পর্ব ২: দ্বিতীয় লাশের নীরব সাক্ষী
শিশুটির কণ্ঠে এমন আতঙ্ক ছিল যে মুহূর্তের মধ্যেই মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের ভিড় ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। কেউ দৌড়ে গেল উত্তর দিকের জঙ্গলের দিকে, কেউ আবার দূরে দাঁড়িয়ে কাঁপতে কাঁপতে শুধু তাকিয়ে রইল। মহাগুরু অগ্নিবীর চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়ার ভান করল।
"আমি আগেই বলেছিলাম... শক্তি আবার রক্ত নিয়েছে।"
তার কথায় গ্রামের কয়েকজন বৃদ্ধ মাটিতে বসে কাঁদতে শুরু করল।
কিন্তু মেহেদী একবারও তান্ত্রিকের দিকে তাকাল না। সে মারুফের সঙ্গে দ্রুত ঘটনাস্থলের দিকে এগিয়ে গেল। সৌরভ, শাহীনুর আর মিতুও পেছনে।
জঙ্গলের ভেতরে ঢুকতেই এক ধরনের ধাতব গন্ধ নাকে এল। মিতু ফিসফিস করে বলল, "রক্তের গন্ধ... কিন্তু অদ্ভুতভাবে হালকা।"
দশ গজ সামনে গিয়ে সবাই থমকে দাঁড়াল।
দ্বিতীয় লাশ।
এইবার মৃত ব্যক্তি গ্রামের স্কুলশিক্ষক আবদুল কাদের। তাঁর দেহ একটি বিশাল শিমুল গাছের গুঁড়ির সঙ্গে এমনভাবে আটকে আছে, যেন কেউ প্রচণ্ড শক্তিতে ছুড়ে মেরেছে। বুকের হাড় ভাঙা, ঘাড় অস্বাভাবিকভাবে বেঁকে গেছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, শরীরের নিচে প্রায় কোনো রক্ত নেই।
মারুফ ধীরে বললেন, "এটাও আগের মতো..."
মেহেদী চারপাশে হাঁটু গেড়ে বসে মাটি দেখতে শুরু করল। কয়েক মিনিট পর সে বলল,
"কেউ যেন ইচ্ছে করেই সবকিছু পরিষ্কার করেছে।"
মারুফ ভ্রু কুঁচকে বললেন, "মানে?"
"দেখুন, এখানে শুকনো পাতা আছে। কিন্তু লাশের চারপাশে পাতাগুলো উল্টে গেছে। তারপর আবার সুন্দর করে বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।"
সৌরভ বিস্মিত হয়ে বলল, "আমি তো খেয়ালই করিনি!"
মেহেদী উত্তর দিল, "খুনি চায় আমরা ভাবি, এখানে কিছুই ঘটেনি।"
ঠিক তখন ফরেনসিক দলের একজন সদস্য দৌড়ে এল।
"স্যার, একটা অদ্ভুত জিনিস পেয়েছি।"
সে ছোট্ট একটি স্বচ্ছ প্লাস্টিকের টিউব এগিয়ে দিল। ভেতরে হালকা নীল রঙের গুঁড়ো।
"এটা লাশের জামার কলারে আটকে ছিল।"
মারুফ জিজ্ঞেস করলেন, "কীসের গুঁড়ো?"
লোকটি মাথা নাড়ল।
"এখনও বলতে পারছি না। ল্যাবে পরীক্ষা করতে হবে।"
মেহেদী টিউবটির দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকল। তারপর খুব আস্তে বলল,
"এটা হয়তো এই কেসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র।"
সবাই অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।
"এক চিমটি গুঁড়ো?"
মেহেদী বলল, "অনেক সময় পুরো অপরাধের গল্প একটা ধূলিকণার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।"
...
সন্ধ্যা নামতেই পুরো গ্রাম আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠল। কেউ দরজা খুলছে না। দূরে দূরে শুধু কুকুরের ডেকে ওঠা।
মারুফ অস্থায়ী ক্যাম্পে বসে রিপোর্ট দেখছিলেন। ঠিক তখনই একজন কনস্টেবল এসে বলল,
"স্যার... ওই তান্ত্রিকরা আবার মাঠে লোক জড়ো করেছে।"
সবাই সেখানে পৌঁছাল।
অগ্নিবীর এবার একটা বড় মাটির পাত্র সামনে রেখে বলল,
"এই পাত্রে আমি মৃত মানুষের আত্মাকে ডাকব। সে নিজেই তার হত্যাকারীর কথা বলবে।"
মানুষ নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল।
হঠাৎ পাত্রের ভেতর থেকে ধোঁয়া উঠতে শুরু করল।
তারপর...
একটি অস্পষ্ট মানুষের মুখ ধোঁয়ার মধ্যে ভেসে উঠল।
চারদিকে চিৎকার পড়ে গেল।
"আল্লাহ!"
"আত্মা!"
কেউ কেউ ভয়ে মাটিতে বসে পড়ল।
শুধু মেহেদী স্থির চোখে দৃশ্যটা দেখছিল।
ধোঁয়ার মুখটা কয়েক সেকেন্ড পর মিলিয়ে গেল।
অগ্নিবীর গম্ভীর গলায় বলল,
"হত্যাকারী মানুষ নয়। অরণ্যের অভিশপ্ত রক্ষক জেগে উঠেছে।"
ভিড়ের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল।
ফিরে আসার পথে সৌরভ বলল,
"দোস্ত... এটা কীভাবে সম্ভব?"
মেহেদী হালকা হেসে বলল,
"অসম্ভব কিছুই দেখিনি।"
"মানে?"
"ধোঁয়ার ওপর ছবি ভাসানো যায়। আলো, কণা আর নির্দিষ্ট কোণ ব্যবহার করলে মানুষের চোখ সেটাকে ত্রিমাত্রিক ভাবতে শুরু করে।"
মিতু অবাক হয়ে বলল,
"তুই বলতে চাইছিস এটা জাদু না?"
"না। খুব সম্ভবত বিজ্ঞানের পুরোনো একটা কৌশল। কিন্তু কীভাবে করেছে, সেটা এখনও জানি না।"
...
রাতে সবাই ক্যাম্পে ফিরে এলো।
ঘড়িতে তখন রাত একটা।
হঠাৎ সৌরভ লক্ষ্য করল, মেহেদী একা বসে লাশের ছবিগুলো বারবার দেখছে।
"ঘুমাস না কেন?"
মেহেদী ছবির দিকে তাকিয়েই বলল,
"দুটো লাশেই একটা জিনিস মিল আছে।"
"কী?"
"দুজনের বাম কানের নিচে একই রকম তিনটি সূক্ষ্ম ছিদ্র। এত ছোট যে খালি চোখে প্রায় দেখা যায় না।"
সৌরভ ছবির দিকে ঝুঁকে তাকিয়ে হতবাক।
"এগুলো আগে কেউ খেয়াল করেনি?"
"না। কারণ সবাই বড় ক্ষতগুলোর দিকেই তাকিয়ে ছিল।"
ঠিক তখনই মারুফের ফোন বেজে উঠল।
তিনি ফোন ধরতেই তাঁর মুখের রঙ বদলে গেল।
"কী বলছ?"
কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে তিনি ধীরে ফোন নামালেন।
মেহেদী উঠে দাঁড়াল।
"কী হয়েছে?"
মারুফ শুকনো গলায় বললেন,
"ফরেনসিক ল্যাব থেকে খবর এসেছে..."
তিনি কয়েক মুহূর্ত থামলেন।
"দুই মৃতদেহের শরীরে যে রক্ত থাকার কথা, তার প্রায় চল্লিশ শতাংশই নেই।"
সৌরভ হতভম্ব।
"মানে... রক্ত কোথায় গেল?"
মারুফ ধীরে বললেন,
"ওটাই তো তারা বুঝতে পারছে না..."
মেহেদী কিছু বলল না। সে শুধু আবার লাশের ছবির দিকে তাকাল।
তারপর নিজের মনে ফিসফিস করে বলল,
"রক্ত হারায়নি... কেউ সেটা নিয়ে গেছে।"
ঘরের ভেতর হঠাৎ নিস্তব্ধতা নেমে এল।
কিন্তু সেই নীরবতার মাঝেই ক্যাম্পের বাইরে কারও পায়ের শব্দ শোনা গেল।
মারুফ দরজা খুলে বাইরে তাকাতেই দেখলেন, সেখানে কেউ নেই।
শুধু মাটির ওপর পড়ে আছে একটি ছোট কাগজ।
কাগজে লাল কালি দিয়ে মাত্র একটি বাক্য লেখা।
"বিজ্ঞান যত এগোবে, মৃত্যুর কাছে তত হারবে।"
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।