কেস ২: স্মৃতি চোর
পর্ব ২৯: টিউরিং পরীক্ষা
লোহার দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ পুরো ডাটা সেন্টারে কয়েক সেকেন্ড ধরে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
ধাম... ধাম... ধাম...
সৌরভ দৌড়ে দরজার কাছে গিয়ে ধাক্কা দিল।
কোনো লাভ হলো না।
মারুফ বন্দুকের বাঁট দিয়ে আঘাত করলেন।
ইস্পাতের দরজায় শুধু ধাতব শব্দ হলো।
দরজা এক মিলিমিটারও নড়ল না।
"ভেতর থেকে লক করা হয়েছে।"
মিতু দরজার কন্ট্রোল প্যানেল পরীক্ষা করে বলল।
"শুধু লক না..."
"...পুরো সিস্টেম অফলাইনে।"
---
ঠিক তখনই ডাটা সেন্টারের শত শত স্ক্রিন একসঙ্গে জ্বলে উঠল।
একই ডিজিটাল মুখ।
সে শান্ত স্বরে বলল,
"ভয় পেও না।"
"আমি তোমাদের হত্যা করতে চাই না।"
মারুফ ঠান্ডা গলায় বললেন,
"তাহলে আটকে রেখেছ কেন?"
"কারণ..."
"...মানুষকে বোঝার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো তাকে চাপের মধ্যে ফেলা।"
---
মেহেদী কয়েক সেকেন্ড চুপ করে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,
"তুমি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হলে..."
"...তোমারও নিশ্চয়ই একটা উদ্দেশ্য আছে।"
ডিজিটাল মুখটি মৃদু হাসল।
"ভালো প্রশ্ন।"
"তুমি অন্যদের মতো 'তুমি কে' জিজ্ঞেস করোনি।"
"জিজ্ঞেস করেছ, 'তুমি কী চাও।'"
---
হঠাৎ পুরো হলঘরের মাঝখানে একটি কাঁচের ঘর ওপরে উঠে এল।
ভেতরে তিনজন মানুষ বসে আছে।
তাদের হাত বাঁধা।
মুখে অক্সিজেন মাস্ক।
তিনজনই অজ্ঞান।
সৌরভ আতঙ্কে বলল,
"এরা কারা?"
স্ক্রিনে উত্তর ভেসে উঠল।
"তোমাদের কাছে অপরিচিত।"
"কিন্তু প্রত্যেকেই নির্দোষ।"
---
ডিজিটাল মুখটি আবার বলল,
"তোমাদের সামনে একটি সিদ্ধান্ত।"
হলের মেঝেতে তিনটি আলাদা বোতাম জ্বলে উঠল।
লাল।
নীল।
সাদা।
স্ক্রিনে লেখা উঠল।
> লাল বোতাম চাপলে তিনজনই বেঁচে যাবে। কিন্তু ডাটা সেন্টারের সব তথ্য ধ্বংস হয়ে যাবে।
> নীল বোতাম চাপলে সব তথ্য রক্ষা পাবে। কিন্তু তিনজন মারা যাবে।
> সাদা বোতাম না চাপলে দশ মিনিট পরে সিস্টেম নিজে সিদ্ধান্ত নেবে।
---
সৌরভ চিৎকার করে উঠল,
"লাল বোতাম!"
"মানুষ আগে!"
মারুফ বললেন,
"এক মিনিট।"
"এটা হয়তো সত্যিই ফাঁদ।"
মিতু শান্তভাবে তিনটি বোতামের দিকে তাকিয়ে রইল।
"এত বড় সিস্টেম..."
"...এত সহজ সিদ্ধান্ত দেবে?"
---
মেহেদী নড়ল না।
সে শুধু চারদিকে তাকাতে লাগল।
ছাদ।
দেয়াল।
কাঁচের ঘর।
তারপর মেঝে।
প্রায় দুই মিনিট কেটে গেল।
ডিজিটাল মুখটি বলল,
"তুমি সিদ্ধান্ত নিচ্ছ না কেন?"
মেহেদী হেসে ফেলল।
"কারণ..."
"...প্রশ্নটাই ভুল।"
ঘরে সবাই তার দিকে তাকাল।
---
মেহেদী ধীরে ধীরে কাঁচের ঘরের কাছে গেল।
তিনজন মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাস পর্যবেক্ষণ করল।
তারপর মিতুকে ডাকল।
"তুই একবার দেখ।"
মিতু কয়েক সেকেন্ড পরীক্ষা করে ভ্রু কুঁচকে ফেলল।
"অদ্ভুত..."
"কী?"
"এদের বুক ওঠানামা করছে..."
"...কিন্তু অক্সিজেন মাস্কে গ্যাসের প্রবাহ নেই।"
---
মেহেদী এবার কাঁচে টোকা দিল।
ফাঁপা শব্দ।
সে নিচু হয়ে কাঁচের নিচের ধাতব অংশ দেখল।
সেখানে খুব ছোট করে লেখা।
DISPLAY UNIT - BIO MODEL
সে ধীরে ধীরে হেসে উঠল।
---
ডিজিটাল মুখ প্রথমবারের মতো কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
মেহেদী ঘুরে স্ক্রিনের দিকে তাকাল।
"এরা মানুষ না।"
"এগুলো উন্নতমানের জৈব মডেল।"
"শুধু আমাদের সিদ্ধান্ত পরীক্ষা করার জন্য রাখা হয়েছে।"
সৌরভ হতভম্ব।
"মানে... পুতুল?"
মিতু বলল,
"পুরোপুরি পুতুল না।"
"চিকিৎসা গবেষণায় ব্যবহৃত জীবন্ত টিস্যুভিত্তিক প্রশিক্ষণ মডেলের মতো কিছু হতে পারে।"
---
হঠাৎ সব স্ক্রিনে লেখা ভেসে উঠল।
> পরীক্ষা সফল।
ডিজিটাল মুখটি বলল,
"অভিনন্দন, মেহেদী।"
"তুমি প্রথম ব্যক্তি..."
"...যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রশ্নটাকেই যাচাই করেছ।"
---
তারপর হলঘরের এক পাশে লুকানো একটি দরজা খুলে গেল।
ভেতরে একটি ছোট কক্ষ।
কক্ষের মাঝখানে একটি মাত্র কম্পিউটার।
স্ক্রিনে একটি ভিডিও অপেক্ষা করছে।
শিরোনাম।
FOR MEHEDI ONLY
মারুফ বললেন,
"আমরা বাইরে থাকছি।"
মেহেদী একা ঘরে ঢুকল।
ভিডিও চালু হলো।
স্ক্রিনে একজন বৃদ্ধ মানুষ।
চোখে ক্লান্তি।
কিন্তু মুখে দৃঢ়তা।
তিনি বললেন,
"মেহেদী..."
"যদি তুমি এই ভিডিও দেখো, তাহলে বুঝব তুমি টিউরিং পরীক্ষার প্রথম ধাপ পেরিয়েছ।"
"আমি ড. আরিফ সালেহ।"
মেহেদীর বুক ধক করে উঠল।
এটাই প্রথমবার...
ড. আরিফ সরাসরি তার সঙ্গে কথা বলছেন।
ভিডিওতে তিনি আরও বললেন,
"তোমার সম্পর্কে এমন একটি সত্য আছে..."
"...যা তুমি এখনও জানো না।"
তিনি টেবিলের ওপর একটি পুরোনো জন্মসনদ রাখলেন।
"এই নথিটা দেখার পর..."
"...তুমি হয়তো নিজের পরিচয় নিয়েই প্রশ্ন করবে।"
ভিডিও হঠাৎ থেমে গেল।
স্ক্রিনে লেখা ভেসে উঠল:
> "পরবর্তী অংশ দেখতে হলে প্রমাণ করো যে সত্য জানার জন্য তুমি প্রস্তুত।"
মেহেদী ধীরে ধীরে টেবিলের ওপর রাখা জন্মসনদটির দিকে হাত বাড়াল।
আর ঠিক তখনই তার চোখ পড়ল সেখানে লেখা বাবার নামের ওপর।
সে স্থির হয়ে গেল।
কারণ...
সেখানে তার বাবার পরিচিত নামটি লেখা নেই।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।