কেস ৩: অভিশপ্ত বৃত্ত
পর্ব ১৫: জীবিত না প্রতিধ্বনি?
ঘরের ভেতর এমন নীরবতা নেমে এল যে পুরোনো দেয়ালের ফাটল দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ার শব্দও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল।
মারুফ ধীরে ধীরে টেলিফোনের রিসিভারটি নামিয়ে রাখলেন।
তাঁর চোখ স্থির।
হাত কাঁপছে।
মেহেদী প্রথমবারের মতো তাঁকে এতটা ভেঙে পড়তে দেখল।
"আংকেল..."
মারুফ কোনো উত্তর দিলেন না।
প্রায় এক মিনিট পরে তিনি খুব নিচু স্বরে বললেন,
"ওটা... মাহিরের কণ্ঠই ছিল।"
---
মিতু শান্তভাবে বলল,
"মানুষের কণ্ঠ নকল করার প্রযুক্তি এখন অনেক উন্নত।"
"রেকর্ড করা নমুনা ব্যবহার করে কৃত্রিমভাবে কণ্ঠ তৈরি করা সম্ভব।"
"তাই শুধু কণ্ঠ শুনে নিশ্চিত হওয়া যাবে না।"
মেহেদী মাথা নাড়ল।
"একদম ঠিক।"
"আমরা অনুভূতির ওপর না, প্রমাণের ওপর চলব।"
---
ঠিক তখনই সৌরভ টেলিফোনটির দিকে তাকিয়ে বলল,
"একটা জিনিস অদ্ভুত।"
"কী?"
"এই লাইন তো বহু বছর ধরে বন্ধ।"
মারুফ টেলিফোন সেটটি খুলে দেখলেন।
কয়েক সেকেন্ড পর তাঁর চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
"এটা..."
"কী হয়েছে?"
"এই ফোনে বাইরের কোনো লাইনই সংযুক্ত নেই।"
সবাই একসঙ্গে এগিয়ে এল।
সত্যিই...
টেলিফোনের পেছনের প্রধান তার কাটা।
অর্থাৎ কয়েক মুহূর্ত আগে যে ফোন এসেছিল...
সেটা এই লাইনে আসার কথা নয়।
---
মেহেদী টেবিলের নিচে ঝুঁকে দেখল।
একটি ছোট কালো বাক্স।
বাক্সের সঙ্গে সংযুক্ত ক্ষুদ্র স্পিকার।
আর একটি রেডিও রিসিভার।
সে বাক্সটি খুলে হেসে ফেলল।
সৌরভ বিরক্ত হয়ে বলল,
"আবার হাসছিস কেন?"
মেহেদী বাক্সটা সবার সামনে ধরল।
"কারণ..."
"...এটা টেলিফোন ছিলই না।"
"এটা আগে থেকেই বসানো একটি বেতার অডিও ডিভাইস।"
"রিংটোন, কণ্ঠ, সবই দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।"
মারুফ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
"অর্থাৎ আবারও মনস্তাত্ত্বিক চাল।"
---
ঠিক তখনই মিতু ফরেনসিক ল্যাব থেকে আরেকটি রিপোর্ট পেল।
বৃদ্ধ রফিকুল ইসলামের শরীর থেকে গুলিটি বের করা হয়েছে।
কিন্তু রিপোর্টের শেষ লাইন পড়ে সে থমকে গেল।
"মেহেদী..."
"শোন।"
"গুলির ভেতরে খুব ক্ষুদ্র একটি কাচের ক্যাপসুল ছিল।"
"ক্যাপসুল?"
"হ্যাঁ।"
"তার ভেতরে..."
"...একটি মাইক্রো এসডি কার্ড।"
ঘরের সবাই একসঙ্গে তাকাল।
---
কার্ডটি ল্যাপটপে ঢোকানো হলো।
ভেতরে মাত্র একটি ফাইল।
LAB7_LOG.txt
মেহেদী ফাইলটি খুলল।
প্রথম কয়েকটি লাইন গবেষণার নোট।
তারপর হঠাৎ একটি বাক্য তার দৃষ্টি আটকে দিল।
> "LAB-7 কোনো ল্যাব নয়।"
> "LAB-7 হলো সপ্তম পরীক্ষাধীন ব্যক্তি।"
সৌরভ বিস্ময়ে বলল,
"পরীক্ষাধীন ব্যক্তি?"
---
মেহেদী দ্রুত পরের লাইন পড়ল।
> Subject M-1 : মৃত
> Subject M-2 : নিখোঁজ
> Subject M-3 : ব্যর্থ
তারপর...
> Subject M-7 : সফল
ঘরে আবার নিস্তব্ধতা।
---
মিতু ধীরে বলল,
"তাহলে..."
"LAB-7 আসলে একজন পরীক্ষার অংশগ্রহণকারী।"
মেহেদী মাথা নাড়ল।
"আর M সম্ভবত Subject-এর সিরিজ।"
"অর্থাৎ আমরা এতক্ষণ ভুল পথে ভাবছিলাম।"
---
ঠিক তখনই ফাইলের শেষ লাইনটি খুলল।
সবাই নিঃশ্বাস আটকে পড়তে লাগল।
> "Subject M-7-এর প্রকৃত নাম নিরাপত্তার কারণে মুছে ফেলা হয়েছে।"
কিন্তু নামের জায়গায় পুরোটা মুছে যায়নি।
দুটি অক্ষর রয়ে গেছে।
ME......
সৌরভ ফিসফিস করে বলল,
"মেহেদী?"
মারুফ সঙ্গে সঙ্গে বললেন,
"অসম্ভব।"
"ওর জন্মও তখন হয়নি।"
মিতু বলল,
"হয়তো অন্য কোনো নাম।"
মেহেদী চুপচাপ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তার বুকের ভেতর অদ্ভুত অস্বস্তি জমতে লাগল।
---
ঠিক সেই সময় শাহীনুর জানালার পাশে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল।
"বাইরে দেখো!"
সবাই দৌড়ে বাইরে এল।
বৃষ্টিভেজা মাটিতে কেউ সাদা রঙ দিয়ে একটি বিশাল বৃত্ত এঁকে গেছে।
বৃত্তের মাঝখানে রাখা একটি কাঠের বাক্স।
কেউ আসতে দেখেনি।
কেউ যেতে দেখেনি।
মেহেদী ধীরে ধীরে বাক্সটির কাছে এগিয়ে গেল।
ভেতরে একটি ছোট আয়না।
আয়নার নিচে ভাঁজ করা একটি কাগজ।
সে কাগজটি খুলল।
সেখানে মাত্র একটি বাক্য।
> "তুমি যতই আমার পেছনে ছুটো, শেষ পর্যন্ত তোমাকে নিজের অতীতের দিকেই তাকাতে হবে।"
মেহেদী আয়নাটার দিকে তাকাল।
কিন্তু আয়নায় শুধু তার নিজের মুখই দেখা যাচ্ছিল না।
আয়নার পেছনে খোদাই করা ছিল একটি নাম...
"মেহেদী হাসান"।
সে স্থির হয়ে গেল।
কারণ...
এই নামটি তার নিজের পুরো নামের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।