কেস ৩: অভিশপ্ত বৃত্ত
পর্ব ৪: তৃতীয় বৃত্তের ফাঁদ
পুলিশের গাড়ি সাইরেন বাজিয়ে গ্রামের কাঁচা রাস্তা ধরে ছুটে চলেছে।
মারুফ ওয়্যারলেসে বারবার বলছেন,
"কেউ বৃত্তের ভেতরে যাবে না।"
"এলাকা খালি করে রাখুন।"
ওপাশ থেকে কনস্টেবলের কাঁপা গলা শোনা গেল।
"স্যার... মানুষ কথা শুনছে না।"
"কেন?"
"একজন তান্ত্রিক এসে বলছে, এই বৃত্তের পূজা না করলে পুরো গ্রাম ধ্বংস হয়ে যাবে।"
মেহেদী চোখ বন্ধ করল।
সে বুঝে গেল, খুনির পরিকল্পনা শুধু প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করছে না।
মানুষের ভয়কে ব্যবহার করার জন্য কেউ ঘটনাস্থলেই গুজব ছড়াচ্ছে।
---
বিশ মিনিট পর তারা পৌঁছাল।
গ্রামের নাম দক্ষিণ বালিয়াডাঙ্গা।
একটি খোলা মাঠের মাঝখানে বিশাল বৃত্ত আঁকা।
এবারের বৃত্ত আগের দুটির চেয়ে অনেক বড়।
কমপক্ষে আট মিটার ব্যাস।
চারদিকে শত শত মানুষ দাঁড়িয়ে।
পুলিশ ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।
বৃত্তের এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে কালো পোশাক পরা একজন ব্যক্তি।
তার লম্বা দাড়ি।
গলায় রুদ্রাক্ষের মালা।
হাতে একটি লাঠি।
সে উচ্চস্বরে বলছে,
"যে এই বৃত্তে পা দেবে, তার মৃত্যু নিশ্চিত!"
"আমি মন্ত্র পড়ে অভিশাপ থামাব!"
---
মেহেদী ভিড় ঠেলে সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
"আপনার নাম কী?"
লোকটি তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল।
"আমার নাম জানার দরকার নেই।"
"মানুষ আমাকে কালপুরুষ বলে ডাকে।"
সৌরভ বিরক্ত হয়ে বলল,
"নিজের পরিচয় লুকিয়ে রাখছেন কেন?"
লোকটি রহস্যময় হাসি দিল।
"সত্যিকারের সাধকের পরিচয় লাগে না।"
---
মেহেদী একবারও তর্ক করল না।
সে শুধু লোকটার জুতোর দিকে তাকাল।
তারপর লাঠির মাথায়।
তারপর হাতের নখে।
হালকা ধূসর গুঁড়া লেগে আছে।
মিতু নিচু স্বরে বলল,
"কী দেখছিস?"
মেহেদী ফিসফিস করে বলল,
"ওর জুতোর তলায় লাল রঞ্জক লেগে আছে।"
"মানে?"
"মানে..."
"...ও আগে কোনো বৃত্তের ভেতরে হেঁটেছে।"
---
ঠিক তখনই কালপুরুষ চিৎকার করে উঠল,
"দেখো!"
সে লাঠি দিয়ে বৃত্তের মাঝখানে আঘাত করল।
হঠাৎ মাটি থেকে পাতলা ধোঁয়া উঠতে শুরু করল।
জনতা একসঙ্গে চিৎকার করে পিছিয়ে গেল।
"আল্লাহ!"
"অভিশাপ!"
"জাদু!"
কয়েকজন মহিলা কান্না শুরু করলেন।
---
মারুফ বন্দুক বের করতে যাচ্ছিলেন।
মেহেদী হাত তুলে থামাল।
"না।"
সে ধীরে ধীরে বৃত্তের দিকে এগিয়ে গেল।
সৌরভ চিৎকার করল,
"পাগল হয়েছিস?"
মেহেদী কোনো উত্তর দিল না।
সে হাঁটু গেড়ে ধোঁয়ার দিকে তাকাল।
একটু গন্ধ নিল।
তারপর মাটির একটু অংশ তুলে হাতে ঘষল।
সে উঠে দাঁড়িয়ে শান্ত গলায় বলল,
"এটা ধোঁয়া না।"
"এটা সূক্ষ্ম কুয়াশার মতো রাসায়নিক কণা।"
"গরমের সংস্পর্শে এসে বাষ্প তৈরি করছে।"
কালপুরুষ চেঁচিয়ে উঠল,
"মিথ্যা!"
"তুমি বিজ্ঞান দিয়ে অলৌকিক শক্তি বুঝতে পারবে না!"
---
মেহেদী হাসল।
"তাহলে একটা পরীক্ষা করি।"
সে মারুফকে বলল,
"এক বালতি পানি আনুন।"
একজন কনস্টেবল দৌড়ে পাশের বাড়ি থেকে পানি নিয়ে এল।
মেহেদী পুরো বালতির পানি বৃত্তের মাঝখানে ঢেলে দিল।
মুহূর্তের মধ্যে ধোঁয়া বন্ধ হয়ে গেল।
চারদিকে নীরবতা।
সে গ্রামের মানুষের দিকে তাকিয়ে বলল,
"যদি এটা অলৌকিক শক্তি হতো..."
"...তাহলে এক বালতি পানি দিয়ে থেমে যেত?"
লোকজন একে অপরের মুখের দিকে তাকাতে লাগল।
প্রথমবার তাদের চোখে সন্দেহের ছাপ ফুটে উঠল।
---
কালপুরুষের মুখের আত্মবিশ্বাস একটু নড়ে গেল।
সে দ্রুত বলল,
"তুমি বুঝতে পারছ না।"
"অভিশাপ এখনও শেষ হয়নি।"
ঠিক তখনই...
টিক... টিক... টিক...
খুব ক্ষীণ শব্দ।
মেহেদীর কান খাড়া হয়ে গেল।
সে নিচের মাটিতে কান রাখল।
আবার সেই শব্দ।
টিক... টিক...
টাইমারের মতো।
তার মুখের রঙ বদলে গেল।
"সবাই পিছিয়ে যান!"
মারুফ চিৎকার করলেন,
"এলাকা খালি করুন!"
---
পুলিশ ও গ্রামবাসী দৌড়ে নিরাপদ দূরত্বে সরে গেল।
মেহেদী একাই বৃত্তের ভেতরে রইল।
সৌরভ চিৎকার করল,
"বের হয়ে আয়!"
মেহেদী মাটিতে দ্রুত হাত চালাতে লাগল।
প্রায় দুই ইঞ্চি নিচে একটি ধাতব বাক্সের কোণা দেখা গেল।
সে বাক্সটি টেনে বের করল।
বাক্সের গায়ে লাল ডিজিটাল সংখ্যা জ্বলছে।
00:18
00:17
00:16
মিতুর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
"টাইমার!"
মারুফ দৌড়ে এগোতে চাইলে মেহেদী চিৎকার করে বলল,
"কেউ আসবেন না!"
সে বাক্সটি উল্টে দেখল।
ভেতরে বিস্ফোরক নেই।
কিন্তু আছে জটিল সার্কিট, উচ্চ ভোল্টেজের ক্যাপাসিটর এবং একটি রেডিও রিসিভার।
ডিজিটাল সংখ্যা কমছে।
00:08
00:07
ঠিক তখনই মেহেদীর চোখে পড়ল, বাক্সের পাশে খুব ছোট অক্ষরে একটি বাক্য লেখা।
> "ভুল তার কাটলে তুমি মরবে না... কিন্তু সত্য চিরতরে হারাবে।"
তার সামনে তিনটি রঙের তার।
লাল।
নীল।
কালো।
ঘড়িতে তখন মাত্র...
৫ সেকেন্ড বাকি।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।