পর্ব ৮: যে শিকার শিকারিকে খুঁজছিল
ফাইলটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল মেহেদী।
তার নিজের স্কুল ইউনিফর্ম পরা ছবি।
আরও কয়েকটি ছবি।
একটিতে সে স্কুলের লাইব্রেরিতে বসে বই পড়ছে।
আরেকটিতে বিজ্ঞান মেলার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
আরেকটিতে...
সে মারুফ আংকেলের সঙ্গে থানার সামনে কথা বলছে।
মেহেদীর বুকের ভেতর হালকা কাঁপন শুরু হলো।
এই ছবিগুলো কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে নেওয়া নয়।
এগুলো খুব কাছ থেকে তোলা।
অর্থাৎ...
কেউ দীর্ঘদিন ধরে তার আশপাশেই ছিল।
"মেহেদী..."
মারুফ ধীরে বললেন, "তুই ঠিক আছিস?"
মেহেদী গভীর শ্বাস নিল।
"আমি ঠিক আছি।"
কিন্তু সে জানত, সে মিথ্যা বলছে।
প্রথমবারের মতো তার নিজের ওপরই অদ্ভুত এক অস্বস্তি কাজ করছে।
---
ক্যাম্পে ফিরে সবাই ফাইলগুলো সাজিয়ে বসলো।
মিতু প্রথমেই একটা বিষয় খেয়াল করল।
"দেখো, প্রতিটি ফাইলেই একটা করে সংখ্যা লেখা আছে।"
Subject-03
Subject-07
Subject-09
Subject-11...
সৌরভ বলল,
"এগুলো কি শুধু সিরিয়াল নম্বর?"
মেহেদী মাথা নাড়ল।
"না।"
সে নিজের ফাইলটা খুলে শেষ পাতায় গেল।
সেখানে একটি টেবিল।
তারিখ।
সময়।
পর্যবেক্ষণ।
প্রথম লাইন।
> 'গণিত পরীক্ষায় অস্বাভাবিক বিশ্লেষণী দক্ষতা।'
দ্বিতীয় লাইন।
> 'বয়সের তুলনায় সন্দেহপ্রবণতা বেশি।'
তৃতীয় লাইন।
> 'মানুষের কথা নয়, আচরণ পর্যবেক্ষণ করে।'
চতুর্থ লাইন।
> 'প্রয়োজন হলে ভবিষ্যৎ পরীক্ষার জন্য উপযুক্ত।'
শাহীনুর অবাক হয়ে বলল,
"পরীক্ষা মানে?"
কেউ উত্তর দিতে পারল না।
---
সেদিন রাতেই মেহেদী একটা সিদ্ধান্ত নিল।
"আমাকে একা বের হতে হবে।"
মারুফ প্রায় ধমক দিয়ে বললেন,
"অসম্ভব।"
"ওরা আমাকে অনুসরণ করছে।"
"তাই বলে তুই নিজেকে টোপ বানাবি?"
"টোপ না হলে শিকারি সামনে আসে না।"
কথাটা শুনে ঘরে আবার নীরবতা নেমে এল।
---
রাত বারোটা।
মেহেদী একাই গ্রামের পুরোনো কাঁচা রাস্তা ধরে হাঁটছে।
ইচ্ছা করেই সে মোবাইল বন্ধ রেখেছে।
পেছনে কেউ নেই।
কমপক্ষে তার তাই মনে হচ্ছে।
প্রায় পনেরো মিনিট হাঁটার পর...
ডান পাশের ঝোপে হালকা শব্দ হলো।
মেহেদী হাঁটা থামাল না।
আরও দশ কদম।
আবার শব্দ।
এবার নিশ্চিত।
কেউ তাকে অনুসরণ করছে।
সে রাস্তার বাঁকে পৌঁছেই হঠাৎ দৌড় দিল।
পেছন থেকেও দৌড়ানোর শব্দ।
মেহেদী সরাসরি একটা পরিত্যক্ত ধান গুদামে ঢুকে পড়ল।
ভেতরে অন্ধকার।
সে একটি ভাঙা দেয়ালের আড়ালে দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস আটকে রইল।
কয়েক সেকেন্ড পরে...
কালো পোশাক পরা একজন মানুষ ভেতরে ঢুকল।
লোকটা চারদিকে তাকাচ্ছে।
মেহেদী ধীরে ধীরে তার পেছনে চলে গেল।
হঠাৎ বলল,
"আমাকে খুঁজছেন?"
লোকটা চমকে ঘুরে দাঁড়াল।
মুখে কালো মাস্ক।
এক সেকেন্ডও দেরি করল না।
একটা ধাতব গোলক ছুঁড়ে মারল মাটিতে।
ফসসস...
সাদা ধোঁয়ায় পুরো ঘর ভরে গেল।
মেহেদী চোখ বন্ধ করে মুখ ঢেকে ফেলল।
কয়েক সেকেন্ড পর ধোঁয়া সরে গেলে...
লোকটা নেই।
শুধু মেঝেতে পড়ে আছে একটি ছোট্ট প্লাস্টিকের কার্ড।
---
ক্যাম্পে ফিরে কার্ডটা পরীক্ষা করল সৌরভ।
কার্ডের ভেতরে একটি NFC চিপ।
সৌরভ মোবাইলে স্ক্যান করতেই একটি মাত্র অডিও ফাইল খুলল।
সেখানে বিকৃত কণ্ঠে একজন বলছে,
"ভালো..."
"তুমি আগের চেয়ে দ্রুত শিখছ।"
"তুমি বুঝতে পেরেছ, আমরা ভয় বিক্রি করি।"
"কিন্তু এখনও একটা জিনিস বুঝোনি।"
কণ্ঠটা কয়েক সেকেন্ড থামল।
তারপর বলল,
"এই খেলায় তুমি প্রথম দিন থেকেই অংশগ্রহণ করছ।"
অডিও শেষ।
ঘরে অদ্ভুত নীরবতা।
---
পরদিন সকালে সৌরভ ছবিগুলো আবার বিশ্লেষণ করছিল।
হঠাৎ সে চিৎকার করে উঠল।
"মেহেদী! এটা দেখ!"
সে প্রথম লাশের ছবির পাশে দ্বিতীয় লাশের ছবি রাখল।
তারপর তৃতীয় একটি ছবি।
যেটা মেহেদীর ফাইল থেকে পাওয়া।
তিনটি ছবিতেই দূরে একই মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।
একই উচ্চতা।
একই ভঙ্গি।
একই কালো টুপি।
মিতু বিস্ময়ে বলল,
"এটা কি একই লোক?"
মেহেদী অনেকক্ষণ ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে বলল,
"না..."
সবাই অবাক।
"কেন?"
"কারণ তিনটি ছবিতে সূর্যের দিক আলাদা।"
"তাতে কী?"
"তবুও ছায়ার দৈর্ঘ্য এক।"
সৌরভ থমকে গেল।
"মানে?"
"এই মানুষটাকে পরে ছবিতে বসানো হয়েছে।"
"আবার এডিট?"
"হ্যাঁ।"
"কিন্তু কেন?"
মেহেদী জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
"কারণ খুনি চায় আমরা এমন একজনকে খুঁজি..."
"...যে আদৌ অস্তিত্বই রাখে না।"
ঠিক তখনই মারুফ দ্রুত ঘরে ঢুকলেন।
তার হাতে নতুন ফরেনসিক রিপোর্ট।
তিনি হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন,
"সব শেষ..."
মেহেদী উঠে দাঁড়াল।
"কী হয়েছে?"
মারুফ রিপোর্টটা তার হাতে দিলেন।
রিপোর্টের শেষ লাইনে লেখা ছিল,
> "দ্বিতীয় মৃতদেহের নখের নিচে যে ত্বকের কোষ পাওয়া গেছে, তার ডিএনএ পরীক্ষায় দেখা গেছে সেটি কোনো অজানা ব্যক্তির নয়..."
মেহেদী দ্রুত নিচের লাইনটা পড়ল।
তার মুখের রঙ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
সেখানে লেখা—
> "...ডিএনএটি ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র মেহেদী হাসানের সঙ্গে ৯৯.৯% মিলেছে।"
ঘরের বাতাস যেন এক মুহূর্তে ভারী হয়ে উঠল।
মারুফ ধীরে ধীরে মেহেদীর দিকে তাকালেন।
আর মেহেদীর মাথায় একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল...
কেউ কি তার ডিএনএ ব্যবহার করে তাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে, নাকি এমন কোনো সত্য আছে যা সে নিজেই জানে না?
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।