কেস ৩: অভিশপ্ত বৃত্ত
পর্ব ১৮: যে স্কুলের অস্তিত্ব ছিল না
রাত প্রায় এগারোটা।
মেহেদী, সৌরভ, শাহীনুর আর মিতু কলেজের পুরোনো রেকর্ড রুমের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
মারুফও সঙ্গে এসেছেন।
কারণ এখন বিষয়টি শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নয়।
এটি তাদের নিজেদের পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
---
মারুফ পুরোনো তালা খুলে বললেন,
"কলেজের প্রতিষ্ঠার নথি এখানে থাকার কথা।"
ভেতরে অসংখ্য পুরোনো ফাইল।
ধুলো জমে আছে।
কাগজের গন্ধে ঘর ভারী।
মিতু টর্চের আলো ফাইলগুলোর ওপর ফেলছিল।
"প্রতিষ্ঠার সাল?"
মেহেদী বলল,
"বারো বছর আগে।"
---
প্রায় বিশ মিনিট খোঁজার পর একটি নীল ফাইল পাওয়া গেল।
উপরের লেখা:
College History and Development Record
মিতু ফাইল খুলে পড়তে শুরু করল।
"প্রতিষ্ঠা..."
"২০১৪ সাল।"
সবাই মাথা নাড়ল।
এটাই তারা জানত।
কিন্তু মেহেদী থামল না।
"পুরোনো ভবনের নকশা দেখো।"
---
নকশা বের করা হলো।
প্রথম পাতায় কলেজের বর্তমান ভবন।
দ্বিতীয় পাতায়...
পুরোনো একটি ভবনের ছবি।
মেহেদীর চোখ আটকে গেল।
ছবির পেছনে যে প্রতীক...
সেটাই সেই প্রতীক।
আয়নার ছবিতে থাকা পুরোনো লোগো।
---
সৌরভ অবাক হয়ে বলল,
"কিন্তু এই ভবন তো কলেজ প্রতিষ্ঠার আগেই থাকার কথা না।"
মিতু দ্রুত নথি পরীক্ষা করল।
তারপর বলল,
"এই ভবন সম্পর্কে কোনো সরকারি রেকর্ড নেই।"
"মানে?"
"মানে কাগজে-কলমে এই ভবন কখনো ছিলই না।"
---
মেহেদী চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
তার মাথায় একটা চিন্তা ঘুরছে।
যদি ভবনটি ছিল না...
তাহলে ছবিটি কোথায় তোলা হয়েছিল?
আর কেন সেখানে তাদের কলেজের প্রতীক?
---
ঠিক তখনই শাহীনুর একটি পুরোনো সংবাদপত্র খুঁজে পেল।
পাতা হলুদ হয়ে গেছে।
তারিখ...
২০০৯ সালের ১৭ মার্চ।
শিরোনাম:
> "পরিত্যক্ত গবেষণা কেন্দ্রের কাছে অগ্নিকাণ্ড"
নিচের ছবিতে একটি ভবন।
মেহেদীর শরীর শিউরে উঠল।
কারণ ভবনটি...
হুবহু সেই ভবন।
---
সংবাদের নিচে লেখা:
"স্থানীয়দের ধারণা, ভবনটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ ছিল।"
"আগুনের পর সেখানে কিছু পুরোনো বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি পাওয়া যায়।"
"কর্তৃপক্ষ ঘটনাটি তদন্ত করছে।"
---
মারুফ কাগজটা হাতে নিয়ে বললেন,
"এই ঘটনা কোথায় ঘটেছিল?"
মিতু নিচের অংশ পড়ে বলল,
"ময়মনসিংহ জেলার..."
তারপর থেমে গেল।
"কী?"
"ঠিক আমাদের কলেজের বর্তমান অবস্থানের পাশে।"
---
ঘরে কেউ কথা বলল না।
অর্থাৎ...
যে জায়গায় এখন কলেজ দাঁড়িয়ে আছে...
সেখানেই একসময় ছিল একটি গোপন গবেষণা কেন্দ্র।
---
মেহেদী ধীরে বলল,
"তাহলে কলেজ প্রতিষ্ঠা হয়নি শূন্য থেকে।"
"কেউ পুরোনো জায়গার ওপর নতুন পরিচয় তৈরি করেছে।"
---
ঠিক তখনই মিতু কম্পিউটারে একটি পুরোনো ডিজিটাল ফাইল পেল।
নাম:
ECHO_TRANSFER_2014
সে ফাইল খুলল।
ভেতরে একটি ভিডিও।
ভিডিওতে একজন তরুণ বিজ্ঞানী।
মুখ দেখা যাচ্ছে না।
কিন্তু কণ্ঠ পরিষ্কার।
"প্রকল্প ECHO বন্ধ করা হয়েছে।"
"কিন্তু পরীক্ষার ফলাফল ধ্বংস করা যায়নি।"
"Subject M-7 সফল।"
"তার স্মৃতি পুনর্গঠন সম্পন্ন হয়েছে।"
---
সৌরভ হতভম্ব হয়ে বলল,
"স্মৃতি পুনর্গঠন?"
মিতু বলল,
"তাত্ত্বিকভাবে মস্তিষ্কের স্মৃতি প্রভাবিত করার গবেষণা নিয়ে বিজ্ঞানীরা কাজ করেছেন।"
"কিন্তু কাউকে সম্পূর্ণ নতুন স্মৃতি দেওয়া..."
"...এটা অত্যন্ত জটিল বিষয়।"
---
ভিডিওতে থাকা মানুষটি আবার বলল,
"যদি কেউ এই ভিডিও পায়..."
"তাহলে বুঝবে, M-7 এখনও সক্রিয়।"
"কিন্তু সে জানে না..."
"সে কে।"
ভিডিও শেষ।
---
মেহেদী অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
"আমাদের একটা কাজ করতে হবে।"
মারুফ জিজ্ঞেস করলেন,
"কী?"
"আমার নিজের অতীত যাচাই করতে হবে।"
---
ঠিক তখনই দরজার বাইরে শব্দ হলো।
সবাই সতর্ক।
মারুফ বন্দুক বের করলেন।
ধীরে দরজা খোলা হলো।
বাইরে কেউ নেই।
শুধু মেঝেতে একটি ছোট বাক্স।
বাক্সের ওপর লেখা:
FOR M-7
---
মেহেদী বাক্সটি খুলল।
ভেতরে একটি পুরোনো ক্যামেরা।
আর একটি ছবি।
এইবার ছবিটি আগের চেয়েও পরিষ্কার।
একটি গবেষণাগার।
কয়েকজন বিজ্ঞানী।
মাঝখানে একটি ছোট ছেলে।
তার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন...
ড. আরিফ সালেহ।
আর ছেলেটির হাতে একটি আয়না।
ছবির পেছনে লেখা:
> "প্রথম দিন: Subject M-7"
নিচে একটি নাম...
মেহেদী হাসান।
মেহেদীর হাত থেকে ছবিটা ধীরে নেমে গেল।
কারণ এবার প্রথমবারের মতো...
সে প্রমাণের সামনে দাঁড়িয়ে।
কিন্তু তার মস্তিষ্কে একটি প্রশ্নই ঘুরছে—
যদি ছবির ছেলেটি সত্যিই সে হয়...
তাহলে তার নিজের শৈশবের স্মৃতিগুলো কার?
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।