পর্ব ১৫: অদৃশ্য শত্রু
রাত তখন প্রায় আড়াইটা।
ড. আরিফ সালেহর ভিডিও কলটি বারবার চালিয়ে দেখছে মেহেদী। অন্যরা ঘুমিয়ে পড়লেও তার চোখে ঘুম নেই।
ভিডিওটি মাত্র আট সেকেন্ডের।
কিন্তু সেই আট সেকেন্ডেই লুকিয়ে থাকতে পারে এমন কোনো সূত্র, যা পুরো তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
সে ভিডিওটি ফ্রেম বাই ফ্রেম চালাতে শুরু করল।
প্রথম ফ্রেম।
ড. আরিফের মুখ।
দ্বিতীয় ফ্রেম।
চেয়ারের বাঁ হাতল।
তৃতীয় ফ্রেম।
পেছনের দেয়াল।
চতুর্থ ফ্রেমে এসে সে হঠাৎ ভিডিও থামিয়ে দিল।
"পেয়েছি..."
সৌরভ তখনও জেগে ছিল। সে এগিয়ে এসে বলল,
"কী পেয়েছিস?"
মেহেদী স্ক্রিনে আঙুল রাখল।
দেয়ালের ওপর একটি ছোট গোল চিহ্ন।
প্রথম দেখায় মনে হয় মরিচা।
কিন্তু জুম করতেই দেখা গেল, সেটা একটি বায়ুচলাচলের ভেন্ট।
ভেন্টের গায়ে লেখা আছে,
B-17
---
সকালে সবাই মিলে সেই তথ্য নিয়ে আলোচনা শুরু করল।
মিতু বলল,
"শুধু একটা ভেন্ট নম্বর দিয়ে কি লোকেশন বের করা সম্ভব?"
মেহেদী মাথা নাড়ল।
"না।"
"তাহলে?"
"যদি আমরা জানি, এই ধরনের ভেন্ট কোন কোম্পানি বানায়, তাহলে হয়তো কারখানার নকশা খুঁজে পাওয়া যাবে।"
মারুফ সঙ্গে সঙ্গে প্রকৌশল অধিদপ্তরের এক পরিচিত কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করলেন।
দুপুরের মধ্যেই উত্তর এল।
B-17 সিরিজের ভেন্ট প্রায় দশ বছর আগে মাত্র তিনটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ব্যবহার করা হয়েছিল।
একটি বন্ধ ওষুধ কারখানা, যেটা তারা আগেই ঘুরে এসেছে।
একটি পুরোনো গবেষণাগার, যেটা পাঁচ বছর আগে আগুনে পুড়ে যায়।
আর...
একটি ভূগর্ভস্থ রাসায়নিক সংরক্ষণাগার।
যেটি এখন সরকারি নথিতে পরিত্যক্ত।
---
"আমরা আজ রাতেই সেখানে যাব।"
মারুফের সিদ্ধান্তে কেউ আপত্তি করল না।
---
রাত সাড়ে নয়টা।
চারদিকে ঘন কুয়াশা।
পরিত্যক্ত সংরক্ষণাগারটি জঙ্গলের ভেতরে।
বাইরে থেকে দেখে মনে হয় বহু বছর ধরে কেউ আসেনি।
কিন্তু মেহেদী গেটের কাছে হাঁটু গেড়ে বসল।
মাটিতে টর্চের আলো ফেলতেই সে বলল,
"দেখুন।"
টাটকা জুতোর ছাপ।
একজন নয়।
কমপক্ষে পাঁচজন।
---
লোহার দরজা ভেঙে তারা ভেতরে ঢুকল।
অন্ধকার।
দেয়ালে পুরোনো রাসায়নিকের সতর্কবার্তা।
মেঝেতে ধুলোর স্তর।
কিন্তু ধুলোর ওপর দিয়ে সম্প্রতি ভারী কিছু সরানো হয়েছে।
সৌরভ ফিসফিস করে বলল,
"ওরা এখানেই আছে?"
মেহেদী উত্তর দিল,
"অন্তত কয়েক ঘণ্টা আগেও ছিল।"
---
তারা নিচের স্তরে নামতেই একটি বিশাল হলঘর চোখে পড়ল।
হলের মাঝখানে সারি সারি কাঁচের কক্ষ।
প্রতিটির ভেতরে হাসপাতালের বেড।
বেশিরভাগই খালি।
কিন্তু শেষের কক্ষটিতে...
একজন মানুষ শুয়ে আছে।
সবাই দৌড়ে গেল।
লোকটির শরীরে অসংখ্য তার লাগানো।
শ্বাস চলছে।
মিতু দ্রুত পরীক্ষা করল।
"জীবিত!"
মারুফ বললেন,
"কে?"
মেহেদী ফাইলের ছবি বের করে মিলিয়ে দেখল।
তারপর বিস্ময়ে বলল,
"এটা তো..."
লোকটি সেই প্রথম খুন হওয়া ব্যক্তি।
যাকে কয়েক সপ্তাহ আগে কবর দেওয়া হয়েছে বলে সবাই বিশ্বাস করেছিল।
ঘরের সবাই স্তব্ধ।
মিতু ধীরে বলল,
"তাহলে কবরে যাকে দাফন করা হয়েছে..."
"...সে অন্য কেউ।"
---
ঠিক তখনই পুরো ভবনের বিদ্যুৎ একবার ঝিলমিল করে উঠল।
তারপর স্পিকারে ভেসে এল পরিচিত কণ্ঠ।
"অভিনন্দন, মেহেদী।"
"তুমি অবশেষে সত্যের খুব কাছে পৌঁছে গেছ।"
মেহেদী চিৎকার করে বলল,
"সামনে এসো!"
লোকটি হেসে উঠল।
"সামনে এলে খেলা শেষ হয়ে যাবে।"
"আমি চাই তুমি নিজেই উত্তর খুঁজে বের করো।"
---
হঠাৎ হলঘরের সব কাঁচের কক্ষ একসঙ্গে আলোকিত হয়ে উঠল।
একটির পর একটি।
মোট বারোটি কক্ষ।
প্রথম কক্ষে একজন।
দ্বিতীয় কক্ষে একজন।
তৃতীয় কক্ষে...
সবগুলোতেই মানুষ শুয়ে আছে।
কেউ গভীর ঘুমে।
কেউ নড়ছে না।
মিতুর কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
"এরা সবাই জীবিত!"
মেহেদী দ্রুত গুনতে শুরু করল।
এক...
দুই...
তিন...
...
দশ।
মোট দশজন মানুষ।
সবাই সেই নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকায় ছিল।
---
কিন্তু সবচেয়ে শেষ কক্ষটি দেখে মেহেদীর শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
কাঁচের ওপারে শুয়ে থাকা মানুষটির মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না।
মাথায় ব্যান্ডেজ।
মুখে অক্সিজেন মাস্ক।
কক্ষের গায়ে লেখা মাত্র একটি শব্দ।
SUBJECT-11
মেহেদীর বুক ধক করে উঠল।
Subject-11...
এটা তো তার নিজের কোড!
সে কাঁচের কাছে এগিয়ে গেল।
ঠিক তখনই ভেতরের মানুষটি ধীরে ধীরে চোখ খুলল।
আর কাঁচের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা মেহেদীর দিকে তাকাল।
দুজনের চোখ একসঙ্গে মিলতেই সৌরভ আতঙ্কে পিছিয়ে গেল।
কারণ কাঁচের ভেতরে শুয়ে থাকা মানুষটির মুখ...
মেহেদীর মতোই।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।