পর্ব ১৪: স্মৃতির দরজা
ল্যাবের ভেতর কেউ একটি শব্দও করছিল না।
কম্পিউটারের স্ক্রিনে এখনও জ্বলছে দুটি লাইন।
> IMPLANT S-03 DETECTED
MEMORY ARCHIVE AVAILABLE
মেহেদীর বুকের ভেতর ধুকপুকানি বেড়ে গেল।
সে জানত, মানুষের স্মৃতি কোনো ভিডিও ফাইলের মতো সংরক্ষণ করা যায় না। কিন্তু যদি এই চিপ শুধু মস্তিষ্কের কিছু স্নায়বিক সংকেত বা পরীক্ষামূলক তথ্য রেকর্ড করে থাকে, তাহলে হয়তো মৃত্যুর আগে ঘটে যাওয়া কিছু মুহূর্ত সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।
মিতু নিচু গলায় বলল,
"এটা খুব সাবধানে করতে হবে। যদি ডেটা নষ্ট হয়ে যায়, দ্বিতীয় সুযোগ পাব না।"
সৌরভ একটি বিশেষ অ্যাডাপ্টারের মাধ্যমে চিপটিকে কম্পিউটারের সঙ্গে যুক্ত করল।
কয়েক সেকেন্ড কিছুই হলো না।
তারপর স্ক্রিনে একটি সতর্কবার্তা ভেসে উঠল।
> WARNING
Data Integrity: 38%
সৌরভ বলল,
"মাত্র আটত্রিশ শতাংশ ডেটা অক্ষত আছে।"
মেহেদী শান্ত গলায় বলল,
"যতটুকু আছে, ততটুকুই চালাও।"
---
লোডিং শেষ হতেই স্ক্রিন অন্ধকার হয়ে গেল।
তারপর অস্পষ্ট, কাঁপতে থাকা কিছু দৃশ্য দেখা গেল।
মনে হচ্ছিল কেউ হাঁটছে।
চারপাশে অন্ধকার করিডোর।
শুধু লাল জরুরি বাতি জ্বলছে।
হঠাৎ একজন মানুষের কণ্ঠ ভেসে এল।
"চোখ খুলুন... আপনি আমাকে শুনতে পাচ্ছেন?"
দৃশ্যটা কেঁপে উঠল।
একজন সাদা কোট পরা মানুষ সামনে ঝুঁকে এল।
তার মুখ পুরো দেখা যাচ্ছে না।
কিন্তু বুকের ব্যাজে স্পষ্ট লেখা...
R. Kabir
মারুফ অবাক হয়ে বললেন,
"রাশেদ কবির!"
মেহেদী মাথা নাড়ল।
"না... নিশ্চিত না। শুধু আদ্যক্ষর মিলেছে।"
---
ভিডিও এগোতে লাগল।
স্ট্রেচারে শুয়ে থাকা মানুষটিকে একটি কক্ষে নিয়ে যাওয়া হলো।
ঘরের মাঝখানে অদ্ভুত আকৃতির একটি ধাতব যন্ত্র।
মাথার চারপাশে অসংখ্য ইলেকট্রোড।
দেয়ালে লেখা বড় অক্ষরে—
PROJECT NIRVANA - CHAMBER 2
মিতু ধীরে বলল,
"এটা ইইজি বা ব্রেন-সিগন্যাল রেকর্ডিং সিস্টেমের পরিবর্তিত সংস্করণের মতো দেখাচ্ছে।"
মেহেদী যোগ করল,
"অর্থাৎ 'জাদু' নয়... পুরো বিষয়টাই স্নায়ুবিজ্ঞানের পরীক্ষা।"
---
ঠিক তখনই ভিডিওতে আরেকজন প্রবেশ করল।
লোকটির মুখ দেখা যাচ্ছে না।
সে শুধু বলল,
"ড. আরিফ এখনও রাজি হননি।"
অন্য একজন উত্তর দিল,
"তাহলে তাঁর গবেষণাই ব্যবহার করো। মানুষ নয়, ধারণাই গুরুত্বপূর্ণ।"
মেহেদীর চোখ সরু হয়ে গেল।
"মানে..."
সে ফিসফিস করে বলল,
"ড. আরিফ হয়তো এই পরীক্ষার নির্মাতা ছিলেন, কিন্তু পরিচালক ছিলেন না।"
---
ভিডিওর শেষ অংশে হঠাৎ সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল।
দৌড়ানোর শব্দ।
চিৎকার।
তারপর একজন আতঙ্কিত মানুষ ক্যামেরার খুব কাছে এসে বলল,
"যদি কেউ এটা দেখে..."
"...মনে রাখবেন..."
কথা শেষ হওয়ার আগেই তীব্র বৈদ্যুতিক শব্দ হলো।
ভিডিও বন্ধ।
---
ল্যাবে আবার নীরবতা।
মারুফ বললেন,
"অন্তত একটা বিষয় পরিষ্কার।"
"কী?"
"রাশেদ কবির এই প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত।"
মেহেদী সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।
"না।"
সবাই তার দিকে তাকাল।
"আমরা শুধু 'R. Kabir' লেখা একটা ব্যাজ দেখেছি।"
"হতে পারে রাশেদ কবির।"
"আবার অন্য কেউও হতে পারে।"
"প্রমাণ ছাড়া কাউকে অপরাধী ভাবা যাবে না।"
মারুফ মৃদু হেসে বললেন,
"এই জন্যই তোকে আমার ভালো লাগে।"
---
ঠিক তখনই শাহীনুর একটি পুরোনো ফাইল নিয়ে এল।
"এই দেখ!"
ফাইলটি কারখানার অফিস থেকে উদ্ধার করা।
ভেতরে কর্মচারীদের উপস্থিতির তালিকা।
অনেক নাম কেটে দেওয়া।
কিন্তু একটি নামের পাশে লাল কালি দিয়ে লেখা—
"বিশ্বাসঘাতক।"
নামটি পড়ে সবাই চুপ হয়ে গেল।
ড. আরিফ সালেহ।
তার নিচে আরেকটি নাম।
ড. রাশেদ কবির।
তার পাশেও লাল কালি।
কিন্তু সেখানে লেখা—
"পর্যবেক্ষণে।"
মেহেদী ধীরে বলল,
"দেখছ?"
"এখানে রাশেদকে শত্রু বলা হয়নি।"
"বরং তাকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে।"
---
রাত গভীর।
সবাই বিশ্রাম নিতে গেছে।
শুধু মেহেদী একা বসে কেসের নোট লিখছে।
হঠাৎ তার ফোনে একটি অজানা নম্বর থেকে ভিডিও কল এল।
সে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে রিসিভ করল।
স্ক্রিনে ঝাপসা ছবি।
ধীরে ধীরে পরিষ্কার হলো।
একটি অন্ধকার ঘর।
মাঝখানে একটি চেয়ার।
চেয়ারে বাঁধা একজন বৃদ্ধ।
মুখে আঘাতের চিহ্ন।
চোখ আধখোলা।
বৃদ্ধ কষ্ট করে মাথা তুললেন।
মেহেদীর বুক ধক করে উঠল।
তিনি...
ড. আরিফ সালেহ।
তিনি খুব কষ্ট করে মাত্র তিনটি শব্দ বললেন—
"মেহেদী... পালিয়ে যাও..."
ঠিক তখনই ক্যামেরার বাইরে থেকে একটি হাত এগিয়ে এসে ভিডিও বন্ধ করে দিল।
কল কেটে যাওয়ার আগে এক সেকেন্ডের জন্য একটি কণ্ঠ শোনা গেল।
> "এখনও সময় আছে। না হলে পরের Subject হবে... মেহেদী।"
ফোনের স্ক্রিন অন্ধকার হয়ে গেল।
মেহেদী ধীরে ধীরে ফোনটা নামিয়ে রাখল।
এখন আর এটা শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নয়।
এটা এমন একজন অদৃশ্য প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, যে তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ জানে, বিজ্ঞানকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, আর সব সময় এক ধাপ এগিয়ে থাকে।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।