কেস ৪: অঘোরী রুদ্রের ছায়া
পর্ব ৪১: পর্ব দুই
ঘড়ির পেছন থেকে পড়ে যাওয়া খামটি কিছুক্ষণ কেউ স্পর্শ করল না।
ঘরের বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠেছে।
মেহেদী ধীরে একটি গ্লাভস পরে খামটি হাতে নিল।
"আগের মতোই," সে বলল, "যে-ই এটা রেখে যাক, সে চাইবে আমরা তাড়াহুড়ো করি।"
খামটি খুব সাবধানে খোলা হলো।
ভেতরে একটি ভাঁজ করা কাগজ।
আর একটি পুরোনো সাদা-কালো ছবি।
ছবিতে দেখা যাচ্ছে একটি শ্রেণিকক্ষ।
বোর্ডে বড় অক্ষরে লেখা...
Phase-2
ছবির নিচে তারিখ।
১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭
মিতু ভ্রু কুঁচকে বলল,
"অসম্ভব!"
মারুফ তাকালেন।
"কেন?"
"সোনাপুর কলেজ তো তারও আগে আগুনে ধ্বংস হয়ে গেছে।"
ঘরের সবাই এক মুহূর্তে বুঝে গেল।
তার মানে...
কলেজ বন্ধ হওয়ার পরেও কোথাও Phase-2 নামে কাজ চলছিল।
---
মেহেদী কাগজটা খুলল।
তাতে হাতে আঁকা একটি মানচিত্র।
চারদিকে নদী।
মাঝখানে একটি পরিত্যক্ত ইটভাটা।
মানচিত্রের নিচে মাত্র একটি বাক্য।
«'প্রথম অধ্যায় ছিল পর্যবেক্ষণ। দ্বিতীয় অধ্যায় ছিল অনুকরণ। তৃতীয় অধ্যায় শুরু হওয়ার আগেই চলে এসো।'»
---
সৌরভ বলল,
"এটা কি ফাঁদ?"
মেহেদী শান্তভাবে উত্তর দিল,
"হতে পারে।"
"আবার এটাই আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্রও হতে পারে।"
---
বৃদ্ধ লাইব্রেরিয়ান ছবিটা হাতে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
হঠাৎ তার হাত কেঁপে উঠল।
"আমি এই ঘরটা চিনি..."
"কোথায়?"
"এটা কলেজের শ্রেণিকক্ষ নয়।"
"তাহলে?"
"এটা পুরোনো ইটভাটার অফিসঘর।"
---
বিকেল চারটার দিকে দলটি মানচিত্র অনুসরণ করে পৌঁছাল নদীর ধারে পরিত্যক্ত ইটভাটায়।
চারদিকে আগাছা।
ভাঙা চিমনি।
ঝুলে পড়া টিনের ছাদ।
দেখলে মনে হয় বহু বছর ধরে এখানে কেউ আসেনি।
কিন্তু মেহেদী নিচু হয়ে মাটির দিকে তাকাল।
"এখানে সম্প্রতি একটি গাড়ি এসেছে।"
মারুফ জিজ্ঞেস করলেন,
"কীভাবে বুঝলি?"
"চাকার দাগ পুরোনো নয়। বৃষ্টির পরের কাদার ওপর তৈরি হয়েছে।"
---
ইটভাটার অফিসঘরের দরজায় তালা ঝুলছে।
কিন্তু তালায় মরিচা নেই।
শাহীনুর বলল,
"তালা ভাঙব?"
মেহেদী মাথা নাড়ল।
"একটু দাঁড়াও।"
সে তালার দিকে টর্চের আলো ফেলল।
তালার ছিদ্রে খুব সূক্ষ্ম রূপালি গুঁড়ো।
মিতু বলল,
"এটা কী?"
"গ্রাফাইট।"
"কেন ব্যবহার করা হয়?"
"অনেক সময় তালা মসৃণভাবে খুলতে লুব্রিকেন্ট হিসেবে ব্যবহার করা হয়।"
"অর্থাৎ..."
"...সম্প্রতি কেউ এই তালা খুলেছে।"
---
মারুফের নির্দেশে তালা কেটে দরজা খোলা হলো।
ভেতরে ঢুকতেই ধুলোমাখা টেবিল।
দেয়ালে ছেঁড়া চার্ট।
আর কোণায় একটি পুরোনো ব্ল্যাকবোর্ড।
বোর্ডে এখনো চক দিয়ে লেখা আছে।
Observe. Copy. Replace.
মিতু ধীরে পড়ল।
"পর্যবেক্ষণ।"
"অনুকরণ।"
"প্রতিস্থাপন।"
মেহেদীর মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল।
"এটাই PROJECT MIRROR-এর তিনটি ধাপ।"
---
ঘরের এক কোণে লোহার আলমারি।
ভেতরে অসংখ্য ফাইল।
প্রায় সবই খালি।
কেউ অনেক আগেই কাগজ সরিয়ে নিয়ে গেছে।
শুধু একটি পাতাই রয়ে গেছে।
তার ওপর লেখা...
Subject-17: Stable
Subject-19: Unstable
---
সৌরভ বিস্ময়ে বলল,
"Subject?"
মেহেদী ধীরে বলল,
"ওরা ছাত্রদের ছাত্র হিসেবে দেখেনি..."
"...গবেষণার বিষয় হিসেবে দেখেছে।"
---
ঠিক তখনই মিতু টেবিলের নিচে একটি ছোট ডিজিটাল ভয়েস রেকর্ডার খুঁজে পেল।
অদ্ভুতভাবে সেটির ব্যাটারিতে এখনো সামান্য চার্জ আছে।
রেকর্ডিং চালু করা হলো।
একজন নারীর আতঙ্কিত কণ্ঠ ভেসে এল।
"না... এটা গবেষণা নয়।"
"এটা বন্ধ করুন!"
তারপর একজন পুরুষের শান্ত কণ্ঠ।
"মানুষকে বোঝার জন্য সীমা অতিক্রম করতেই হয়।"
নারীটি আবার বললেন,
"ওরা শিশু!"
এরপর একটি ধাতব দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ।
রেকর্ডিং শেষ।
---
ঘরে দীর্ঘ নীরবতা।
মারুফ আস্তে বললেন,
"যদি এটা সত্যি হয়..."
"...তাহলে এখানে শুধু অপরাধ নয়, গুরুতর নৈতিক অপরাধও ঘটেছিল।"
মেহেদী কোনো উত্তর দিল না।
সে ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে তাকিয়ে ছিল।
হঠাৎ তার চোখ পড়ল বোর্ডের নিচে ছোট্ট করে আঁকা একটি চিহ্নে।
তিনটি বৃত্ত।
মাঝখানে একটি চোখ।
কিন্তু এবার তার নিচে আরও একটি লাইন লেখা।
"Phase-3 Location Updated."
কোনো ঠিকানা নেই।
শুধু একটি সংখ্যা।
১১৭।
মেহেদী সংখ্যাটার দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বলল,
"এটা ঠিকানা নয়..."
"এটা আরেকটা দরজা।"
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।