কেস ৩: অভিশপ্ত বৃত্ত
পর্ব ৩: দ্বিতীয় বৃত্ত
মিতুর ফোন শেষ হতেই তদন্তদলের সবাই একে অপরের দিকে তাকাল।
মারুফ দ্রুত জিজ্ঞেস করলেন,
"কোথায়?"
"ময়নাপুর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে... চর কাশেম গ্রামে।"
"মৃত?"
"হ্যাঁ।"
"ঘটনার সময়?"
"প্রায় আধা ঘণ্টা আগে।"
মেহেদী ঘড়ির দিকে তাকাল।
সকাল ১১টা ৪২।
সে ধীরে বলল,
"আমরা যখন এখানে প্রমাণ সংগ্রহে ব্যস্ত ছিলাম..."
"...ঠিক তখনই খুনি দ্বিতীয় আঘাত করেছে।"
---
দুইটি পুলিশের গাড়ি দ্রুত চর কাশেম গ্রামের দিকে ছুটে চলল।
পথে সৌরভ বলল,
"খুনি কি আমাদের গতিবিধি জানে?"
মেহেদী সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না।
কিছুক্ষণ পরে বলল,
"জানে।"
"কিন্তু কীভাবে জানে, সেটাই আসল প্রশ্ন।"
---
চর কাশেমে পৌঁছেই তারা বুঝতে পারল, এখানকার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ।
গ্রামের প্রায় সবাই বাড়ি ছেড়ে মাঠে জড়ো হয়েছে।
কেউ কাঁদছে।
কেউ দোয়া পড়ছে।
কেউ আবার বলছে,
"অভিশাপ এবার পুরো এলাকায় ছড়িয়ে গেছে।"
---
মৃতদেহটি পড়ে আছে একটি শুকনো পুকুরের মাঝখানে।
চারপাশে আগের মতোই নিখুঁত একটি বৃত্ত।
তবে এবার একটি বড় পার্থক্য আছে।
বৃত্তের চারদিকে আটটি ছোট পাথর রাখা।
প্রতিটি পাথরে একই প্রতীক।
তিনটি সমকেন্দ্রিক বৃত্ত।
মাঝখানে একটি চোখ।
---
মিতু প্রাথমিক পরীক্ষা করতেই ভ্রু কুঁচকে গেল।
"আশ্চর্য..."
মেহেদী জিজ্ঞেস করল,
"কী হলো?"
"এই লোকটার শরীরে বাইরের কোনো আঘাত নেই।"
"হৃদযন্ত্র?"
"এখনই নিশ্চিত না।"
"কিন্তু ত্বকের নিচে কিছু অস্বাভাবিক পোড়া দাগ আছে।"
---
মেহেদী নিচু হয়ে মৃতদেহের ডান হাত দেখল।
আঙুল শক্ত হয়ে মুঠো করা।
সে সাবধানে মুঠো খুলতেই ভেতর থেকে একটি ছোট কাগজ বেরিয়ে এল।
কাগজে লেখা মাত্র চারটি শব্দ।
> "বৃত্ত সম্পূর্ণ হয়নি।"
সৌরভ অবাক হয়ে বলল,
"মারা যাওয়ার আগে লিখেছে?"
মেহেদী মাথা নাড়ল।
"অসম্ভব না।"
"কিন্তু আগে নিশ্চিত হতে হবে।"
---
ঠিক তখনই শাহীনুর চারদিকে তাকিয়ে বলল,
"একটা জিনিস খেয়াল করেছ?"
"কী?"
"এখানে কোনো গাছ নেই।"
সবাই বুঝতে পারল সে কী বলতে চাইছে।
প্রথম অপরাধস্থলে ছিল বিশাল বটগাছ।
এখানে কিছুই নেই।
তাহলে...
পোড়া দাগও নেই।
---
মেহেদী বৃত্তের ভেতর মাটি পরীক্ষা করতে লাগল।
হঠাৎ সে এক জায়গায় ধাতব শব্দ পেল।
পুলিশ খুব সাবধানে মাটি সরাল।
কিন্তু এবার কোনো তার নয়।
একটি গোলাকার ধাতব প্লেট।
প্রায় এক ফুট ব্যাস।
মাঝখানে কাঁচের মতো স্বচ্ছ অংশ।
মিতু বিস্মিত হয়ে বলল,
"এটা আমি আগে দেখিনি।"
---
প্লেটটি তুলতেই তার নিচে একটি ছোট ফাঁকা চেম্বার দেখা গেল।
চেম্বারের ভেতরে কালো ছাই।
আর একটি ছোট কাঁচের শিশি।
মিতু শিশিটি আলোয় ধরল।
"এটা গ্যাস সংরক্ষণের পাত্রের মতো লাগছে।"
"ভেতরে কিছু আছে?"
"খুব সামান্য।"
"ল্যাবে পরীক্ষা করতে হবে।"
---
এদিকে মেহেদী আটটি পাথরের অবস্থান মাপছিল।
সে নোটবুকে একটি বৃত্ত এঁকে পাথরগুলোর স্থান চিহ্নিত করল।
হঠাৎ তার চোখ বড় হয়ে গেল।
সৌরভ জিজ্ঞেস করল,
"কী বুঝলি?"
মেহেদী বলল,
"এগুলো এলোমেলোভাবে রাখা না।"
সে কাগজটা মারুফের হাতে দিল।
"দেখুন..."
"আটটি পাথরকে সরলরেখা দিয়ে যুক্ত করলে একটি নির্দিষ্ট জ্যামিতিক নকশা তৈরি হচ্ছে।"
মারুফ কিছুক্ষণ দেখে বললেন,
"এটা তো..."
"...এক ধরনের বৈদ্যুতিক সার্কিটের বিন্যাসের মতো।"
মেহেদী মৃদু হেসে বলল,
"আমারও তাই মনে হচ্ছে।"
---
ঠিক তখনই গ্রামের একজন বৃদ্ধ এগিয়ে এলেন।
তিনি কাঁপা গলায় বললেন,
"আমি একটা কথা বলব?"
মেহেদী সম্মান দিয়ে বলল,
"অবশ্যই।"
"গত তিন রাত ধরে..."
"...একজন লোককে এই পুকুরের পাশে মাটি খুঁড়তে দেখেছি।"
"চেনেন?"
"না।"
"কিন্তু তার হাতে সব সময় একটা লম্বা ধাতব দণ্ড থাকত।"
---
মেহেদী আর মারুফ একে অপরের দিকে তাকাল।
প্রথম ঘটনাস্থলের বাক্সে পাওয়া ধাতব দণ্ডগুলোর কথা দুজনেরই মনে পড়ল।
এগুলো কি একই জিনিস?
---
ঠিক তখনই সৌরভ ল্যাপটপে প্রথম ঘটনাস্থলের ভিডিও আর দ্বিতীয় ঘটনাস্থলের ছবিগুলো পাশাপাশি খুলে দেখল।
সে হঠাৎ চিৎকার করে উঠল,
"মেহেদী!"
"কী?"
"দুইটা বৃত্ত একটার ওপর আরেকটা বসিয়ে দেখ।"
মেহেদী দ্রুত ছবিগুলো স্বচ্ছ স্তরে মিলিয়ে দেখল।
তারপর কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে রইল।
দুইটি বৃত্ত আলাদা হলেও...
ভেতরের জ্যামিতিক রেখাগুলো একত্র করলে একটি নতুন নকশা তৈরি হচ্ছে।
যেন...
এগুলো আলাদা অপরাধস্থল নয়।
একটি বড় নকশার দুইটি অংশ।
মেহেদী ধীরে বলল,
"খুনি শুধু মানুষ হত্যা করছে না..."
"...সে পুরো জেলার ওপর একটি বিশাল জ্যামিতিক বিন্যাস তৈরি করছে।"
ঠিক তখনই মারুফের ওয়্যারলেসে জরুরি বার্তা ভেসে এল।
> "স্যার! তৃতীয় স্থানে সন্দেহজনক একটি বৃত্ত পাওয়া গেছে... কিন্তু সেখানে এখনও কেউ মারা যায়নি।"
মেহেদী মুহূর্তের মধ্যে উঠে দাঁড়াল।
"তাহলে এবার প্রথমবারের মতো..."
"...আমরা খুন হওয়ার আগেই ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারব।"
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।