কেস ৩: অভিশপ্ত বৃত্ত
পর্ব ৭: লাল আলোর আতঙ্ক
এক মুহূর্তের মধ্যে পুরো মাঠের নিচে জ্বলতে থাকা নীল আলোগুলো রক্তলাল হয়ে উঠল।
চারদিকে শুধু চিৎকার।
"আগুন লেগেছে!"
"দৌড়াও!"
"বাঁচাও!"
মানুষ একে অপরকে ধাক্কা দিয়ে বের হতে শুরু করল।
কয়েকজন শিশু মাটিতে পড়ে গেল।
দুজন বৃদ্ধ পদদলিত হওয়ার উপক্রম।
মারুফ চিৎকার করলেন,
"পুলিশ! সবাই লাইন করে বের হন!"
কিন্তু আতঙ্কের সময় খুব কম মানুষই নির্দেশ শুনছিল।
---
মেহেদী কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে পুরো দৃশ্য দেখল।
তারপর হঠাৎ মঞ্চের দিকে দৌড় দিল।
সৌরভ অবাক হয়ে চিৎকার করল,
"কোথায় যাচ্ছিস?"
"মানুষকে থামাতে!"
---
মঞ্চে উঠে মেহেদী একটি মেগাফোন তুলে নিল।
কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় সেটি কাজ করল না।
সে চারদিকে তাকিয়ে হঠাৎ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের বড় ঢাকটি দেখতে পেল।
একজন শিল্পীর কাছ থেকে কাঠি নিয়ে সে জোরে জোরে ঢাক বাজাতে শুরু করল।
ঢুম! ঢুম! ঢুম!
একটানা পাঁচ-ছয়বার।
হঠাৎ অনেকেই দৌড় থামিয়ে তাকাল।
অপ্রত্যাশিত শব্দে তাদের মনোযোগ কয়েক সেকেন্ডের জন্য সরে গেল।
এই সুযোগে মেহেদী গলা ফাটিয়ে চিৎকার করল,
"আগুন লাগেনি!"
"মাটিতে হাত দিয়ে দেখুন!"
"কোথাও তাপ নেই!"
---
কয়েকজন সাহস করে নিচু হয়ে হাত দিল।
একজন শিক্ষক বিস্মিত হয়ে বললেন,
"সত্যিই তো..."
"মাটি ঠান্ডা!"
এই কথা মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল।
যে আতঙ্ক কয়েক মুহূর্ত আগে দাবানলের মতো ছড়িয়েছিল, সেটাই এবার ধীরে ধীরে কমতে লাগল।
---
এদিকে মারুফ ও দুই কনস্টেবল পানির ট্যাংকের দিকে ছুটে গেছেন।
কিন্তু উপরে পৌঁছে দেখলেন...
কেউ নেই।
শুধু একটি কালো ব্যাগ।
ব্যাগের ভেতরে একটি দূরবীন।
একটি রেডিও ট্রান্সমিটার।
আর একটি ছোট ড্রোনের রিমোট কন্ট্রোল।
মারুফ দাঁত চেপে বললেন,
"আবার পালিয়ে গেল।"
---
মাঠে ফিরে এসে মিতু একটি লাল আলো খুঁড়ে বের করল।
সবাই অবাক হয়ে দেখল...
ওটা কোনো আগুন নয়।
একটি ছোট জলরোধী LED মডিউল।
তার সঙ্গে পাতলা তার জোড়া।
সৌরভ বলল,
"এতগুলো লাগিয়েছে কীভাবে?"
মেহেদী চারদিকে তাকিয়ে বলল,
"একদিনে না।"
"অনেক দিন ধরে।"
"সম্ভবত মাঠ সংস্কারের কাজের আড়ালে বা রাতে।"
---
ঠিক তখনই স্কুলের প্রধান শিক্ষক এগিয়ে এলেন।
তিনি কাঁপা গলায় বললেন,
"দুই মাস আগে কিছু লোক এসেছিল।"
"বলেছিল তারা মাটির নিচে নতুন সেচ লাইনের জরিপ করছে।"
মেহেদীর চোখ চকচক করে উঠল।
"তাদের কোনো পরিচয়পত্র ছিল?"
"ছিল।"
"কোন প্রতিষ্ঠানের?"
"মনে নেই..."
"তবে তাদের গায়ে নীল রঙের ইউনিফর্ম ছিল।"
---
সৌরভ ব্যাগে পাওয়া রিমোটটি পরীক্ষা করতে গিয়ে বলল,
"মেহেদী, এটা দেখ।"
রিমোটের পেছনে ছোট্ট একটি স্টিকার।
তাতে লেখা,
NEXUS ENGINEERING SERVICES
মিতু বলল,
"ভুয়া কোম্পানি?"
মারুফ উত্তর দিলেন,
"আগামী এক ঘণ্টার মধ্যে জেনে ফেলব।"
---
ঠিক তখনই শাহীনুর মাঠের মাঝখান থেকে চিৎকার করল।
"এদিকে আসো!"
সবাই দৌড়ে গেল।
মাটির নিচে প্রধান কন্ট্রোল ইউনিটের পাশে একটি ধাতব বাক্স।
কিন্তু এবার কোনো টাইমার নেই।
ভেতরে শুধু একটি খাম।
খামের ওপর লেখা,
"মেহেদীর জন্য।"
---
মেহেদী ধীরে ধীরে খামটি খুলল।
ভেতরে একটি দাবার বোর্ডের ছবি।
সব ঘুঁটি সাজানো।
কিন্তু একটি ঘোড়া লাল কালি দিয়ে চিহ্নিত।
ছবির নিচে লেখা,
> "তুমি সব সময় খুনিকে খুঁজছ।"
> "কখনও ভেবেছ, যদি খুনি ইচ্ছা করেই তোমাকে পথ দেখায়?"
আরও নিচে একটি লাইন।
> "তোমার দলে একজন আছে... যে এখনও জানে না, সে আমার জন্য কাজ করছে।"
কয়েক সেকেন্ডের জন্য সময় যেন থেমে গেল।
সৌরভ প্রথমে মেহেদীর দিকে তাকাল।
তারপর শাহীনুরের দিকে।
মিতু নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল।
মারুফ ধীরে বললেন,
"এটা আমাদের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি করার চেষ্টা হতে পারে।"
মেহেদী কোনো উত্তর দিল না।
সে শুধু কাগজটা ভাঁজ করে পকেটে রাখল।
তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,
"আজ থেকে..."
"...আমরা কাউকে সন্দেহ করব না।"
"কিন্তু কাউকেই অন্ধভাবে বিশ্বাসও করব না।"
দূরে তখন সূর্য ডুবে যাচ্ছে।
আর ঠিক সেই সময় মেহেদীর ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে মাত্র তিন সেকেন্ডের একটি ভিডিও এসে পৌঁছাল।
ভিডিওতে একটি অন্ধকার ঘর।
চেয়ারে বাঁধা একজন মানুষ।
মুখে কাপড়।
ভিডিও শেষ হওয়ার ঠিক আগে লোকটি মাথা তুলল।
মারুফ হতভম্ব হয়ে ফিসফিস করলেন,
"এটা তো..."
"...কেসের প্রথম ভিকটিম আবদুল কাদের!"
কিন্তু তিনি তো তিন দিন আগেই মারা গেছেন।
তাহলে...
এই ভিডিওটি রেকর্ড করা হয়েছিল কবে?
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।