কেস ২: স্মৃতি চোর
পর্ব ২৬: পুরোনো রেলস্টেশনের ফাঁদ
রাতভর কারও চোখে ঘুম এল না।
পুরোনো রেলস্টেশনে যাওয়া উচিত কি না, তা নিয়ে থানার তদন্তকক্ষে দীর্ঘ আলোচনা চলল।
মারুফ দৃঢ় গলায় বললেন,
"এটা স্পষ্ট ফাঁদ।"
সৌরভ সঙ্গে সঙ্গে সায় দিল।
"অবশ্যই। ওরা চাইছে মেহেদী একা যাক।"
কিন্তু মেহেদী চুপচাপ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল।
কয়েক মিনিট পর সে বলল,
"হ্যাঁ, এটা ফাঁদ।"
"কিন্তু ফাঁদ সব সময় ক্ষতির জন্য পাতা হয় না। কখনও কখনও কেউ ইচ্ছা করেও ফাঁদ বানায়, যাতে শুধু নির্দিষ্ট একজনই সেখানে পৌঁছায়।"
মিতু ভ্রু কুঁচকে বলল,
"মানে?"
"যদি সত্যিই M-17 আমাদের সাহায্য করতে চায়, তাহলে সে হয়তো জানে ASTER আমাদের প্রতিটি ফোন, প্রতিটি গাড়ি, এমনকি পুলিশের গতিবিধিও নজরদারি করছে। তাই 'একা আসো' বলেছে।"
মারুফ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
"ঠিক আছে। তুই একা যাবি।"
সৌরভ অবাক হয়ে উঠল।
"আংকেল!"
মারুফ শান্তভাবে বললেন,
"চোখে একা।"
"কিন্তু বাস্তবে না।"
---
পরদিন সকাল।
ঘড়িতে ঠিক আটটা।
শহরের প্রান্তে অবস্থিত পুরোনো রেলস্টেশনটি বহু বছর আগেই পরিত্যক্ত হয়েছে।
মরিচা ধরা লাইন।
ভাঙা টিকিট কাউন্টার।
প্ল্যাটফর্মে আগাছা।
মেহেদী ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল।
দূর থেকে মনে হচ্ছিল, সে সত্যিই একা এসেছে।
কিন্তু বাস্তবে...
মারুফ এবং দুইজন স্নাইপার প্রায় তিনশ মিটার দূরের একটি পরিত্যক্ত গুদামে অবস্থান নিয়েছেন।
সৌরভ ড্রোন ক্যামেরা দিয়ে পুরো এলাকা পর্যবেক্ষণ করছে।
মিতু একটি ভ্যানে বসে যোগাযোগ ব্যবস্থা সামলাচ্ছে।
শাহীনুর স্টেশনের পশ্চিম পাশে নজর রাখছে।
সবকিছু পরিকল্পনামাফিক।
---
মেহেদী প্ল্যাটফর্মের মাঝখানে এসে দাঁড়াল।
চারদিকে নীরবতা।
হঠাৎ...
একটি পুরোনো লাউডস্পিকার নিজে থেকেই চালু হয়ে গেল।
ঝিরঝির শব্দের পর একটি পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল।
"তুমি সময়মতো এসেছ, মেহেদী।"
সে চারদিকে তাকাল।
"তুমি কে?"
কণ্ঠটি হাসল।
"আজ নাম জানার দিন নয়।"
"আজ পরীক্ষা।"
---
ঠিক তখনই প্ল্যাটফর্মের অন্য প্রান্তে একটি ছোট ছেলে দেখা গেল।
বয়স দশ বা এগারো।
স্কুলড্রেস পরা।
সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে মেহেদীর দিকে তাকিয়ে আছে।
মেহেদী ধীরে তার দিকে এগিয়ে গেল।
"তুমি এখানে কী করছ?"
ছেলেটি কোনো উত্তর দিল না।
শুধু একটি কাগজ এগিয়ে দিল।
কাগজে লেখা—
> 'পেছনে তাকিও না।'
মেহেদীর বুক ধক করে উঠল।
এক সেকেন্ড।
দুই সেকেন্ড।
সে পেছনে তাকাল না।
বরং পাশের কাচে নিজের প্রতিফলন দেখার চেষ্টা করল।
ভাঙা কাচে অস্পষ্টভাবে একটা ছায়া দেখা যাচ্ছে।
কেউ একজন...
নিঃশব্দে তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে।
---
ঠিক তখনই ওয়্যারলেসে সৌরভের কণ্ঠ ভেসে এল।
"মেহেদী!"
"তোর পেছনে একজন আছে!"
মেহেদী হঠাৎ ডান দিকে সরে গেল।
ফস্!
তার পাশ দিয়ে একটি ডার্ট উড়ে গিয়ে দেয়ালে গেঁথে গেল।
মিতু চিৎকার করে উঠল,
"ওটা হাতে নিস না! অজানা রাসায়নিক থাকতে পারে!"
মারুফ গর্জে উঠলেন,
"সব ইউনিট! এগিয়ে যাও!"
---
মুহূর্তের মধ্যে চারদিক থেকে পুলিশ এগিয়ে এল।
কিন্তু আক্রমণকারী পালানোর চেষ্টা করল না।
সে প্ল্যাটফর্মের ওপর শান্তভাবে দাঁড়িয়ে রইল।
মুখে কালো মুখোশ।
হাতে কোনো অস্ত্র নেই।
মারুফ বন্দুক তাক করে বললেন,
"হাত ওপরে তুলুন!"
লোকটি ধীরে ধীরে দুই হাত তুলল।
তারপর নিজের মুখোশ খুলে ফেলল।
সবাই স্তব্ধ।
লোকটির বয়স চল্লিশের কাছাকাছি।
চোখে ক্লান্তি।
সে সরাসরি মেহেদীর দিকে তাকিয়ে বলল,
"আমি গুলি চালাতে আসিনি।"
"আমি শুধু নিশ্চিত হতে চেয়েছিলাম..."
"...তুমি এখনও আগের মতোই ভাবো কি না।"
মেহেদী বলল,
"তুমি কে?"
লোকটি কয়েক সেকেন্ড নীরব রইল।
তারপর ধীরে বলল,
"কোডনেম..."
M-17।
পুরো প্ল্যাটফর্ম নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
মারুফ বন্দুক নামালেন না।
"প্রমাণ?"
লোকটি পকেট থেকে একটি পুরোনো পরিচয়পত্র বের করল।
তার ওপরে সরকারি সিল, কিন্তু ছবির অর্ধেক অংশ কেটে ফেলা।
সে পরিচয়পত্রটি মাটিতে রেখে পিছিয়ে গেল।
"আমি কাছে আসব না।"
"কারণ তোমরা এখনও আমাকে বিশ্বাস করবে না।"
---
মেহেদী পরিচয়পত্রটি তুলে নিল।
সে ভালো করে দেখল।
হঠাৎ তার চোখ একটি লাইনে আটকে গেল।
বিশেষ দায়িত্ব: অভ্যন্তরীণ নজরদারি ইউনিট।
M-17 শান্ত গলায় বলল,
"ASTER-এ আমি স্বেচ্ছায় যোগ দিইনি।"
"আমাকে পাঠানো হয়েছিল।"
"ভেতর থেকে তথ্য বের করার জন্য।"
ঠিক তখনই...
দূরের একটি ভবনের ছাদে সূর্যের আলোয় ক্ষণিকের জন্য ধাতব কিছু ঝলসে উঠল।
মেহেদীর চোখ সরু হয়ে গেল।
সে ফিসফিস করে বলল,
"...স্নাইপার!"
পরের মুহূর্তেই একটি গুলির শব্দ আকাশ কাঁপিয়ে দিল।
ঠাস!
M-17-এর বুক ঝাঁকুনি খেল।
সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
মেহেদী দৌড়ে তার কাছে পৌঁছাল।
রক্তে ভিজে যাচ্ছে প্ল্যাটফর্ম।
M-17 কষ্ট করে মেহেদীর হাত চেপে ধরল।
শেষ শক্তিটুকু দিয়ে সে বলল,
> "ডিরেক্টরকে খুঁজো না..."
সে কাশল।
তারপর খুব আস্তে যোগ করল,
> "...ডিরেক্টর তোমাকেই খুঁজছে।"
তার হাত ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে গেল।
দূরে পালিয়ে যাওয়া স্নাইপারের ছায়া মিলিয়ে গেল সকালের কুয়াশায়।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।