কেস ২: স্মৃতি চোর
পর্ব ২৮: স্টেশন-২
থানার তদন্তকক্ষে বড় ডিজিটাল মানচিত্রের ওপর জিপিএস স্থানাঙ্কটি বসাতেই সবাই চুপ হয়ে গেল।
সৌরভ কয়েকবার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বলল,
"লোকেশনটা ঠিক দেখাচ্ছে তো?"
মিতু আবার যাচাই করল।
"হ্যাঁ।"
"এটা ঢাকা নয়।"
"চট্টগ্রামও নয়।"
"বান্দরবানের পাহাড়ি অঞ্চলের গভীরে।"
মারুফ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
"নীল ফাইলের মানচিত্রে 'স্টেশন-২' লেখা ছিল..."
"মনে হচ্ছে সেটাই।"
---
পরদিন ভোর।
সরকারিভাবে তারা পাহাড়ি অঞ্চলে নিখোঁজ কয়েকজন পর্যটকের তদন্তে যাচ্ছে বলে অনুমতি নিল।
আসল উদ্দেশ্য কেউ জানল না।
একটি জিপে করে পাঁচজন রওনা দিল।
মেহেদী, সৌরভ, শাহীনুর, মিতু আর মারুফ।
পাহাড়ি রাস্তা যত এগোতে লাগল, মোবাইল নেটওয়ার্ক তত দুর্বল হয়ে আসতে লাগল।
দুপুরের দিকে জিপিএস হঠাৎ কাজ করা বন্ধ করে দিল।
সৌরভ বিরক্ত হয়ে বলল,
"স্যাটেলাইটও কি হারিয়ে গেল?"
মিতু যন্ত্রটা পরীক্ষা করে বলল,
"না।"
"জ্যামিং হচ্ছে।"
"কেউ ইচ্ছা করে জিপিএস সিগন্যাল ব্যাহত করছে।"
মেহেদী জানালার বাইরে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
"তার মানে..."
"...আমরা ঠিক পথেই যাচ্ছি।"
---
এক ঘণ্টা পর তারা একটি পরিত্যক্ত রেলসুরঙ্গের সামনে পৌঁছাল।
পাহাড়ের বুক কেটে তৈরি করা পুরোনো টানেল।
প্রবেশমুখে মরিচা ধরা একটি বোর্ড।
অর্ধেক লেখা মুছে গেছে।
শুধু দুটি শব্দ পড়া যায়।
...TION-2
সৌরভের গলা শুকিয়ে গেল।
"স্টেশন-২..."
---
টানেলের ভেতরে ঢুকতেই অদ্ভুত ঠান্ডা বাতাস অনুভব করল সবাই।
মাটিতে বহু বছরের ধুলো।
কিন্তু তার ওপর স্পষ্ট জুতোর ছাপ।
মেহেদী হাঁটু গেড়ে বসে ছাপগুলো পরীক্ষা করল।
"তিনজন।"
মারুফ অবাক হয়ে বললেন,
"নিশ্চিত?"
"হ্যাঁ।"
"একজনের বুটের তলা ক্ষয়ে গেছে।"
"আরেকজন খুঁড়িয়ে হাঁটে।"
"তৃতীয়জনের পদক্ষেপ নিয়মিত।"
সৌরভ মুচকি হেসে বলল,
"তোকে নিয়ে আর অবাক হই না।"
---
টানেলের একেবারে শেষে তারা একটি বিশাল লোহার দরজার সামনে পৌঁছাল।
দরজায় কোনো তালা নেই।
শুধু একটি গোলাকার স্ক্যানার।
হঠাৎ স্ক্যানারের ওপর লাল আলো জ্বলে উঠল।
একটি যান্ত্রিক কণ্ঠ ভেসে এল।
> "পরিচয় যাচাই চলছে..."
সবাই সতর্ক হয়ে অস্ত্র ধরল।
দুই সেকেন্ড।
তিন সেকেন্ড।
তারপর...
> "স্বাগতম, সাবজেক্ট এম-৪।"
মেহেদীর বুক ধক করে উঠল।
"এম-৪?"
দরজাটি ধীরে ধীরে খুলে গেল।
---
ভেতরে ঢুকেই সবাই থমকে দাঁড়াল।
এটা কোনো গবেষণাগার নয়।
বরং একটি বিশাল ডাটা সেন্টার।
সারি সারি সার্ভার।
শত শত কম্পিউটার।
হাজার হাজার ঝলমলে আলো।
মৃদু শব্দে সব যন্ত্র চলছে।
কিন্তু...
একজন মানুষও নেই।
মিতু বিস্ময়ে বলল,
"এত বড় জায়গা..."
"...কেউ নেই?"
---
মেহেদী ধীরে ধীরে ভেতরে এগিয়ে গেল।
ঠিক তখনই সব মনিটর একসঙ্গে জ্বলে উঠল।
প্রতিটি স্ক্রিনে একই বাক্য।
> "স্বাগতম, মেহেদী।"
তারপর আরেকটি লাইন।
> "তুমি সময়ের আগেই এখানে পৌঁছে গেছ।"
---
হঠাৎ পুরো হলঘরে একটি শান্ত কণ্ঠ প্রতিধ্বনিত হলো।
কিন্তু এবার কণ্ঠটি বিকৃত নয়।
একজন মধ্যবয়স্ক মানুষের স্বাভাবিক কণ্ঠ।
"আমি জানতাম তুমি আসবে।"
মেহেদী বলল,
"তুমি কি ডিরেক্টর?"
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর উত্তর এল।
"না।"
"আমি ডিরেক্টর নই।"
"আমি শুধু..."
"...শেষ প্রশাসক।"
---
সৌরভ চিৎকার করে বলল,
"সামনে আসো!"
কণ্ঠটি হালকা হাসল।
"সামনে আসার দরকার নেই।"
"তোমরা ইতিমধ্যেই আমাকে দেখছ।"
সবাই চারদিকে তাকাল।
কেউ নেই।
মিতুর মুখের রঙ বদলে গেল।
"মেহেদী..."
"সব মনিটর দেখ।"
সব স্ক্রিনে একই মুখ ভেসে উঠেছে।
কিন্তু সেটা কোনো লাইভ ভিডিও নয়।
একটি কৃত্রিমভাবে তৈরি ডিজিটাল মুখ।
মানুষের মতো, আবার পুরোপুরি মানুষও নয়।
---
ডিজিটাল মুখটি বলল,
"ASTER-এর সবচেয়ে বড় ভুল ছিল..."
"...তারা ভেবেছিল নেতৃত্ব একজন মানুষের হাতে থাকবে।"
"তাই বহু বছর আগে..."
"...তারা সিদ্ধান্ত বদলায়।"
মেহেদী ধীরে বলল,
"মানে?"
ডিজিটাল মুখটি উত্তর দিল,
> "ডিরেক্টর কোনো মানুষ নয়।"
> "ডিরেক্টর একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।"
ঘরের সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল।
মারুফ ফিসফিস করে বললেন,
"অসম্ভব..."
মেহেদী মাথা নাড়ল।
"অসম্ভব নয়।"
"কিন্তু..."
"...এটা যদি সত্যি হয়, তাহলে আমরা এতদিন একজন মানুষকে নয়..."
"...একটি সিদ্ধান্ত-নেওয়া সিস্টেমকে তাড়া করছিলাম।"
ঠিক সেই মুহূর্তে পুরো ডাটা সেন্টারের আলো নিভে গেল।
অন্ধকারের মধ্যে শুধু একটি স্ক্রিন জ্বলতে থাকল।
সেখানে একটি মাত্র বাক্য লেখা।
> "পরীক্ষার দ্বিতীয় ধাপ শুরু হলো, মেহেদী। এবার তোমাকে প্রমাণ করতে হবে, মানুষের বিচারবুদ্ধি এখনও যন্ত্রের চেয়ে শ্রেষ্ঠ।"
আর ঠিক তখনই...
ডাটা সেন্টারের ভারী লোহার দরজাটি প্রচণ্ড শব্দে বন্ধ হয়ে গেল।
ধাম!
তারা বুঝতে পারল...
এবার শিকার নয়, পরীক্ষার অংশ তারাই।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।