পর্ব ১৯: গুলির শব্দ
মেহেদী আর সৌরভ সিঁড়ি বেয়ে উপরের দিকে দৌড়াচ্ছে।
লাল সতর্কবাতির আলোয় পুরো গবেষণাগার কাঁপছে। কোথাও কোথাও ছাদ থেকে কংক্রিটের গুঁড়া পড়ছে।
স্পিকারে আবার ঘোষণা ভেসে এল।
> "Time Remaining: 02 Minutes 31 Seconds."
সৌরভ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
"দ্রুত!"
দুজন করিডোর পেরিয়ে বাইরে বের হতেই ঠান্ডা রাতের বাতাস মুখে লাগল।
চারদিকে ধোঁয়া আর ধুলোর মিশ্রণ।
কয়েক সেকেন্ড আগেই যে গুলির শব্দ তারা শুনেছিল, তার প্রতিধ্বনি এখনও পাহাড়ের গায়ে ফিরছে।
মেহেদীর চোখ প্রথমেই পড়ল মারুফের দিকে।
তিনি দাঁড়িয়ে আছেন।
অক্ষত।
মিতু রায়হানের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে।
শাহীনুর চারদিকে তাকিয়ে কাউকে খুঁজছে।
"গুলিটা কে খেয়েছে?"
মারুফ কোনো কথা বললেন না।
ধীরে ধীরে মাটির দিকে আঙুল দেখালেন।
প্রায় বিশ গজ দূরে একটি কালো পোশাক পরা মানুষ পড়ে আছে।
তার ডান কাঁধ থেকে রক্ত ঝরছে।
---
মারুফ বললেন,
"ও আমাদের লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিল।"
"তারপর?"
"আমি পাল্টা গুলি করি।"
লোকটা পালাতে গিয়েও পড়ে যায়।
মেহেদী দ্রুত দৌড়ে গেল।
লোকটির মুখে কালো মাস্ক।
নাড়ি চলছে।
সে বেঁচে আছে।
মারুফ সাবধানে মাস্ক খুললেন।
সবাই হতবাক।
লোকটির বয়স বড়জোর পঁচিশ।
মুখে আতঙ্কের ছাপ।
মেহেদী চিনতে পারল না।
"এই লোককে আগে কখনও দেখিনি।"
ঠিক তখনই লোকটি কষ্ট করে চোখ খুলল।
সে সরাসরি মেহেদীর দিকে তাকাল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
"...দেরি হয়ে গেছে..."
"কিসের দেরি?"
লোকটি কাশতে লাগল।
ঠোঁটের কোণ দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এল।
"তোমরা..."
"...ভুল জায়গায়..."
বাক্যটা শেষ করার আগেই তার পুরো শরীর কেঁপে উঠল।
মিতু দ্রুত তার নাড়ি পরীক্ষা করল।
তারপর অবিশ্বাসের চোখে তাকাল।
"এটা কীভাবে সম্ভব?"
মারুফ জিজ্ঞেস করলেন,
"কী হয়েছে?"
মিতু ধীরে বলল,
"ও গুলিতে মারা যায়নি।"
---
ঠিক সেই মুহূর্তে লোকটির ঘাড়ের পেছনে ছোট্ট একটি লাল আলো জ্বলে উঠল।
বিপ...
বিপ...
মেহেদীর চোখ বড় হয়ে গেল।
"সবাই সরে যান!"
সে লোকটির ঘাড় পরীক্ষা করল।
ত্বকের নিচে কিছু একটা নড়ছে।
মিতু বিস্ময়ে বলল,
"ইমপ্লান্ট!"
পরের সেকেন্ডেই আলো নিভে গেল।
লোকটির শ্বাস বন্ধ হয়ে গেল।
কোনো বিস্ফোরণ হলো না।
কোনো বিষের গন্ধও নেই।
কিন্তু মানুষটা মৃত।
---
মিতু শান্তভাবে পরীক্ষা করে বলল,
"হার্ট হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেছে।"
মারুফ বিস্ময়ে বললেন,
"গুলির কারণে?"
"না।"
"তাহলে?"
"সম্ভবত ইমপ্লান্টের মাধ্যমে কোনো বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা বা রাসায়নিক ব্যবস্থা সক্রিয় হয়েছে।"
মেহেদী নিচু গলায় বলল,
"অর্থাৎ..."
"...এই মানুষটাকে জীবিত বন্দি করার সুযোগই আমাদের দেওয়া হয়নি।"
---
ঠিক তখনই...
ধুমমম!
ভূগর্ভস্থ গবেষণাগারে প্রবল বিস্ফোরণ হলো।
মাটি কেঁপে উঠল।
ধুলোয় আকাশ ঢেকে গেল।
যে ভবনটিতে তারা কয়েক মিনিট আগে ছিল, সেটি ধীরে ধীরে ভেঙে মাটির সঙ্গে মিশে গেল।
সৌরভ হাঁটুতে হাত দিয়ে বসে পড়ল।
"আর পাঁচ মিনিট দেরি হলে..."
কেউ বাকিটা বলল না।
---
পরদিন সকাল।
থানার অস্থায়ী তদন্তকক্ষে সবাই বসে আছে।
টেবিলের ওপর সাজানো উদ্ধার করা নথি।
হার্ডডিস্ক।
প্রজেক্ট নির্বাণের মূল প্রস্তাব।
আর মৃত হামলাকারীর ব্যক্তিগত জিনিস।
মেহেদী তার পকেট থেকে একটি ছোট ধাতব মুদ্রার মতো বস্তু বের করল।
এটা লোকটির জ্যাকেটের ভেতর থেকে পাওয়া গেছে।
এক পাশে অদ্ভুত একটি প্রতীক।
একটি বৃত্ত।
তার ভেতরে তিনটি পরস্পর ছেদ করা ত্রিভুজ।
অন্য পাশে মাত্র একটি শব্দ খোদাই করা।
ASTER
সৌরভ বলল,
"এটা কি কোনো সংগঠনের নাম?"
মেহেদী উত্তর দিল,
"জানি না।"
"কিন্তু এটা প্রথমবার..."
"...আমরা কোনো প্রতীক পেলাম।"
---
বিকেলে ফরেনসিক রিপোর্ট এল।
মৃত হামলাকারীর আঙুলের ছাপ জাতীয় ডেটাবেসে নেই।
ডিএনএও নেই।
কিন্তু একটি বিষয় সবাইকে অবাক করল।
তার বাম বাহুতে পুরোনো অস্ত্রোপচারের দাগ।
একই ধরনের দাগ, যেটা আগের মৃতদের শরীরেও ছিল।
মিতু ধীরে বলল,
"এর মানে..."
"সেও পরীক্ষার অংশ ছিল।"
---
রাতে মেহেদী একা বসে উদ্ধার করা নীল ফাইল পড়ছিল।
হঠাৎ একটি ভাঁজ করা কাগজ মেঝেতে পড়ে গেল।
কাগজটি আগে কেউ খেয়াল করেনি।
সে খুলতেই একটি হাতে আঁকা মানচিত্র দেখা গেল।
বাংলাদেশ নয়।
একটি ছোট পাহাড়ি অঞ্চল।
মানচিত্রের নিচে লেখা—
> "স্টেশন-২"
তার নিচে আরও একটি লাইন।
> "প্রথম কেস শেষ। সত্যিকারের পরীক্ষা শুরু হবে এখান থেকে।"
মেহেদী দীর্ঘক্ষণ কাগজটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর নোটবুকে লিখল,
কেস-১: কালোছায়া গ্রামের রহস্য (প্রাথমিকভাবে সমাধান)।
তার নিচে আবার লিখল,
অমীমাংসিত প্রশ্ন:
ASTER কারা?
ড. আরিফ কোথায়?
ড. রাশেদ শত্রু, নাকি সহযোগী?
প্রজেক্ট নির্বাণের আসল পরিচালক কে?
সে কলম বন্ধ করল।
জানালার বাইরে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে।
সে জানত না, মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই তারা এমন একটি নতুন কেসের মুখোমুখি হবে, যেখানে কোনো লাশ থাকবে না...
কিন্তু মানুষ এক এক করে নিজের স্মৃতি হারিয়ে ফেলবে।
প্রথম কেস সমাপ্ত।
পরবর্তী কেস: স্মৃতি চোর।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।