কেস ৩: অভিশপ্ত বৃত্ত
পর্ব ২: বৃত্তের ভেতরের বিজ্ঞান
সকাল গড়িয়ে দুপুর।
ময়নাপুর গ্রামের বটগাছের চারপাশে এখনও পুলিশ পাহারা দিচ্ছে।
মেহেদী কাউকে বৃত্তের ভেতরে পা রাখতে দিচ্ছে না।
গ্রামের কয়েকজন ফিসফিস করে বলছিল,
"দেখবেন স্যার, দুপুরের পর আবার আগুন জ্বলবে।"
মেহেদী শুধু হাসল।
"আগুন যদি জ্বলে, তাহলে তারও কারণ থাকবে।"
---
মিতু লাল রঙের নমুনা নিয়ে অস্থায়ী পরীক্ষাগারে কাজ করছিল।
প্রায় এক ঘণ্টা পরে সে বাইরে এল।
তার চোখে বিস্ময়।
"মেহেদী, এটা খুব অদ্ভুত।"
"কী পেলি?"
"এই রঞ্জক পদার্থে খুব সূক্ষ্ম ধাতব কণা আছে।"
"লোহার?"
"না।"
"মূলত অ্যালুমিনিয়াম ও কিছু বিরল খনিজের সূক্ষ্ম কণা।"
সৌরভ অবাক হয়ে বলল,
"রঙের মধ্যে ধাতু কেন?"
মিতু মাথা নাড়ল।
"এটাই তো বুঝতে পারছি না।"
---
মেহেদী আবার বৃত্তের চারপাশে হাঁটতে লাগল।
হঠাৎ সে লক্ষ্য করল, বৃত্তটি হাতে আঁকা হলেও পুরোপুরি গোল।
সে ব্যাগ থেকে একটি মাপার ফিতা বের করল।
বৃত্তের কেন্দ্র থেকে চারদিকে দূরত্ব মাপতে লাগল।
শাহীনুর হেসে বলল,
"এত নিখুঁত বৃত্ত মানুষ আঁকতে পারবে?"
মেহেদী উত্তর দিল,
"পারবে।"
"যদি মাঝখানে একটি খুঁটি পুঁতে দড়ি দিয়ে আঁকা হয়।"
সে মাটিতে খোঁচা দিতেই ছোট্ট একটি গর্ত দেখা গেল।
ঠিক কেন্দ্রবিন্দুতে।
"দেখেছ?"
সৌরভ অবাক হয়ে বলল,
"মানে বৃত্তটা পরিকল্পনা করেই আঁকা হয়েছে!"
---
ঠিক তখনই মারুফ এসে বললেন,
"মৃত ব্যক্তির পরিচয় পাওয়া গেছে।"
"নাম?"
"আবদুল কাদের।"
"পেশায় কৃষক।"
"কিন্তু আরও মজার বিষয় আছে।"
তিনি একটি ফাইল এগিয়ে দিলেন।
"গত ছয় মাসে তিনি প্রায়ই ঢাকায় যেতেন।"
"কেন?"
"কেউ জানে না।"
---
মেহেদী ফাইল উল্টাতে উল্টাতে একটি রসিদ দেখতে পেল।
রসিদটি একটি বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির দোকানের।
সেখানে কেনা হয়েছে—
উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ব্যাটারি
তামার তার
ইনসুলেটেড কেবল
ইলেকট্রনিক টাইমার
সৌরভ হতবাক।
"একজন কৃষক এসব দিয়ে কী করবে?"
মেহেদী ধীরে বলল,
"হয়তো কৃষকই ছিল না..."
"...অথবা অন্য কারও হয়ে এগুলো কিনেছিল।"
---
ঠিক তখনই গ্রামের এক কিশোর দৌড়ে এসে বলল,
"স্যার! আমি একটা জিনিস পেয়েছি।"
তার হাতে ছোট্ট কালো প্লাস্টিকের টুকরো।
মেহেদী সেটা হাতে নিয়ে দেখল।
এটা কোনো খেলনা নয়।
একটি পোড়া সার্কিট বোর্ডের অংশ।
মিতু পরীক্ষা করে বলল,
"এখানে মাইক্রোকন্ট্রোলার ছিল।"
মারুফ জিজ্ঞেস করলেন,
"মানে?"
"মানে এটা কোনো ইলেকট্রনিক যন্ত্রের অংশ।"
---
মেহেদীর চোখ চকচক করে উঠল।
সে আবার বৃত্তের দিকে তাকাল।
তারপর বলল,
"ধরো..."
"এই বৃত্তটা শুধু রঙ দিয়ে আঁকা হয়নি।"
"এর নিচে যদি তার পোঁতা থাকে?"
সবাই একসঙ্গে তার দিকে তাকাল।
---
পুলিশের সাহায্যে খুব সতর্কভাবে বৃত্তের একটি ছোট অংশ খোঁড়া হলো।
মাত্র তিন ইঞ্চি নিচেই...
একটি পাতলা তামার তার বেরিয়ে এল।
সৌরভ বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠল।
"সত্যিই!"
আরও খুঁড়তেই দেখা গেল, পুরো বৃত্ত জুড়েই সেই তার বসানো।
মেহেদী বলল,
"এটা ধর্মীয় চিহ্ন না।"
"এটা একটি বৈদ্যুতিক সার্কিট।"
---
ঠিক তখনই শাহীনুর গাছের পোড়া অংশের দিকে তাকিয়ে বলল,
"তাহলে গাছটা পুড়ল কীভাবে?"
মেহেদী উত্তর দিল না।
সে তামার তার ধরে অনুসরণ করতে লাগল।
প্রায় পঁচিশ মিটার দূরে, ঝোপের ভেতরে গিয়ে তারটি শেষ হয়েছে।
সেখানে মাটির নিচে লুকানো একটি ধাতব বাক্স।
বাক্স খুলতেই সবাই থমকে গেল।
ভেতরে বড় একটি ব্যাটারি প্যাক।
একটি টাইমার।
আর একটি উচ্চ ভোল্টেজ তৈরির সার্কিট।
মিতু বিস্ময়ে বলল,
"এটা দিয়ে অল্প সময়ের জন্য খুব উচ্চ ভোল্টেজ তৈরি করা সম্ভব।"
মেহেদী মাথা নাড়ল।
"আর যদি কেউ বৃত্তের ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকে..."
"...তাহলে কী হতে পারে, সেটা এখনো নিশ্চিত নই।"
---
ঠিক তখনই সৌরভ বাক্সের ভেতরে আরেকটি জিনিস দেখতে পেল।
একটি মেমোরি কার্ড।
মেহেদী সাবধানে সেটি বের করল।
ল্যাপটপে ঢোকাতেই একটি মাত্র ভিডিও দেখা গেল।
ভিডিওতে একজন কালো পোশাক পরা মানুষ।
মুখ ঢাকা।
সে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বলছে,
> "মানুষ সব সময় আকাশের দিকে তাকিয়ে অলৌকিক কিছু খোঁজে।"
> "কিন্তু প্রকৃত জাদু লুকিয়ে থাকে তার পায়ের নিচে।"
ভিডিও হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল।
শেষ ফ্রেমে মাত্র এক সেকেন্ডের জন্য একটি পরিচিত প্রতীক ভেসে উঠল।
তিনটি সমকেন্দ্রিক বৃত্ত।
মাঝখানে একটি চোখ।
মেহেদী স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল,
"এটা কোনো তান্ত্রিক দলের প্রতীক নয়..."
"...এটা আরেকটি সংগঠন।"
মারুফ জিজ্ঞেস করলেন,
"নাম?"
মেহেদী মাথা নাড়ল।
"এখনও জানি না।"
"কিন্তু..."
"...মনে হচ্ছে ASTER-এরও একজন প্রতিদ্বন্দ্বী আছে।"
ঠিক সেই মুহূর্তে মিতুর ফোন বেজে উঠল।
ফোন ধরে তার মুখের রঙ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
"কী হয়েছে?"
মিতু ধীরে বলল,
"আরেকটা খুন হয়েছে..."
"...এবং সেখানেও একই রকম একটি বৃত্ত আঁকা আছে।"
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।