কেস ৪: অঘোরী রুদ্রের ছায়া
পর্ব ৩০: ফরেনসিকের অন্ধকার
ড. সামিউল করিমের নাম শুনে ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এল।
বাংলাদেশে ফরেনসিক বিজ্ঞানের জগতে তাঁর নাম একসময় অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে উচ্চারণ করা হতো। বহু জটিল হত্যাকাণ্ডের রহস্য তিনি বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে সমাধান করেছিলেন।
মারুফ ধীরে ধীরে চেয়ারে বসলেন।
"আমি চাকরিতে নতুন ছিলাম তখন। ড. সামিউল ছিলেন আমাদের প্রশিক্ষক। উনি সব সময় একটা কথা বলতেন..."
তিনি থামলেন।
মেহেদী জিজ্ঞেস করল, "কী কথা?"
"'প্রত্যেক অপরাধী কোনো না কোনো চিহ্ন রেখে যায়। যদি চিহ্ন না পাও, তাহলে বুঝবে তুমি ভুল জায়গায় খুঁজছ।'"
মেহেদী গভীর চিন্তায় ডুবে গেল।
"তাহলে..."
"যদি সত্যিই তিনি এই নেটওয়ার্কে থাকেন..."
"...তাহলে তিনি জানেন কীভাবে প্রমাণ লুকাতে হয়।"
---
মিতু ছবিটা স্ক্যান করে বড় করল।
ছবির কোণায় একটি ছোট বোর্ড দেখা যাচ্ছে।
আগে কেউ খেয়াল করেনি।
বোর্ডে লেখা মাত্র তিনটি শব্দ।
Applied Cognitive Laboratory
সৌরভ ভ্রু কুঁচকে বলল,
"এটা আবার কী?"
মিতু উত্তর দিল,
"কগনিটিভ সায়েন্স মানে মানুষের চিন্তা, স্মৃতি, উপলব্ধি আর সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণা।"
মেহেদী ধীরে বলল,
"ECHO..."
"NEXUS..."
"এখন আবার Cognitive Laboratory..."
"সবগুলো একই সুতোয় বাঁধা।"
---
শাহীনুর হঠাৎ বলল,
"একটা বিষয় মাথায় আসছে না।"
"কী?"
"যদি রুদ্ররা এত বুদ্ধিমান হয়..."
"তাহলে এত নাটক করার দরকার কী?"
"সরাসরি কাজ করলেই তো হয়।"
মেহেদী হাসল।
"কারণ ভয়, রহস্য আর অলৌকিকতার গল্প মানুষের মনে দ্রুত ছড়ায়।"
"একজন খুনি মানুষকে মারে।"
"কিন্তু একটা কিংবদন্তি..."
"...হাজার মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।"
---
ঠিক তখন থানার একজন কনস্টেবল দৌড়ে ভেতরে এল।
"স্যার!"
"নতুন খবর।"
মারুফ উঠে দাঁড়ালেন।
"কী হয়েছে?"
"আজ সকালে আশ্রমের পাশের পুকুর থেকে একটা লোহার বাক্স পাওয়া গেছে।"
---
এক ঘণ্টা পরে বাক্সটি থানায় আনা হলো।
মোটা লোহার তৈরি।
বাইরে মরিচা পড়ে গেছে।
কিন্তু তালাটা একেবারে নতুন।
মেহেদী বলল,
"পুরোনো বাক্সে নতুন তালা।"
"মানে?"
"কেউ চাইছে আমরা ভাবি বাক্সটা বহু বছর ধরে পানিতে ছিল।"
---
মারুফ তালা ভেঙে বাক্স খুললেন।
ভেতরে কাপড়ে মোড়ানো কয়েকটি কাচের শিশি।
কিছু ল্যাব নোট।
আর একটি পুরোনো ডায়েরি।
ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা...
ড. সামিউল করিম
---
সবাই একসঙ্গে তাকাল।
মেহেদী খুব সাবধানে পাতাগুলো উল্টাতে লাগল।
প্রথম কয়েকটি পৃষ্ঠায় মানুষের উপলব্ধি নিয়ে নোট।
কীভাবে আলো, শব্দ, গন্ধ এবং মানসিক প্রত্যাশা একসঙ্গে কাজ করে মানুষের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।
মিতু পড়তে পড়তে বলল,
"এগুলো বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ।"
"কিন্তু..."
পরের পাতায় পৌঁছে তার কণ্ঠ বদলে গেল।
---
সেখানে লেখা—
«'অলৌকিক শক্তির প্রয়োজন নেই। মানুষের মস্তিষ্কই সবচেয়ে বড় জাদুকর।'»
---
মেহেদী ধীরে বইটা বন্ধ করল।
"এই লাইনটা মনে রাখো।"
"কেন?"
"কারণ পুরো নেটওয়ার্ক সম্ভবত এই দর্শনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।"
---
ঠিক তখনই সৌরভ একটি খাম খুঁজে পেল।
খামের ওপর লেখা—
শুধু তদন্তকারীর জন্য।
মারুফ খামটা খুললেন।
ভেতরে একটি মাত্র কাগজ।
তাতে লেখা—
«'যদি এই ডায়েরি পেয়ে থাকো, তাহলে বুঝবে তোমরা আমার ফাঁদে পা দিয়েছ।'»
নিচে কোনো স্বাক্ষর নেই।
শুধু একটি সংখ্যা।
৪২।
---
শাহীনুর বলল,
"আবার কোড!"
মেহেদী মাথা নাড়ল।
"না।"
"এবার এটা কোড মনে হচ্ছে না।"
---
সে ডায়েরির পাতাগুলো আবার উল্টাতে শুরু করল।
হঠাৎ ৪২ নম্বর পাতায় এসে থেমে গেল।
সেই পাতায় কোনো লেখা নেই।
শুধু এক টুকরো চাপা ফুল।
আর ফুলের নিচে ছোট্ট করে লেখা—
'সত্য সব সময় বইয়ের ভেতরে থাকে না। কখনও কখনও পাতার মাঝখানে লুকিয়ে থাকে।'
---
মেহেদী ফুলটা খুব সাবধানে তুলতেই দুই পাতার মাঝখান থেকে একটি অত্যন্ত পাতলা স্বচ্ছ প্লাস্টিকের শিট বেরিয়ে এল।
খালি চোখে প্রায় দেখা যায় না।
মিতু টর্চের আলো তির্যকভাবে ফেলতেই শিটের ওপর অদৃশ্য কালি দিয়ে লেখা শব্দগুলো ফুটে উঠল।
«"আগামী লক্ষ্য... স্কুল।"»
তার নিচে—
«"তারিখ: ১৭ আগস্ট।"»
আরও নিচে—
«"প্রদর্শনী শুরু সকাল ১০টা।"»
মারুফ ঘড়ির দিকে তাকালেন।
আজ ১৬ আগস্ট।
অর্থাৎ...
তাদের হাতে মাত্র এক দিন সময়।
কিন্তু কোন স্কুল?
সেটা কোথাও লেখা নেই।
মেহেদী শিটটা হাতে নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
"এটা শুধু একটা সতর্কবার্তা নয়..."
"এটা একটা আমন্ত্রণ।"
"রুদ্র চাইছে আমরা সেখানে যাই।"
ঘরের সবাই বুঝতে পারল...
পরের কেস শুরু হওয়ার আগেই,
তাদের সামনে অপেক্ষা করছে এমন একটি খেলা,
যেখানে প্রতিপক্ষ নিজেই তদন্তকারীদের চাল চালতে বাধ্য করছে।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।