পর্ব ৭: ছায়ার মানুষ
কম্পিউটারের স্ক্রিনে স্থির হয়ে থাকা ছবিটার দিকে সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে রইল।
গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে প্রথমে শুধু একটা কালো ছায়া মনে হচ্ছিল। কিন্তু মেহেদী ছবিটা জুম করতেই কিছু বিষয় স্পষ্ট হতে শুরু করল।
লোকটির উচ্চতা প্রায় ছয় ফুট।
ডান হাতে কালো গ্লাভস।
মুখে সাদা মাস্ক।
কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় ছিল তার চোখ।
মুখের বাকি অংশ ঝাপসা হলেও চোখ দুটো যেন সরাসরি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছে।
মেহেদী কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,
"এই ছবি ক্যাম্প থেকে বের হওয়ার সময় তোলা।"
সৌরভ মাথা নাড়ল।
"হ্যাঁ।"
"তখন আমাদের পেছনে কেউ থাকলে অন্তত একজনের চোখে পড়ত।"
শাহীনুর বলল,
"তাহলে?"
"তাহলে ছবিটা ওই সময় তোলা হয়নি।"
সবাই একসঙ্গে তার দিকে তাকাল।
মারুফ জিজ্ঞেস করলেন,
"মানে?"
মেহেদী ছবির কোণায় আঙুল রাখল।
"ছায়ার দিক দেখুন।"
সকালে সূর্য ছিল পূর্বদিকে। অথচ ছবির ছায়া পড়েছে পশ্চিমের হিসাব অনুযায়ী। অর্থাৎ...
ছবির সময় বদলে দেওয়া হয়েছে।
সৌরভ বিস্ময়ে বলল,
"ফটো এডিট?"
"না।"
"তাহলে?"
"সম্ভবত একাধিক ছবি একসঙ্গে জুড়ে বানানো হয়েছে।"
---
মারুফ কম্পিউটারটি জব্দ করার নির্দেশ দিলেন।
ঠিক তখনই মেহেদী আবার সেই ডায়েরিটা বের করল।
মলাটে লেখা ছিল শুধু দুটি অক্ষর।
A. S.
সে এবার প্রথম কয়েকটি পৃষ্ঠা মন দিয়ে পড়তে শুরু করল।
ডায়েরির লেখক লিখেছেন,
> "মানুষ সবচেয়ে বেশি ভয় পায় সেই জিনিসকে, যেটাকে সে বুঝতে পারে না। তাই সত্য লুকানোর সবচেয়ে সহজ উপায় হলো, তাকে অলৌকিক বলে চালিয়ে দেওয়া।"
মেহেদী ধীরে ধীরে বলল,
"এই মানুষটা মনোবিজ্ঞান জানত।"
আরও কয়েক পৃষ্ঠা উল্টাতেই একটি নাম পাওয়া গেল।
ড. আরিফ সালেহ।
মিতু বলল,
"A. S... আরিফ সালেহ!"
মারুফ কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,
"নামটা কোথায় যেন শুনেছি।"
---
ঢাকায় ফিরে পুলিশ রেকর্ড ঘাঁটতে শুরু করলেন মারুফ।
দুই ঘণ্টা পর তিনি একটি পুরোনো ফাইল নিয়ে ফিরে এলেন।
ফাইলের ওপর বড় করে লেখা,
ড. আরিফ সালেহ
নিউরোসায়েন্টিস্ট
নিখোঁজ: ৮ বছর আগে।
ঘরে নীরবতা নেমে এল।
ফাইলে লেখা ছিল, ড. আরিফ সালেহ মানুষের মস্তিষ্কে ভয় কীভাবে কাজ করে, তা নিয়ে গবেষণা করতেন। পরে একটি গোপন গবেষণা প্রকল্পে যোগ দেন। তারপর হঠাৎ তিনি নিখোঁজ হয়ে যান।
সরকারিভাবে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল।
মেহেদী ধীরে বলল,
"যদি তিনি মারা না যান?"
মারুফ তাকিয়ে রইলেন।
"তুই বলতে চাইছিস..."
"আমি কিছুই বলছি না। শুধু সম্ভাবনা বাদ দিচ্ছি না।"
---
সেদিন সন্ধ্যায় মিতু ফরেনসিক রিপোর্ট নিয়ে এল।
নীল তরলের বিশ্লেষণ শেষ হয়েছে।
"এটা কোনো পরিচিত বিষ নয়।"
"তাহলে?"
"এতে এমন কিছু যৌগ আছে, যা স্নায়ুতন্ত্রের সংকেতকে সাময়িকভাবে ধীর করে দেয়।"
মেহেদী জিজ্ঞেস করল,
"স্থায়ী ক্ষতি?"
"নিশ্চিত না। তবে দীর্ঘ সময় ব্যবহার করলে মস্তিষ্কে প্রভাব পড়তে পারে।"
মেহেদী চুপ হয়ে গেল।
তার মাথায় যেন একটা নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে।
---
রাত প্রায় সাড়ে দশটা।
ক্যাম্পে সবাই আলোচনা করছে।
হঠাৎ বাইরে থেকে খুব আস্তে ভেসে এল...
"মেহেদী..."
সবাই থেমে গেল।
আবার।
"মেহেদী..."
শব্দটা যেন কোনো বৃদ্ধ মানুষের।
মারুফ পিস্তল বের করলেন।
"কে?"
কোনো উত্তর নেই।
শুধু আবার সেই ডাক।
মেহেদী ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
বাইরে কেউ নেই।
কিন্তু প্রায় পঞ্চাশ মিটার দূরে বাঁশঝাড়ের পাশে সাদা কাপড় পরা একজন মানুষ দাঁড়িয়ে।
লোকটা হাত তুলে ইশারা করল।
তারপর জঙ্গলের ভেতর ঢুকে গেল।
"থামো!"
মারুফ চিৎকার করলেন।
সবাই দৌড়াতে শুরু করল।
---
জঙ্গলের ভেতরে ঢুকতেই লোকটাকে আর দেখা গেল না।
কিন্তু মাটিতে পড়ে আছে একটি টর্চ।
মেহেদী টর্চটা তুলে জ্বালাতেই আলো পড়ল সামনে।
একটি বিশাল গাছের গায়ে লাল রঙে লেখা—
"সবাই মিথ্যা বলছে।"
তার নিচে আরেকটি লাইন।
"মৃতদের নয়, জীবিতদের তালিকা বানাও।"
সৌরভ ফিসফিস করে বলল,
"এর মানে কী?"
মেহেদী উত্তর দিল না।
সে হঠাৎ লক্ষ্য করল, গাছের গোড়ায় তাজা মাটির দাগ।
কেউ সম্প্রতি খুঁড়েছে।
পুলিশ মাটি সরাতেই বেরিয়ে এল একটি ধাতব বাক্স।
বাক্স খুলে সবাই হতবাক।
ভেতরে দশটি ফাইল।
প্রতিটি ফাইলের ওপর একটি করে নাম।
প্রথম দুইটি নামের ওপর লাল দাগ টানা।
সেগুলো প্রথম দুইজন নিহত ব্যক্তির।
বাকি আটটি ফাইল অক্ষত।
মেহেদী দ্রুত তৃতীয় ফাইল খুলল।
ভেতরে একজন মানুষের ছবি।
নাম।
বয়স।
রক্তের গ্রুপ।
পারিবারিক তথ্য।
দৈনন্দিন রুটিন।
এমনকি...
তিনি প্রতিদিন কখন ঘুমাতে যান, সেটাও লেখা।
মারুফ স্তব্ধ হয়ে বললেন,
"এগুলো শুধু খুনের পরিকল্পনা নয়..."
মেহেদী নিচু গলায় বাকিটা বলল,
"...এগুলো পর্যবেক্ষণ নথি।"
ঠিক তখনই সৌরভ শেষ ফাইলটি খুলে চমকে উঠল।
"মেহেদী..."
"কী?"
সৌরভ ধীরে ধীরে ফাইলটি তার দিকে বাড়িয়ে দিল।
মেহেদী ফাইলের ওপর লেখা নামটা পড়ে কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে রইল।
সেখানে লেখা ছিল—
Subject-11
নাম: মেহেদী হাসান।
তার নিজের ছবি।
তার নিজের স্কুলের ইউনিফর্ম পরা একটি ছবি।
আর নিচে লেখা মাত্র একটি বাক্য—
"পর্যবেক্ষণ শুরু: ১ বছর ৭ মাস আগে।"
মেহেদীর হাত থেকে ফাইলটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
একটা প্রশ্ন তার মাথায় বজ্রপাতের মতো আঘাত করল।
তাকে নজরদারি করা হচ্ছে... আজ থেকে নয়, প্রায় দুই বছর ধরে।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।