কেস ৩: অভিশপ্ত বৃত্ত
পর্ব ১১: পুরোনো রেলওয়ে ওয়ার্কশপ
পরদিন সকাল ঠিক ৭টা ৫০ মিনিট।
আকাশ মেঘলা। রাতের বৃষ্টিতে চারপাশ ভিজে আছে। শহরের প্রান্তে অবস্থিত পুরোনো রেলওয়ে ওয়ার্কশপটি প্রায় বিশ বছর ধরে পরিত্যক্ত। মরিচা ধরা রেললাইন, ভাঙা ইঞ্জিন, ছাদ ভেঙে পড়া বিশাল শেড আর আগাছায় ঢাকা প্ল্যাটফর্ম দেখে জায়গাটাকে মৃত শহরের মতো লাগছিল।
মারুফ চারদিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বললেন,
"সবাই সাবধানে থাকবে। কেউ একা কোথাও যাবে না।"
মেহেদী শুধু মাথা নাড়ল। তার চোখ একটানা চারপাশ পর্যবেক্ষণ করছে।
---
ওয়ার্কশপের ভেতরে ঢুকতেই সৌরভ থেমে গেল।
"মেহেদী..."
"কী?"
"মাটিটা দেখ।"
ধুলোর ওপর অসংখ্য পায়ের ছাপ।
কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সবগুলো একই দিকে গেছে।
ফিরে আসার কোনো ছাপ নেই।
শাহীনুর অবাক হয়ে বলল,
"লোকগুলো গেল কোথায়?"
মেহেদী হাঁটু গেড়ে বসে ছাপগুলো পরীক্ষা করল।
কয়েক সেকেন্ড পরে তার ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটল।
"এগুলো আসল না।"
"মানে?"
"একই জুতোর ছাপ বারবার বানানো হয়েছে।"
"দেখ, প্রতিটি ছাপের ক্ষয় একই রকম। বাস্তবে এটা সম্ভব না।"
মারুফ বললেন,
"অর্থাৎ কেউ ইচ্ছে করে আমাদের বিভ্রান্ত করতে চেয়েছে।"
---
তারা আরও ভেতরে এগোতেই একটি বিশাল লোকোমোটিভ চোখে পড়ল।
মরিচা ধরা কালো ইঞ্জিন।
সামনের নম্বর মুছে গেছে।
কিন্তু পাশে সাদা চক দিয়ে লেখা একটি মাত্র শব্দ।
CHECK INSIDE
সৌরভ ফিসফিস করে বলল,
"এত সহজ?"
মেহেদী উত্তর দিল,
"যেটা খুব সহজ মনে হয়, সেটাই আগে সন্দেহ করতে হয়।"
---
সে ইঞ্জিনের চারপাশ ঘুরে দেখল।
হঠাৎ তার চোখে পড়ল একটি পাতলা নাইলনের সুতা।
এতই সূক্ষ্ম যে একটু অসাবধান হলেই ছিঁড়ে যেত।
সে সবাইকে থামিয়ে দিল।
"কেউ সামনে আসবে না।"
মিতু টর্চের আলো ফেলতেই দেখা গেল, সুতাটি ইঞ্জিনের ভেতরে ঢুকে গেছে।
সৌরভ ধীরে বলল,
"ট্রিপওয়্যার?"
"সম্ভবত।"
মেহেদী নিজের ব্যাগ থেকে ছোট্ট একটি আয়না বের করে নিচ দিয়ে আলো ফেলল।
ভেতরে একটি ধাতব ক্যান।
কিন্তু বিস্ফোরক নয়।
ক্যানের সঙ্গে যুক্ত ছিল রঙিন ধোঁয়া ছাড়ার ব্যবস্থা এবং একটি ক্যামেরা।
মারুফ অবাক হয়ে বললেন,
"আবারও মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ।"
মেহেদী মাথা নাড়ল।
"যে ঢুকবে, ধোঁয়ায় ভয় পাবে। আর ক্যামেরা তার প্রতিক্রিয়া রেকর্ড করবে।"
---
সাবধানে সুতা নিষ্ক্রিয় করার পর তারা ইঞ্জিনের কেবিনে উঠল।
সেখানে একটি কাঠের বাক্স।
বাক্সের ওপর পুরোনো পিতলের চাবি।
ঠিক ভিডিওতে দেখা চাবিটি।
গায়ে খোদাই করা...
LAB-7
কিন্তু চাবির নিচে আরেকটি কাগজ রাখা।
মেহেদী কাগজটি তুলে পড়তে শুরু করল।
> "তোমার সবচেয়ে বড় শক্তি যুক্তি।
তোমার সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও যুক্তি।
কারণ তুমি ধরে নাও, সবাই সত্য জানতে চায়।"
---
ঠিক তখনই ওয়ার্কশপের ভেতরে পুরোনো লাউডস্পিকার থেকে কর্কশ শব্দ ভেসে এল।
"স্বাগতম, মেহেদী।"
"তুমি সময়মতো এসেছ।"
মারুফ চারদিকে তাকালেন।
"লোকটা এখানেই আছে!"
কিন্তু কোথাও কাউকে দেখা গেল না।
---
কণ্ঠটি আবার শোনা গেল।
"তুমি কি জানো, একজন মানুষ যখন ভয় পায়, তখন তার মস্তিষ্ক অসম্পূর্ণ তথ্য নিজের মতো করে পূরণ করে?"
"এই কারণেই অন্ধকার ঘরে কাপড় ঝুলতে দেখেও মানুষ ভূত দেখে।"
"এই কারণেই একটি বৃত্ত দেখেই মানুষ অভিশাপ কল্পনা করে।"
মেহেদী শান্ত গলায় বলল,
"তুমি মানুষকে শিক্ষা দিচ্ছ না।"
"তুমি মানুষকে ব্যবহার করছ।"
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর লোকটি হালকা হেসে বলল,
"অবশেষে..."
"...ঠিক প্রশ্নটা করলে।"
---
হঠাৎ ওয়ার্কশপের পেছনের বিশাল লোহার দরজা ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করল।
ধুলো উড়ে চারদিক ঝাপসা হয়ে গেল।
ভেতরে একটি ছোট গবেষণাকক্ষ।
দেয়ালজুড়ে পুরোনো মানচিত্র।
ইলেকট্রনিক সার্কিট।
আর মাঝখানে একটি বড় সাদা বোর্ড।
বোর্ডে লাল কালি দিয়ে লেখা মাত্র দুটি নাম।
ASTER
তার নিচে একটি তীর চিহ্ন।
NEXUS
আর সেই তীরের নিচে লেখা...
> "একই শিকড়। ভিন্ন উদ্দেশ্য।"
মেহেদীর বুক ধক করে উঠল।
সে ধীরে ধীরে বোর্ডের দিকে এগিয়ে গেল।
ঠিক তখনই তার চোখ পড়ল বোর্ডের ডান পাশে টাঙানো একটি ছবিতে।
ছবিতে ড. আরিফ সালেহ দাঁড়িয়ে আছেন।
তাঁর পাশে মারুফের নিখোঁজ বড় ভাই মাহির রহমান।
আর তাদের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন আরেকজন মানুষ...
এবার তাঁর মুখে কোনো কালি নেই।
কোনো ঝাপসাও নেই।
মেহেদী ছবিটার দিকে তাকিয়ে স্থির হয়ে গেল।
কারণ লোকটিকে সে চিনেছে।
এই মানুষটিকে সে এর আগেও দেখেছে।
কিন্তু কোথায়?
মুহূর্তের মধ্যে তার মনে পড়ে গেল।
লোকটি...
প্রথম কেসে গ্রামের ওঝা সেজে উপস্থিত ছিল।
আর তদন্ত শেষে সবাই যখন তাকে নিরীহ ভেবে ছেড়ে দিয়েছিল...
সেই মানুষটিই নীরবে ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে গিয়েছিল।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।