কেস ৩: অভিশপ্ত বৃত্ত
পর্ব ১৩: অফিসের ভেতরের কণ্ঠ
ক্যাসেট প্লেয়ারের শব্দ থেমে যাওয়ার পরও কেউ কথা বলল না।
মারুফ স্থির চোখে মেহেদীর দিকে তাকিয়ে আছেন।
"আমার অফিসে?"
মেহেদী ধীরে মাথা নাড়ল।
"হ্যাঁ।"
"আমি নিশ্চিত নই... কিন্তু এই কণ্ঠটা আমি আগে শুনেছি।"
"কোথায় শুনেছিস?"
"আপনার অফিসে।"
"কোন দিন?"
মেহেদী চোখ বন্ধ করে স্মৃতি মনে করার চেষ্টা করল।
---
তার মনে ভেসে উঠল প্রথম কেসের একটি দৃশ্য।
রাত প্রায় সাড়ে নয়টা।
তদন্ত শেষে সবাই মারুফের অফিসে বসে রিপোর্ট লিখছিল।
ঠিক তখনই একজন মাঝবয়সী কর্মকর্তা ভেতরে ঢুকেছিলেন।
তিনি কয়েক মিনিট মারুফের সঙ্গে কথা বলে চলে যান।
সেদিন মেহেদী তাঁর দিকে তেমন মনোযোগ দেয়নি।
কিন্তু...
লোকটার কণ্ঠস্বর তার মনে রয়ে গিয়েছিল।
---
মারুফ নিচু স্বরে বললেন,
"তুই কি আমার সহকর্মী কাউকে সন্দেহ করছিস?"
"না।"
মেহেদী সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল।
"আমি শুধু বলছি, কণ্ঠটা পরিচিত।"
"পরিচিত মানেই অপরাধী নয়।"
মারুফ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
"ঠিক বলেছিস।"
---
মিতু ক্যাসেটটা আবার চালু করল।
এবার সবাই শুধু কণ্ঠের দিকে মন দিল।
"মাহির..."
"রেকর্ডিং বন্ধ করো।"
তারপর তিন সেকেন্ড নীরবতা।
এরপর দূরে ধাতব দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ।
ঠাস!
মেহেদী হঠাৎ বলল,
"একটু থামাও!"
সে শব্দটা আবার শুনল।
আবার।
আরও একবার।
তারপর ধীরে বলল,
"এটা সাধারণ দরজা না।"
---
সৌরভ অবাক হয়ে বলল,
"শব্দ শুনে এটাও বুঝলি?"
মেহেদী হাসল।
"দরজা যত ভারী হয়, বন্ধ হওয়ার সময় কম্পনের ধরন বদলে যায়।"
"এটা অনেকটা ব্যাংকের ভল্ট বা ল্যাবরেটরির নিরাপত্তা দরজার মতো শোনাচ্ছে।"
মিতু মাথা নাড়ল।
"হতে পারে।"
---
ঠিক তখনই শাহীনুর গবেষণাকক্ষের কোণে একটি পুরোনো লোহার আলমারি খুলতে গিয়ে বলল,
"এদিকে আসো!"
ভেতরে মাত্র তিনটি ফাইল।
প্রথমটির নাম...
PROJECT ASTER
দ্বিতীয়টি...
PROJECT NEXUS
তৃতীয়টির নাম দেখে সবাই থমকে গেল।
PROJECT MIRROR
---
মেহেদী ফাইলটা খুলল।
প্রথম পাতায় বড় অক্ষরে লেখা।
> "যদি একজন মানুষকে একই মিথ্যা বারবার শোনানো হয়, এবং সেই মিথ্যার পক্ষে পর্যাপ্ত পরিবেশ তৈরি করা হয়, তাহলে সে একসময় সেই মিথ্যাকেই নিজের স্মৃতি মনে করতে শুরু করতে পারে।"
মিতু ধীরে বলল,
"এটা স্মৃতি বিকৃতি বা false memory-এর ধারণার সঙ্গে মিল আছে। মানুষের স্মৃতি নিখুঁত রেকর্ড নয়, তাই কিছু পরিস্থিতিতে ভুল তথ্য পরবর্তী স্মৃতিকে প্রভাবিত করতে পারে।"
মেহেদী বলল,
"তাহলে NEXUS শুধু আতঙ্ক তৈরি করছে না।"
"তারা মানুষের স্মৃতিও প্রভাবিত করতে চাইছে।"
---
পরের পাতায় কয়েকজন গবেষকের নাম।
ড. আরিফ সালেহ।
মাহির রহমান।
আরও পাঁচজন।
কিন্তু শেষ নামটি কালো কালি দিয়ে মুছে ফেলা।
শুধু একটি অক্ষর দেখা যাচ্ছে।
"M"
---
মারুফ ফিসফিস করে বললেন,
"মাহির?"
মেহেদী মাথা নাড়ল।
"না। মাহিরের নাম আগেই আছে।"
"তাহলে?"
"আরেকজন।"
---
হঠাৎ বাইরে গাড়ির শব্দ শোনা গেল।
সবাই সতর্ক হয়ে অস্ত্র হাতে নিল।
মারুফ দরজার পাশে দাঁড়ালেন।
গাড়ি থামল।
দরজা খুলল।
কয়েক সেকেন্ড পর একজন কনস্টেবল দৌড়ে ভেতরে ঢুকল।
"স্যার!"
"কী হয়েছে?"
"একজন বৃদ্ধ আপনাদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন।"
---
বৃদ্ধ লোকটিকে ভেতরে আনা হলো।
তার বয়স প্রায় সত্তর।
মুখভর্তি সাদা দাড়ি।
চোখে মোটা চশমা।
হাঁটার সময় লাঠি ব্যবহার করছেন।
তিনি গবেষণাকক্ষের চারদিকে তাকিয়ে থেমে গেলেন।
তারপর খুব আস্তে বললেন,
"এত বছর পর..."
"...আবার কেউ এখানে এসেছে।"
মেহেদী এগিয়ে গেল।
"আপনি কে?"
বৃদ্ধ উত্তর দিলেন,
"আমি এই ওয়ার্কশপের কেয়ারটেকার ছিলাম।"
"বিশ বছর আগে এই জায়গাটা বন্ধ হয়ে যায়।"
"আপনি কি ড. আরিফকে চিনতেন?"
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ থেকে মাথা নাড়লেন।
"হ্যাঁ।"
"আর মাহির রহমান?"
"তাকেও।"
ঘরে নিস্তব্ধতা নেমে এল।
---
বৃদ্ধ ধীরে ধীরে পকেট থেকে একটি মরিচা ধরা ধাতব ব্যাজ বের করলেন।
ব্যাজে খোদাই করা লেখা।
LAB-7
তিনি সেটি মেহেদীর হাতে দিয়ে বললেন,
"তোমরা ভুল জায়গায় উত্তর খুঁজছ।"
"LAB-7 কোনো ভবনের নাম নয়।"
"এটা..."
তিনি বাকিটা বলার আগেই বাইরে হঠাৎ একটি গুলির শব্দ ভেসে এল।
ধাম!
কাচ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।
বৃদ্ধ লোকটি বুক চেপে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লেন।
মেহেদী দৌড়ে তাঁকে ধরে ফেলল।
বৃদ্ধ কষ্টে শ্বাস নিচ্ছেন।
তিনি শেষ শক্তিটুকু দিয়ে মেহেদীর কানে ফিসফিস করে বললেন,
"LAB-7... কোনো জায়গা নয়..."
"...এটা একজন মানুষ..."
কথা শেষ হতেই তাঁর হাত নিস্তেজ হয়ে মাটিতে পড়ে গেল।
আর জানালার বাইরে...
দূরে একটি কালো মোটরসাইকেল ধুলো উড়িয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।