কেস ২: স্মৃতি চোর
পর্ব ৩০: জন্মসনদের গোপন সত্য
ছোট কক্ষটায় তখন শুধু কম্পিউটারের মৃদু শব্দ।
মেহেদীর হাত স্থির।
তার চোখ জন্মসনদের ওপর আটকে আছে।
সে আবার পড়ল।
আবার।
তারপর তৃতীয়বার।
না।
ভুল দেখছে না।
সেখানে বাবার নাম হিসেবে লেখা আছে,
"অভিভাবক: ড. আরিফ সালেহ (অস্থায়ী দায়িত্ব)"
আর তার নিচে একটি লাল সিল।
মূল নথি গোপন।
মেহেদীর মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল।
"এটা... অসম্ভব।"
সে ছোটবেলা থেকেই জানে, তার বাবার নাম মো. হাসান। গ্রামের সাধারণ একজন স্কুলশিক্ষক।
তাহলে এই নথি কী?
জাল?
নাকি...
---
ঠিক তখনই ভিডিও আবার নিজে থেকেই চালু হলো।
ড. আরিফ শান্ত গলায় বললেন,
"আমি জানি, তুমি এখন বিভ্রান্ত।"
"তোমাকে একটা কথা পরিষ্কার করে বলি।"
"আমি তোমার বাবা নই।"
মেহেদী ধীরে নিঃশ্বাস ফেলল।
কিন্তু পরের কথাতেই সে আবার থেমে গেল।
"তবে..."
"...তোমার জন্মের পর প্রথম ছয় মাস তোমার আইনগত অভিভাবক আমি ছিলাম।"
---
ভিডিওতে ড. আরিফ একটি ফাইল খুললেন।
"তোমাকে অপহরণ করা হয়নি।"
"তোমাকে তৈরি করা হয়নি।"
"তোমার পরিবারও তোমাকে লুকিয়ে রাখেনি।"
"কিন্তু তোমার জন্মের সঙ্গে এমন একটি ঘটনা জড়িত, যা ASTER-এর নজরে চলে আসে।"
মেহেদীর চোখ সরু হয়ে গেল।
"কী ঘটনা?"
অবশ্য ভিডিও তার প্রশ্নের উত্তর শুনতে পাচ্ছে না।
---
ড. আরিফ বলতে লাগলেন,
"১৯ বছর আগে..."
"...একটি সরকারি গবেষণা হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ড হয়।"
"সেদিন একই সময়ে চারটি শিশু জন্মেছিল।"
"আগুন লাগার পর পুরো হাসপাতাল অন্ধকার হয়ে যায়।"
"কিছু নথি পুড়ে যায়।"
"কিছু শিশু অন্য ওয়ার্ডে সরিয়ে নেওয়া হয়।"
"আর সেই বিশৃঙ্খলার মধ্যে..."
"...একটি শিশুকে নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়।"
---
ভিডিও থেমে গেল।
তারপর স্ক্রিনে হাসপাতালের একটি পুরোনো ছবি ভেসে উঠল।
চারটি নবজাতকের ইনকিউবেটর।
তিনটিতে নাম দেখা যাচ্ছে।
চতুর্থটির নাম কালি দিয়ে মুছে ফেলা।
---
মেহেদীর বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা চাপ অনুভূত হলো।
ঠিক তখনই ভিডিও আবার শুরু হলো।
"ASTER বিশ্বাস করত..."
"...চারটি শিশুর একজনের মস্তিষ্কে এমন একটি বিরল স্নায়বিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা ভবিষ্যতে তাদের গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।"
"কিন্তু তারা নিশ্চিত ছিল না..."
"...সেই শিশুটি কে।"
---
মেহেদী ফিসফিস করে বলল,
"তাই..."
"...চারজনকেই পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল?"
স্ক্রিনে ড. আরিফ যেন তার কথারই উত্তর দিলেন।
"হ্যাঁ।"
"চারজনের জীবন গোপনে পর্যবেক্ষণ করা হয়।"
"তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, শেখার গতি, চাপ সামলানোর দক্ষতা..."
"সবকিছু।"
---
ঠিক তখনই দরজায় নক করল মারুফ।
"মেহেদী?"
"ভেতরে আসবেন না!"
"কেন?"
"আর একটু সময় দিন।"
---
ভিডিওর শেষ অংশে ড. আরিফের মুখে প্রথমবারের মতো ভয়ের ছাপ দেখা গেল।
"আমি ভেবেছিলাম, তোমাকে লুকিয়ে রাখতে পেরেছি।"
"কিন্তু..."
"...তারা শেষ পর্যন্ত তোমাকে খুঁজে পেয়েছে।"
"আমি যদি তখন বেঁচে না থাকি..."
"...তাহলে একটা কথা মনে রেখো।"
তিনি ক্যামেরার একদম কাছে ঝুঁকে এলেন।
"তুমি নির্বাচিত হয়েছ..."
"...কারণ তুমি বিশেষ নও।"
মেহেদী অবাক হয়ে গেল।
"মানে?"
ড. আরিফ বললেন,
"তুমি নির্বাচিত হয়েছ কারণ..."
"...প্রতিবার পরীক্ষায় তুমি সবচেয়ে মানবিক সিদ্ধান্ত নিয়েছ।"
"ASTER এমন একজনকে চায়..."
"...যে মানুষকে সংখ্যা হিসেবে দেখতে শিখবে।"
"আর আমি চাই..."
"...তুমি যেন মানুষকেই মানুষ হিসেবে দেখো।"
---
ভিডিও শেষ হয়ে গেল।
স্ক্রিন অন্ধকার।
মেহেদী অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
তার মাথায় একটাই কথা ঘুরছে।
সে কোনো 'অলৌকিক প্রতিভা' নয়।
ASTER তাকে বেছে নিয়েছে তার যুক্তি, পর্যবেক্ষণ আর নৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার জন্য।
---
ঠিক তখনই পুরো ডাটা সেন্টারে অ্যালার্ম বেজে উঠল।
বিপ! বিপ! বিপ!
সৌরভ দৌড়ে ঘরে ঢুকে পড়ল।
"মেহেদী!"
"কী হয়েছে?"
"কেউ সিস্টেমে ঢুকে পড়েছে!"
মিতুও ছুটে এল।
"ডাটা সেন্টারের সার্ভার থেকে হাজার হাজার ফাইল কপি হচ্ছে!"
মারুফ চিৎকার করে বললেন,
"কে করছে?"
সৌরভ স্ক্রিনের দিকে আঙুল দেখাল।
স্ক্রিনে মাত্র একটি কোড জ্বলছে।
> USER LOGIN: M-17
ঘরে নীরবতা নেমে এল।
মেহেদী ধীরে ধীরে স্ক্রিনের দিকে এগিয়ে গেল।
সে নিজ চোখে M-17-এর মৃত্যুর সাক্ষী।
তাহলে...
মৃত একজন মানুষ এই মুহূর্তে সিস্টেমে লগইন করল কীভাবে?
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।