কেস ২: স্মৃতি চোর
পর্ব ৩৩: ডিরেক্টরের ডায়েরি
কাঁচের বাক্সের সামনে দাঁড়িয়ে কয়েক সেকেন্ড কেউ একটি কথাও বলল না।
বাক্সের ভেতরে রাখা কালো চামড়ার ডায়েরিটি সময়ের ভারে কিছুটা বিবর্ণ হয়ে গেছে।
মলাটে খোদাই করা দুটি শব্দ এখনও স্পষ্ট।
Director's Journal
মারুফ ধীরে বললেন,
"এত সহজে এটা এখানে রাখা থাকবে?"
সৌরভও মাথা নাড়ল।
"আমারও তাই মনে হচ্ছে।"
"এটা নিশ্চয়ই কোনো ফাঁদ।"
মেহেদী কাঁচের বাক্সটির চারপাশে ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করল।
সে বাক্সের নিচের অংশ, পাশের ধাতব ফ্রেম, এমনকি মেঝের টাইলসও খুঁটিয়ে দেখতে লাগল।
হঠাৎ সে হাঁটু গেড়ে বসল।
"দেখেছ?"
সবাই নিচু হয়ে তাকাল।
মেঝের ওপর ধুলোর পাতলা স্তর।
কিন্তু কাঁচের বাক্সের সামনে মাত্র দেড় ফুট জায়গায় ধুলো নেই।
শাহীনুর বলল,
"এতে কী বোঝা যায়?"
মেহেদী উত্তর দিল,
"সম্প্রতি কেউ এখানে দাঁড়িয়েছিল।"
"অথবা..."
"...বাক্সটি সম্প্রতি খোলা হয়েছে।"
---
মিতু কাঁচের পাশে ছোট্ট একটি সেন্সর দেখতে পেল।
"ইনফ্রারেড বিম।"
"বাক্সটা জোর করে খুললেই অ্যালার্ম বাজবে।"
মেহেদী চারদিকে তাকিয়ে দেয়ালের কোণে একটি পুরোনো বৈদ্যুতিক প্যানেল দেখতে পেল।
সে হাসল।
"এরা প্রযুক্তিতে খুব আত্মবিশ্বাসী।"
পাঁচ মিনিটের মধ্যে সৌরভ সেন্সরের বিদ্যুৎ সরাসরি বন্ধ না করে একটি বাইপাস সার্কিট তৈরি করল।
মিতু নিশ্চিত হওয়ার পর মেহেদী খুব ধীরে বাক্সের ঢাকনা তুলল।
কোনো অ্যালার্ম বাজল না।
---
ডায়েরিটি খুলতেই প্রথম পাতায় মাত্র একটি বাক্য।
> "যদি তুমি এই ডায়েরি পড়ছ, তাহলে আমার পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে।"
নিচে কোনো নাম নেই।
শুধু একটি তারিখ।
৫ জুন, ১৯৯৪
---
পরের পাতায় লেখা,
> "মানুষ সত্যকে অনুসরণ করে না। মানুষ অনুসরণ করে এমন গল্পকে, যেটা তাকে নিরাপত্তা দেয়।"
> "এই কারণেই ভণ্ড তান্ত্রিক, মিথ্যা নবী, প্রতারক এবং গুজব ছড়ানো মানুষ বারবার সফল হয়। তারা অলৌকিক কিছু সৃষ্টি করে না। তারা মানুষের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক দুর্বলতাকে ব্যবহার করে।"
মেহেদী ধীরে বইটা বন্ধ করল।
"এটা..."
"...একজন বিজ্ঞানীর ভাষা।"
---
আরও কয়েকটি পাতা উল্টাতেই গবেষণার নোট পাওয়া গেল।
একটি অংশে লেখা,
> "আমরা দেখেছি, যদি একটি গ্রামে ধারাবাহিকভাবে তিনটি অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে, তাহলে চতুর্থ ঘটনাটিকে মানুষ প্রমাণ ছাড়াই অতিপ্রাকৃত বলে মেনে নেওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।"
মিতু বলল,
"এটা সামাজিক মনোবিজ্ঞানের একটি পরিচিত ধরণের প্রভাবের সঙ্গে মিল আছে। আগে থেকে ভয় ও প্রত্যাশা তৈরি হলে মানুষ পরের ঘটনাগুলোকেও সেই কাঠামোয় ব্যাখ্যা করতে শুরু করতে পারে।"
মারুফ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
"মানে..."
"...আমাদের প্রথম গ্রামের ঘটনাগুলোও হয়তো এভাবেই সাজানো হয়েছিল।"
মেহেদী মাথা নাড়ল।
"ঠিক তাই।"
---
হঠাৎ ডায়েরির মাঝখান থেকে একটি ভাঁজ করা কাগজ পড়ে গেল।
কাগজটি খুলতেই একটি মানচিত্র দেখা গেল।
বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় লাল কালি দিয়ে বারোটি বৃত্ত আঁকা।
প্রতিটি বৃত্তের পাশে একটি নম্বর।
০০১
০০২
...
০১২
সৌরভ ফিসফিস করে বলল,
"এগুলোই কি বারোটা প্রকল্প?"
মেহেদী উত্তর দিল,
"সম্ভবত।"
"আর আমরা এখন শুধু দ্বিতীয় কেসে আছি।"
---
ঠিক তখনই ডায়েরির শেষের দিকে ভাঁজ করা আরেকটি পাতায় একটি নাম লেখা দেখতে পেল সে।
সবাই নিঃশ্বাস আটকে তাকিয়ে রইল।
ডিরেক্টর: ______ রহমান
নামের প্রথম অংশটি কেটে ফেলা হয়েছে।
শুধু শেষ অংশ...
"রহমান"
মারুফ বললেন,
"ইচ্ছা করে নাম নষ্ট করা হয়েছে।"
মেহেদী বলল,
"হ্যাঁ।"
"কিন্তু একটা জিনিস খেয়াল করেছেন?"
"কী?"
"যে ব্যক্তি নাম কেটেছে, সে 'রহমান' অংশটা কাটেনি।"
"মানে..."
"...হয় সে তাড়াহুড়ো করেছে, নয়তো ইচ্ছা করেই একটি সূত্র রেখে গেছে।"
---
ঠিক সেই সময় পুরো লাইব্রেরির স্পিকার থেকে আবার সেই ডিজিটাল কণ্ঠ ভেসে এল।
"মেহেদী..."
"তুমি কি বুঝতে পারছ..."
"...কেন আমি তোমাকে এখানে এনেছি?"
মেহেদী উত্তর দিল,
"তুমি চাও আমি অতীতটা জানি।"
"না।"
কণ্ঠটি শান্তভাবে বলল।
"আমি চাই তুমি সিদ্ধান্ত নাও..."
"...অতীত প্রকাশ করবে, নাকি লুকিয়ে রাখবে।"
---
হঠাৎ লাইব্রেরির অপর পাশের একটি বিশাল স্ক্রিন জ্বলে উঠল।
সেখানে একটি লাইভ ভিডিও।
একটি গ্রামের দৃশ্য।
মানুষ দৌড়াচ্ছে।
চিৎকার করছে।
একটি বাড়ির সামনে ভিড়।
মারুফ বিস্ময়ে বললেন,
"এটা তো..."
মিতু ফিসফিস করে বলল,
"...নতুন অপরাধস্থল।"
স্ক্রিনের নিচে লেখা উঠল।
> "কেস ৩ শুরু হয়েছে।"
আর ভিডিওতে ধীরে ধীরে ক্যামেরা এগিয়ে গেল একটি ভয়াবহ দৃশ্যের দিকে।
একটি মানুষের দেহ মাটিতে পড়ে আছে।
চারপাশে অদ্ভুত বৃত্ত আঁকা।
গ্রামের সবাই চিৎকার করছে,
"তান্ত্রিকের অভিশাপ!"
মেহেদী গভীরভাবে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
সে জানে...
এবারও সবাই অলৌকিক শক্তিকে দোষ দেবে।
আর তার কাজ হবে...
বিজ্ঞানের সাহায্যে সত্যকে খুঁজে বের করা।
কেস ২ সমাপ্ত।
পরবর্তী: কেস ৩ — অভিশপ্ত বৃত্ত
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।