কেস ৪: অঘোরী রুদ্রের ছায়া
পর্ব ৩৯: আগুন যে সত্য লুকিয়ে রেখেছিল
সকালের প্রথম আলো জানালা দিয়ে ঢুকলেও থানার তদন্তকক্ষে কারও চোখে ঘুম নেই।
টেবিলের ওপর ছড়িয়ে আছে পুরোনো ছবি, ফরেনসিক রিপোর্ট, কলেজের নথি আর সেই রহস্যময় বার্তার প্রিন্ট কপি।
মেহেদী অনেকক্ষণ ধরে আগুনে পুড়ে যাওয়া কলেজের ছবিটার দিকে তাকিয়ে ছিল।
হঠাৎ সে বলল,
"আমরা একটা ভুল করছি।"
মারুফ মুখ তুলে তাকালেন।
"কী ভুল?"
"আমরা ধরে নিয়েছি আগুন ছিল মূল ঘটনা।"
"কিন্তু যদি আগুনটা শুধু প্রমাণ নষ্ট করার জন্য লাগানো হয়ে থাকে?"
ঘরের সবাই চুপ হয়ে গেল।
---
মারুফ পুরোনো মামলার ফাইল খুললেন।
আগুন লাগার সময়...
রাত ১টা ১৮ মিনিট।
দমকল পৌঁছায়...
১টা ৩৭ মিনিটে।
তদন্ত প্রতিবেদনে লেখা,
'বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট।'
মেহেদী ধীরে মাথা নাড়ল।
"এটা খুব সহজ উত্তর।"
---
মিতু বলল,
"ফাইলে কি কোনো বৈদ্যুতিক বিশেষজ্ঞের রিপোর্ট আছে?"
অনেক খোঁজার পর দেখা গেল...
না।
শুধু একটি সারসংক্ষেপ।
পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট নেই।
---
"মানে?"
সৌরভ জিজ্ঞেস করল।
মারুফ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
"মানে হয় রিপোর্ট হারিয়ে গেছে, নয়তো কখনো সংযুক্তই করা হয়নি।"
---
ঠিক তখনই শাহীনুর পুরোনো সংবাদপত্রের ডিজিটাল আর্কাইভ ঘাঁটতে ঘাঁটতে চিৎকার করে উঠল।
"স্যার!"
"এটা দেখুন।"
সবাই স্ক্রিনের সামনে এগিয়ে গেল।
নয় বছর আগের একটি ছোট সংবাদ।
শিরোনাম:
'কলেজে আগুন, গবেষণাগার সম্পূর্ণ ধ্বংস'
খবরের নিচে মাত্র একটি লাইন।
'ঘটনার তিন দিন আগে গবেষণাগারের অধিকাংশ যন্ত্রপাতি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।'
---
ঘরে নীরবতা নেমে এল।
মেহেদী আস্তে বলল,
"এক মিনিট..."
"আগুনে ল্যাব পুড়েছে।"
"কিন্তু তার আগেই যন্ত্রপাতি সরানো হয়েছে?"
---
মিতু বলল,
"তাহলে যারা সরিয়েছিল, তারা জানত আগুন লাগবে।"
---
মারুফ ফিসফিস করে বললেন,
"এটা দুর্ঘটনা নয়।"
---
ঠিক সেই মুহূর্তে মেহেদীর ফোনে একটি অজানা নম্বর থেকে কল এল।
সে স্পিকার অন করল।
ওপাশে বয়স্ক একজন মানুষের কণ্ঠ।
"তোমরা যদি সত্যিই সোনাপুর কলেজের সত্য জানতে চাও..."
"...তাহলে পুরোনো লাইব্রেরিতে যাও।"
মেহেদী জিজ্ঞেস করল,
"আপনি কে?"
লোকটি উত্তর দিল,
"আমি ছিলাম ওখানকার লাইব্রেরিয়ান।"
"আর..."
"আমি একমাত্র মানুষ, যে আগুন লাগার আগের রাতটা নিজের চোখে দেখেছি।"
লাইন কেটে গেল।
---
এক ঘণ্টা পরে তারা পৌঁছাল বহু বছর ধরে পরিত্যক্ত সোনাপুর কলেজে।
ভাঙা গেট।
জং ধরা লোহার সাইনবোর্ড।
আগাছায় ঢেকে গেছে পুরো মাঠ।
প্রধান ভবনের দেয়ালে এখনো আগুনের কালো দাগ স্পষ্ট।
---
মেহেদী চারপাশে তাকিয়ে বলল,
"অদ্ভুত..."
মিতু জিজ্ঞেস করল,
"কী?"
"এত বছর পরও কেউ এই জায়গা ভাঙেনি।"
---
লাইব্রেরির দরজাটা আধখোলা ছিল।
ভেতরে ঢুকতেই ধুলোর গন্ধ।
সারি সারি পচে যাওয়া বই।
জানালার পাশে বসে আছেন প্রায় আশি বছরের এক বৃদ্ধ।
চোখে মোটা চশমা।
হাতে একটি পুরোনো বই।
তিনি মাথা না তুলেই বললেন,
"তোমরা দেরি করে ফেলেছ।"
---
মারুফ বললেন,
"আপনি কি এখানকার লাইব্রেরিয়ান ছিলেন?"
বৃদ্ধ ধীরে মাথা নাড়লেন।
"ছিলাম।"
"আগুনের আগের রাতে আমি ড. আরিফ সালেহ, অধ্যাপক আফসার রহমান আর ড. সামিউল করিমকে একসঙ্গে এই লাইব্রেরি থেকে বের হতে দেখেছিলাম।"
ঘরের বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠল।
---
মেহেদী দ্রুত জিজ্ঞেস করল,
"তারা কী নিয়ে কথা বলছিলেন?"
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে স্মৃতি মনে করার চেষ্টা করলেন।
তারপর ধীরে বললেন,
"একটা কথাই আমার মনে আছে।"
"'যদি পরীক্ষা ব্যর্থ হয়...'"
"'...তাহলে সব নথি পুড়িয়ে ফেলতে হবে।'"
---
মিতু বিস্ময়ে বলল,
"পরীক্ষা?"
"কী পরীক্ষা?"
বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।
"জানি না।"
"তবে আগুন লাগার এক ঘণ্টা আগে..."
"...আমি দেখেছিলাম দুই কিশোরকে ল্যাবরেটরির দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।"
---
মেহেদীর বুকের ভেতর কাঁপন শুরু হলো।
"দুই কিশোর?"
"হ্যাঁ।"
"তাদের একজনের নাম আমি শুনেছিলাম..."
বৃদ্ধ থেমে গেলেন।
সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করছে।
তিনি ধীরে বললেন,
"মাহির।"
"আর অন্য ছেলেটার নাম..."
ঠিক তখনই লাইব্রেরির ভেতরে হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দে একটি জানালার কাঁচ ভেঙে পড়ল।
সবাই নিচু হয়ে গেল।
মারুফ পিস্তল বের করলেন।
জানালার বাইরে কেউ নেই।
শুধু মেঝেতে পড়ে আছে একটি কালো পাথর।
পাথরের সঙ্গে বাঁধা একটি কাগজ।
মেহেদী কাগজটা খুলল।
তাতে মাত্র একটি বাক্য লেখা।
«"অতীত যত গভীরে খুঁড়বে, বর্তমান তত বেশি রক্তাক্ত হবে।"»
আর নিচে...
তিনটি বৃত্ত।
মাঝখানে একটি চোখ।
মেহেদী ধীরে জানালার বাইরে তাকাল।
তার মনে হলো...
কেউ একজন ঠিক এখনই তাদের দেখছিল।
কিন্তু সে কে,
তা বোঝার আগেই দূরের জঙ্গলের ভেতর একটি ছায়া মিলিয়ে গেল।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।