কেস ৩: অভিশপ্ত বৃত্ত
পর্ব ৬: সূর্যাস্তের আগে
মেহেদী দ্বিতীয়বার মানচিত্রের দিকে তাকাল।
চতুর্থ সবুজ বিন্দুর নিচে ছোট অক্ষরে একটি নাম ভেসে উঠেছে।
"শালবন উচ্চ বিদ্যালয়"
মারুফ সঙ্গে সঙ্গে ওয়্যারলেস হাতে তুলে নিলেন।
"কন্ট্রোল, শুনতে পাচ্ছেন?"
"জি স্যার।"
"শালবন উচ্চ বিদ্যালয়ে থাকা সবাইকে অবিলম্বে সরিয়ে ফেলুন। পুরো এলাকা খালি করুন।"
কয়েক সেকেন্ড নীরবতার পর ওপাশ থেকে উত্তর এল,
"স্যার... সমস্যা হয়েছে।"
"কী সমস্যা?"
"আজ স্কুলের শতবর্ষ উদযাপন চলছে।"
"প্রায় আটশোরও বেশি মানুষ মাঠে আছে।"
গাড়ির ভেতর এক মুহূর্তে নিস্তব্ধতা নেমে এল।
---
মেহেদী দ্রুত হিসাব করল।
সন্ধ্যা হতে আর দেড় ঘণ্টারও কম।
এত অল্প সময়ে আটশো মানুষকে আতঙ্ক না ছড়িয়ে সরিয়ে নেওয়া প্রায় অসম্ভব।
ঠিক তখনই সৌরভ বলল,
"পুলিশ পরিচয় দিয়ে অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিই।"
মারুফ মাথা নাড়লেন।
"কোনো শক্ত প্রমাণ ছাড়া হঠাৎ অনুষ্ঠান বন্ধ করলে উল্টো বিশৃঙ্খলা হবে।"
---
গাড়ি সর্বোচ্চ গতিতে ছুটছে।
মেহেদী জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।
হঠাৎ সে বলল,
"না..."
"আমরা ভুল ভাবছি।"
মিতু জিজ্ঞেস করল,
"মানে?"
"চিঠিতে লেখা ছিল..."
> 'চতুর্থ বৃত্তে পৌঁছাতে না পারলে শত শত মানুষ মরবে।'
"কিন্তু কোথাও লেখা নেই যে তারা বৃত্তের ভেতরে থাকবে।"
"অর্থাৎ..."
"...বৃত্তটা হয়তো পুরো মাঠজুড়েই তৈরি করা হয়েছে।"
---
শাহীনুর অবাক হয়ে বলল,
"এত বড় বৃত্ত বানানো সম্ভব?"
মেহেদী শান্তভাবে উত্তর দিল,
"যদি কয়েক সপ্তাহ ধরে রাতে কাজ করা হয়..."
"...তাহলে সম্ভব।"
---
বিকেল ৫টা ২৮ মিনিট।
তারা শালবন উচ্চ বিদ্যালয়ে পৌঁছাল।
দূর থেকেই গান-বাজনার শব্দ শোনা যাচ্ছে।
মাঠ ভর্তি মানুষ।
শিশুরা দৌড়াচ্ছে।
মঞ্চে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলছে।
সবকিছু স্বাভাবিক।
এতটাই স্বাভাবিক যে কয়েক ঘণ্টা আগের ঘটনাগুলো যেন অবিশ্বাস্য মনে হয়।
---
মেহেদী মাঠে পা দিয়েই থেমে গেল।
তার চোখ ধীরে ধীরে পুরো মাঠ ঘুরে দেখল।
তারপর সে নিচু হয়ে ঘাস স্পর্শ করল।
মাটির রং কিছু কিছু জায়গায় সামান্য আলাদা।
খালি চোখে বোঝা কঠিন।
সে ব্যাগ থেকে ছোট একটি চৌম্বকীয় ডিটেক্টর বের করল।
যন্ত্রটি মাটির ওপর ধরতেই...
বিপ... বিপ... বিপ...
শব্দ বাড়তে লাগল।
মিতু অবাক হয়ে বলল,
"মাটির নিচে ধাতু আছে!"
মেহেদী ধীরে মাথা নাড়ল।
"আর শুধু এখানে না..."
"...পুরো মাঠে।"
---
সে দ্রুত কয়েকটি জায়গা পরীক্ষা করল।
একই ফল।
মাটির নিচে কোথাও না কোথাও পাতলা ধাতব তার রয়েছে।
সৌরভের গলা শুকিয়ে গেল।
"মানে..."
"...পুরো মাঠটাই একটা বিশাল সার্কিট?"
"সম্ভবত।"
---
ঠিক তখনই মঞ্চের সাউন্ড সিস্টেম নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেল।
মাইক্রোফোনে বিকট শব্দ হলো।
তারপর...
একটি পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল।
সেই কালো পোশাকের মানুষ।
"স্বাগতম, মেহেদী।"
পুরো মাঠের মানুষ বিস্ময়ে চারদিকে তাকাতে লাগল।
"তোমরা সবাই আজ ইতিহাসের অংশ হতে চলেছ।"
মঞ্চে থাকা শিক্ষকরা হতভম্ব।
কেউ বুঝতে পারছে না কী হচ্ছে।
---
মারুফ চিৎকার করলেন,
"বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করো!"
স্কুলের দারোয়ান দৌড়ে গেল।
কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর ফিরে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
"স্যার..."
"মূল সুইচ আগেই কেটে রাখা হয়েছে।"
"তাহলে মাইক চলছে কীভাবে?"
মিতু বলল,
"ব্যাটারি ব্যাকআপ!"
---
কণ্ঠটি আবার শোনা গেল।
"মেহেদী..."
"আজ আমি কাউকে হত্যা করতে চাই না।"
"আমি শুধু দেখতে চাই..."
"...আতঙ্ক কত দ্রুত ছড়ায়।"
---
ঠিক তখনই মাঠের এক কোণে একটি ছোট্ট নীল আলো জ্বলে উঠল।
তারপর আরেকটি।
তারপর তৃতীয়টি।
মাত্র দশ সেকেন্ডের মধ্যে পুরো মাঠজুড়ে শত শত ক্ষুদ্র নীল আলো জ্বলতে শুরু করল।
দেখতে মনে হচ্ছে...
মাটির নিচে আগুন জ্বলছে।
মানুষ চিৎকার শুরু করল।
"আগুন!"
"বাঁচাও!"
"অভিশাপ!"
হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে গেল।
শিশুরা পড়ে যাচ্ছে।
বৃদ্ধরা দৌড়াতে পারছেন না।
মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্ক পুরো মাঠ গ্রাস করল।
---
মেহেদী চারদিকে তাকিয়ে চিৎকার করল,
"কেউ দৌড়াবেন না!"
কিন্তু তার কথা ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল।
সে নিচু হয়ে একটি নীল আলোর পাশে হাত রাখল।
তাপ নেই।
আগুনও নেই।
সে বুঝতে পারল...
এগুলো আলো।
আগুন নয়।
কিন্তু আতঙ্ক...
একেবারে বাস্তব।
ঠিক তখনই তার চোখ পড়ল মাঠের উত্তর পাশে।
একটি পানির ট্যাংকের ওপর দাঁড়িয়ে দূরবীন হাতে কেউ পুরো দৃশ্য দেখছে।
কালো পোশাক।
মুখ ঢাকা।
মেহেদী আঙুল তুলে চিৎকার করল,
"ওই লোকটাকে ধরো!"
মারুফ আর দুই কনস্টেবল দৌড়ে গেলেন।
লোকটি একবারও পিছনে তাকাল না।
সে শুধু নিজের হাতঘড়ির বোতামে চাপ দিল।
পরের মুহূর্তেই...
পুরো মাঠের নিচে থাকা নীল আলোগুলো একসঙ্গে লাল হয়ে উঠল।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।