোগো।
আধেকটা দেখা যাচ্ছে।
কিন্তু সেটুকুই যথেষ্ট ছিল।
ASTER-এর পুরোনো লোগো।
---
মারুফ বললেন,
"মানে এই ছবি ASTER-এর কোনো গবেষণাগারে তোলা।"
মেহেদী মাথা নাড়ল।
"আর LAB-7 সম্ভবত তাদের সপ্তম গবেষণা ইউনিট।"
---
ঠিক তখনই অফিসের বিদ্যুৎ হঠাৎ একবার দপ করে নিভে আবার জ্বলে উঠল।
কেউ গুরুত্ব দিল না।
কিন্তু মিতুর ল্যাপটপ নিজে থেকেই চালু হয়ে গেল।
স্ক্রিনে একটি কালো উইন্ডো।
তারপর এক লাইনের লেখা ভেসে উঠল।
> DON'T TRUST THE PHOTO.
সবাই স্তব্ধ।
কয়েক সেকেন্ড পর দ্বিতীয় লাইন।
> IT WAS MADE FOR YOU.
তারপর স্ক্রিন আবার কালো।
---
সৌরভ বিস্ময়ে বলল,
"আমাদের কম্পিউটার হ্যাক করেছে?"
মিতু দ্রুত পরীক্ষা শুরু করল।
পাঁচ মিনিট পরে সে মাথা তুলল।
"না।"
"কোনো ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবহার করা হয়নি।"
"তাহলে?"
"বার্তাটা এসেছে..."
"...একটি লুকানো ইউএসবি ডিভাইস থেকে।"
---
সবাই চারদিকে খুঁজতে লাগল।
শেষ পর্যন্ত ডেস্কের নিচে টেপ দিয়ে আটকানো একটি ক্ষুদ্র USB ড্রাইভ পাওয়া গেল।
মারুফ ভ্রু কুঁচকে বললেন,
"এটা এখানে এল কীভাবে?"
কেউ উত্তর দিতে পারল না।
কারণ এই কক্ষে বাইরের লোকের প্রবেশ প্রায় অসম্ভব।
---
USB খুলতেই একটি মাত্র ফাইল দেখা গেল।
নাম...
Mirror.mp4
ভিডিও চালু হলো।
একটি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে কালো পোশাকের সেই ব্যক্তি।
কিন্তু এবার তার মুখও আয়নায় দেখা যাচ্ছে না।
মনে হচ্ছে ইচ্ছাকৃতভাবে ঝাপসা করা হয়েছে।
সে ধীরে বলল,
"মেহেদী..."
"মানুষ সবচেয়ে সহজে কোন জিনিসে বিশ্বাস করে জানো?"
সে নিজেই উত্তর দিল।
"ছবিতে।"
"কিন্তু আজকের প্রযুক্তিতে ছবি তৈরি করা, বদলে ফেলা বা বিভ্রান্তিকরভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব। তাই শুধু একটি ছবি দেখে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বিপজ্জনক।"
মেহেদী চুপচাপ শুনছিল।
এই কথাগুলো যুক্তিসঙ্গত।
ঠিক তাই বলেই এগুলো আরও বিপজ্জনক।
কারণ সত্যের সঙ্গে মিথ্যা মিশিয়ে দিলে মানুষ বিভ্রান্ত হয়।
---
ভিডিওর শেষে লোকটি টেবিলের ওপর একটি পুরোনো চাবি রাখল।
চাবির গায়ে খোদাই করা ছিল...
LAB-7
তারপর সে বলল,
"যদি সত্যিই উত্তর জানতে চাও..."
"...আগামীকাল সকাল আটটায় পুরোনো রেলওয়ে ওয়ার্কশপে এসো।"
"চাবিটা সেখানে তোমাদের জন্য অপেক্ষা করবে।"
ভিডিও শেষ।
---
ঘরের সবাই একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল।
সৌরভ বলল,
"এটা ফাঁদও হতে পারে।"
মিতু বলল,
"হতে পারে।"
মারুফ ধীরে বললেন,
"কিন্তু না গেলে আমরা হয়তো আরেকটি সূত্র হারাব।"
মেহেদী জানালার বাইরে তাকাল।
তার মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরছে।
খুনি কি সত্যিই তাদের পথ দেখাচ্ছে... নাকি প্রতিটি সূত্রই আরেকটি বড় বিভ্রম?
আর সে জানত...
আগামী দিনের সিদ্ধান্তই ঠিক করবে, তারা সত্যের আরও কাছে যাবে, নাকি এমন এক ফাঁদে পা দেবে যেখান থেকে ফিরে আসা সম্ভব হবে না।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।