কেস ৪: অঘোরী রুদ্রের ছায়া
পর্ব ২৮: শ্মশানের নীল আগুন
রাত তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা। পুলিশ জিপের হেডলাইট কাঁচা রাস্তা কেটে এগিয়ে চলেছে। গ্রামের পশ্চিম প্রান্তে পুরোনো শ্মশান। চারপাশে বিশাল বটগাছ, শুকনো বাঁশঝাড় আর নদীর পাড়। দূর থেকে কয়েকজন গ্রামের মানুষ আতঙ্কিত মুখে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ সামনে যেতে সাহস পাচ্ছে না।
মারুফ গাড়ি থামিয়ে বললেন, "কেউ ঘটনাস্থলে হাত দেবে না।"
মেহেদী নিচু হয়ে মাটির দিকে তাকাল। ভেজা কাদার ওপর অনেক পায়ের ছাপ। কিন্তু সেগুলো এলোমেলো। যেন কেউ ইচ্ছে করেই মাটিটা নষ্ট করেছে।
"এটা স্বাভাবিক নয়," সে বলল।
সৌরভ জিজ্ঞেস করল, "কেন?"
"একজন অভিজ্ঞ অপরাধী জানে, তদন্তকারীরা পায়ের ছাপ খুঁজবে। তাই অনেক সময় আসল ছাপ লুকানোর জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে অসংখ্য ছাপ তৈরি করা হয়।"
মিতু টর্চের আলো ফেলতেই দেখতে পেল একটি অর্ধপোড়া কাঠের পাশে অদ্ভুত নীলচে আলো জ্বলছে।
শাহীনুর ভয়ে পিছিয়ে গেল।
"ওটা কী?"
গ্রামের একজন বৃদ্ধ ফিসফিস করে বললেন, "দেখলেন তো? মৃত আত্মার আগুন। রুদ্র বাবা ঠিকই বলেন।"
মেহেদী ধীরে ধীরে আগুনের কাছে গেল। সে ব্যাগ থেকে ছোট কাচের শিশি বের করে সামান্য ছাই সংগ্রহ করল।
"এটা আত্মার আগুন নয়," সে শান্ত গলায় বলল।
"তাহলে?"
"পরীক্ষা না করে নিশ্চিত হওয়া যাবে না। তবে কিছু রাসায়নিক পদার্থ, বিশেষ করে ফসফরাসজাত যৌগ বা নির্দিষ্ট ধাতব লবণ, জ্বললে নীলচে শিখা দেখা যেতে পারে। কেউ ইচ্ছা করে এমন প্রভাব তৈরি করলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই।"
ঠিক তখনই মিতু চিৎকার করে উঠল।
"মেহেদী! এটা দেখ!"
একটি পুরোনো শিলালিপির গায়ে সাদা রঙে আঁকা আছে সেই পরিচিত প্রতীক।
তিনটি বৃত্ত।
মাঝখানে একটি চোখ।
কিন্তু এবার প্রতীকের নিচে আরও একটি লাইন লেখা।
"সত্য দেখো না। সত্যকে বিশ্বাস করো।"
মেহেদী কয়েক সেকেন্ড লেখাটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর হালকা হেসে বলল, "ভুল করেছে।"
মারুফ অবাক হলেন।
"কী ভুল?"
"যে মানুষ সত্যকে বিশ্বাস করতে বলে, সে চায় না মানুষ সত্য পরীক্ষা করুক। বিজ্ঞান ঠিক উল্টোটা শেখায়। আগে পর্যবেক্ষণ, তারপর পরীক্ষা, শেষে সিদ্ধান্ত।"
এমন সময় পুলিশের এক কনস্টেবল দৌড়ে এসে বলল,
"স্যার, নদীর ধারে একটা ব্যাগ পাওয়া গেছে।"
ব্যাগ খুলতেই ভেতরে পাওয়া গেল একটি ল্যাপটপ, কয়েকটি ইলেকট্রনিক সার্কিট বোর্ড এবং একটি ছোট লেজার প্রজেক্টর।
সৌরভ অবাক হয়ে বলল,
"এগুলো তো আশ্রমের যন্ত্রের মতো!"
মিতু ল্যাপটপ চালু করার চেষ্টা করল।
স্ক্রিনে পাসওয়ার্ড চাইছে।
কিন্তু নিচে ব্যবহারকারীর নাম লেখা।
RUDRA_NODE_03
মেহেদীর চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফুটে উঠল।
"Node?"
সে আস্তে বলল,
"তার মানে রুদ্র একজন মানুষ নয়... অন্তত একা নয়।"
"এটা একটা নেটওয়ার্ক।"
মারুফ জিজ্ঞেস করলেন,
"কতজন থাকতে পারে?"
মেহেদী উত্তর দিল,
"যদি Node-03 থাকে..."
"...তাহলে অন্তত আরও দুইজন আছে।"
ঠিক তখনই ল্যাপটপটি নিজে থেকেই চালু হয়ে গেল।
কোনো পাসওয়ার্ড ছাড়াই স্ক্রিনে একটি ভিডিও ভেসে উঠল।
ভিডিওতে অঘোরী রুদ্র।
সে সরাসরি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বলল,
"অভিনন্দন, মেহেদী।"
"তুমি ঠিক জায়গায় পৌঁছেছ।"
"কিন্তু ভুল মানুষকে খুঁজছ।"
রুদ্র মৃদু হেসে ক্যামেরার সামনে একটি মুখোশ তুলে ধরল।
তারপর বলল,
"আমি রুদ্র নই।"
ভিডিও হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল।
ঘরের সবাই একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল।
মেহেদী ধীরে ল্যাপটপের ঢাকনা বন্ধ করল।
"এর মানে..."
"যাকে আমরা এতক্ষণ অঘোরী রুদ্র ভাবছিলাম..."
"...সে হয়তো শুধু একজন অভিনয়শিল্পী।"
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।