কেস ৪: অঘোরী রুদ্রের ছায়া
পর্ব ৩৫: অসমাপ্ত স্মৃতি
ফোনের লাইন কেটে যাওয়ার পরও মেহেদী কয়েক সেকেন্ড রিসিভারটা কানে ধরে দাঁড়িয়ে রইল।
ঘরের সবাই তার দিকে তাকিয়ে।
মারুফ এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন,
"কী বলল?"
মেহেদী ধীরে রিসিভারটা নামিয়ে রাখল।
"সে বলেছে..."
"'আমিই তোমাকে তদন্ত করতে শিখিয়েছিলাম।'"
ঘরে আবার নীরবতা নেমে এল।
---
সৌরভ ভ্রু কুঁচকে বলল,
"কিন্তু তুই তো ছোটবেলা থেকেই রহস্যের বই পড়তিস।"
মেহেদী মাথা নাড়ল।
"হ্যাঁ। কিন্তু একটা বিষয় আমি কখনো ভাবিনি..."
"কোন বিষয়?"
"আমি প্রথম কবে অপরাধস্থল পর্যবেক্ষণ করতে শিখলাম?"
---
প্রশ্নটা শুনে মিতুও থমকে গেল।
সত্যিই তো...
মানুষ সাধারণত মনে রাখতে পারে, কে তাকে সাইকেল চালানো বা সাঁতার শেখায়।
কিন্তু মেহেদীর মনে নেই, কে তাকে এত সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করতে শিখিয়েছিল।
---
ঠিক তখনই মারুফ দোকানের ক্যাশ কাউন্টারের পাশে একটি ছোট ক্যামেরা দেখতে পেলেন।
"এটা এখনো চালু আছে।"
মিতু দ্রুত মেমোরি কার্ড খুলে ল্যাপটপে লাগাল।
ফুটেজ চালু হলো।
কিন্তু আশ্চর্য...
দোকানের কোনো পুরোনো ভিডিও নেই।
মাত্র একটি ভিডিও।
রেকর্ড হয়েছে আজ সন্ধ্যা সাতটায়।
---
ভিডিওতে দেখা গেল, কালো কোট পরা একজন লোক দোকানে ঢুকছে।
তার মুখ ক্যামেরার দিকে নয়।
সে ধীরে ধীরে খামটা কাউন্টারে রাখল।
তারপর ক্যামেরার দিকে না তাকিয়েই বলল,
"মেহেদী, তুমি এখন নিশ্চয়ই ভাবছ আমি তোমার অতীত জানি।"
"সেটা ঠিক।"
"কিন্তু আমি তোমার ভবিষ্যৎও জানি।"
---
লোকটি পকেট থেকে একটি দাবার ঘোড়ার গুটি বের করে কাউন্টারে রাখল।
"তুমি সব সময় ঘোড়ার মতো চাল দাও।"
"অন্যরা যেখানে সরল পথে হাঁটে..."
"...তুমি বাঁক নিয়ে এগোও।"
---
ভিডিও শেষ হওয়ার আগে লোকটি আরেকটি কথা বলল।
"তোমার সবচেয়ে বড় ভুল..."
"...তুমি মনে করো, আমি তোমাকে পর্যবেক্ষণ করছি।"
"আসলে..."
"...তুমি নিজেই নিজেকে পর্যবেক্ষণ করছ।"
ভিডিও শেষ।
---
শাহীনুর বিরক্ত হয়ে বলল,
"লোকটা সব সময় ধাঁধা দিয়ে কথা বলে কেন?"
মেহেদী উত্তর দিল,
"কারণ ধাঁধা মানুষের চিন্তার গতি কমিয়ে দেয়।"
"যখন তুমি অর্থ খুঁজতে ব্যস্ত থাকো..."
"...তখন সে নিজের পরের চালটা দিয়ে দেয়।"
---
মিতু দাবার গুটিটা হাতে নিয়ে দেখল।
ঘোড়ার নিচে ছোট্ট একটা খাঁজ।
সে সাবধানে খুলতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটি ক্ষুদ্র মাইক্রোএসডি কার্ড।
"এটা ইচ্ছে করেই রেখে গেছে।"
---
কার্ডটি ল্যাপটপে ঢোকানো হলো।
ভেতরে অসংখ্য ফাইল।
কিন্তু সব এনক্রিপ্টেড।
শুধু একটি ভিডিও চালু হলো।
ভিডিওতে একজন বৃদ্ধ অধ্যাপক লেকচার দিচ্ছেন।
পেছনের বোর্ডে লেখা—
মানুষের উপলব্ধি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ।
অধ্যাপক বলছেন,
"আজকের ক্লাসে তোমাদের একটা পরীক্ষা নেওয়া হবে।"
ক্যামেরা ধীরে ধীরে ছাত্রদের দিকে ঘুরল।
প্রথম সারিতে বসে আছে...
বারো-তেরো বছরের মেহেদী।
---
সৌরভ বিস্ময়ে বলল,
"এটা তো তোরই মতো!"
মেহেদী কিছু বলল না।
সে ভিডিওর দিকে তাকিয়ে রইল।
---
অধ্যাপক টেবিলের ওপর একটি লাল বল রাখলেন।
তারপর জিজ্ঞেস করলেন,
"এই বলটার রং কী?"
সব ছাত্র একসঙ্গে বলল,
"লাল।"
কিন্তু ছোট মেহেদী হাত তুলল।
"স্যার..."
"আমরা কি আলো পরীক্ষা করেছি?"
অধ্যাপক হেসে বললেন,
"কেন?"
"কারণ আলোর রং বদলালে..."
"...বস্তুর রংও ভিন্ন দেখাতে পারে।"
---
ভিডিও হঠাৎ থেমে গেল।
মারুফ বিস্মিত হয়ে বললেন,
"এত ছোট বয়সে তুই এমন প্রশ্ন করেছিলি?"
মেহেদী ধীরে মাথা নাড়ল।
"আমি জানি না।"
"এই স্মৃতিটা আমার মনে নেই।"
---
ঠিক তখনই ভিডিওর শেষ ফ্রেমে মাত্র এক সেকেন্ডের জন্য একটি নাম ভেসে উঠল।
Professor Afsar Rahman
মারুফ সঙ্গে সঙ্গে বললেন,
"এই নামটা আমার পরিচিত লাগছে।"
তিনি ফোন বের করে পুরোনো পুলিশ ডাটাবেসে খুঁজলেন।
কয়েক মিনিট পর তথ্য বেরিয়ে এল।
অধ্যাপক আফসার রহমান।
কগনিটিভ সায়েন্স গবেষক।
দশ বছর আগে হঠাৎ নিখোঁজ।
মামলার তদন্ত হয়েছিল...
কিন্তু কোনো দেহ, কোনো প্রমাণ, কোনো সন্দেহভাজন কখনো পাওয়া যায়নি।
মেহেদী আস্তে করে ল্যাপটপ বন্ধ করল।
তার চোখে এবার নতুন দৃঢ়তা।
"আমরা এতদিন ভুল প্রশ্ন করেছি।"
মিতু তাকাল।
"মানে?"
মেহেদী বলল,
"আমরা ভাবছিলাম, রুদ্র কে?"
"এখন থেকে প্রশ্ন হবে..."
"রুদ্রকে তৈরি করেছে কে?"
ঠিক তখনই মারুফের ফোনে ফরেনসিক ল্যাব থেকে রিপোর্ট এলো।
স্কুলের ঝাড়ুদারের ছদ্মবেশে পাওয়া কৃত্রিম দাড়ি থেকে একটি আংশিক আঙুলের ছাপ উদ্ধার হয়েছে।
আর সেই ছাপ...
কোনো অপরাধীর নয়।
সেটা মিলে গেছে...
নিখোঁজ অধ্যাপক আফসার রহমানের সঙ্গে।
ঘরের সবাই একসঙ্গে নিঃশ্বাস আটকে ফেলল।
যদি রিপোর্ট ঠিক হয়...
তাহলে দশ বছর ধরে নিখোঁজ মানুষটি হয় জীবিত,
অথবা কেউ ইচ্ছা করে তাঁর পরিচয় ব্যবহার করছে।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।