কেস ৪: অঘোরী রুদ্রের ছায়া
পর্ব ৪৭: বিষয় নম্বর ১৭
পুরো ভবন অন্ধকার।
শুধু জরুরি আলোর ক্ষীণ লাল আভা করিডোরের মেঝেতে পড়েছে।
মেহেদী স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
তার কানে এখনো প্রতিধ্বনিত হচ্ছে সেই কথাটি।
«"স্বাগতম, বিষয় নম্বর ১৭।"»
মারুফ ফিসফিস করে বললেন,
"সবাই সতর্ক।"
"কেউ একা এগোবে না।"
---
ঠিক তখনই ভবনের ভেতর স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি আলো জ্বলে উঠল।
করিডোরের শেষ প্রান্তে একটি দরজা।
তার ওপরে বড় অক্ষরে লেখা।
LAB-17
সৌরভ বলল,
"এটা কি কাকতালীয়?"
মেহেদী ধীরে উত্তর দিল,
"আজ পর্যন্ত যত কিছু দেখেছি, তার পর আর কোনো কাকতালীয় ঘটনায় বিশ্বাস করি না।"
---
দরজাটি খোলা ছিল।
ভেতরে ঢুকতেই দেখা গেল বহু পুরোনো একটি গবেষণাগার।
ধুলোমাখা কম্পিউটার।
ভাঙা পরীক্ষার যন্ত্র।
দেয়ালে মানুষের মস্তিষ্কের বড় বড় চার্ট।
এক কোণে সাদা বোর্ড।
তাতে অসংখ্য বাক্য লেখা।
পর্যবেক্ষণ।
সিদ্ধান্ত।
বিশ্বাস।
ভয়।
সবগুলোর মাঝখানে লাল কালি দিয়ে একটি মাত্র শব্দ ঘেরা।
স্মৃতি।
---
মিতু বোর্ডের দিকে তাকিয়ে বলল,
"ওদের গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু ছিল স্মৃতি।"
---
মেহেদী ঘরের মাঝখানে একটি পুরোনো ধাতব চেয়ার দেখতে পেল।
চেয়ারটির দুই পাশে হাত বাঁধার বেল্ট।
সামনে একটি ক্যামেরা।
আর ওপরে একটি শক্তিশালী আলো।
ঘরটা দেখে তার বুকের ভেতর অদ্ভুত চাপ অনুভূত হলো।
মাথায় ক্ষণিকের জন্য ঝলসে উঠল কিছু অস্পষ্ট দৃশ্য।
একটি উজ্জ্বল আলো।
একজন মানুষের কণ্ঠ।
«"তুমি কী দেখছ?"»
মেহেদী কপালে হাত রাখল।
---
মারুফ উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন,
"কী হয়েছে?"
"কিছু না..."
"মনে হচ্ছে..."
"আমি আগে কখনো এই ঘরে এসেছি।"
---
মিতু সঙ্গে সঙ্গে বলল,
"স্মৃতি অনেক সময় পরিবেশের কারণে হঠাৎ জেগে উঠতে পারে। তবে অনুভূতি আর বাস্তব স্মৃতি সব সময় এক জিনিস নয়। আমাদের প্রমাণও খুঁজতে হবে।"
মেহেদী মাথা নাড়ল।
"ঠিক বলেছ।"
---
ঠিক তখনই পুরোনো একটি কম্পিউটার নিজে থেকেই চালু হয়ে গেল।
স্ক্রিনে লেখা ভেসে উঠল।
Subject Database
তার নিচে দুটি নাম।
Subject-17
Subject-19
সৌরভ দ্রুত বলল,
"১৭ নম্বরটা খুল!"
---
মেহেদী মাউসে ক্লিক করল।
স্ক্রিনে একটি ভিডিও চালু হলো।
ভিডিওর তারিখ...
১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৭।
একজন বিজ্ঞানী ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে বলছেন,
"পরীক্ষা শুরু করা হচ্ছে।"
"বিষয় নম্বর ১৭..."
"...অস্বাভাবিক পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা প্রদর্শন করেছে।"
"বিষয় নম্বর ১৯..."
"...অন্যের আচরণ নিখুঁতভাবে অনুকরণ করতে সক্ষম।"
---
এরপর ক্যামেরা ঘুরে দুই কিশোরের দিকে গেল।
কিন্তু ঠিক তাদের মুখ দেখানোর মুহূর্তেই ভিডিওতে ডিজিটাল বিকৃতি দেখা দিল।
মুখ দুটি সম্পূর্ণ ঝাপসা।
শুধু শরীরের অবয়ব দেখা যাচ্ছে।
---
মিতু অবাক হয়ে বলল,
"ইচ্ছা করেই মুখ মুছে ফেলা হয়েছে।"
---
ভিডিওর শেষ অংশে বিজ্ঞানী বললেন,
"যদি প্রকল্প সফল হয়..."
"...তাহলে ভবিষ্যতে পরিচয় আর মুখের ওপর নির্ভর করবে না।"
"...নির্ভর করবে আচরণের ওপর।"
ভিডিও শেষ।
---
মারুফ নিচু গলায় বললেন,
"তাহলে PROJECT MIRROR-এর উদ্দেশ্য ছিল..."
মেহেদী বাকিটা বলল,
"এমন মানুষ তৈরি করা, যারা অন্যের পরিচয় বিশ্বাসযোগ্যভাবে ধারণ করতে পারে।"
---
ঠিক তখনই ঘরের অন্য পাশে একটি লোহার আলমারি খুলে গেল।
ভেতর থেকে একটি ফাইল মেঝেতে পড়ল।
ফাইলের নাম...
EXIT REPORT
মেহেদী দ্রুত সেটি খুলল।
ভেতরে মাত্র একটি পৃষ্ঠা।
তার ওপর লেখা।
«Subject-19: পালিয়ে গেছে।»
«Subject-17: অবস্থান অজানা।»
«Project Mirror: আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত।»
তার নিচে লাল কালি দিয়ে কেউ পরে লিখেছে...
«"মিথ্যা।"»
---
হঠাৎ পুরো ভবন কেঁপে উঠল।
দূরে কোথাও ভারী ধাতব দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ।
ধাম!
একটি নয়।
দুটি নয়।
একটার পর একটা।
মিতু আতঙ্কিত গলায় বলল,
"আমাদের বের হওয়ার পথগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে!"
ঠিক সেই মুহূর্তে ভবনের লাউডস্পিকারে সেই পরিচিত শান্ত কণ্ঠ ভেসে এল।
«"দ্বিতীয় খেলায় স্বাগতম।"»
«"এবার আর আমি তোমাদের খুঁজব না।"»
«"এবার তোমরাই আমাকে খুঁজবে..."»
«"...এই ভবনের ভেতর।"»
করিডোরের শেষ প্রান্তে তখন ধীরে ধীরে একটি মানুষের ছায়া দেখা গেল।
এই প্রথম...
মুখোশধারী মানুষটি তাদের সামনে নিজে থেকে এসে দাঁড়াল।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।