পর্ব ১০: যে লাশের কোনো পরিচয় ছিল না
মারুফের কথা শেষ হতেই ঘরের ভেতরের বাতাস যেন জমে গেল।
"আমার... বাড়ির পেছনে?"
মেহেদীর গলায় প্রথমবারের মতো অনিশ্চয়তার ছাপ ফুটে উঠল।
মারুফ শুধু মাথা নাড়লেন।
"এখনই রওনা দিতে হবে।"
---
দুই ঘণ্টার মধ্যে তারা শহরে পৌঁছে গেল।
ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি। মেহেদীদের বাড়ির সামনে মানুষের ভিড়। পুলিশ পুরো এলাকা ঘিরে রেখেছে।
প্রতিবেশীরা ফিসফিস করছে।
"এই ছেলেটাই তো তদন্ত করছে..."
"তাহলে খুনি কি ওদের বাড়ির আশপাশেই ছিল?"
মেহেদী কোনো দিকে না তাকিয়ে সরাসরি বাড়ির পেছনের আমবাগানে চলে গেল।
লাশটি সাদা কাপড়ে ঢাকা।
মারুফ ধীরে কাপড় সরালেন।
সবাই স্তব্ধ।
এটা আগের লাশগুলোর মতো ছিন্নভিন্ন নয়।
বরং শরীর প্রায় অক্ষত।
শুধু বুকের মাঝখানে একটি ছোট গোলাকার ক্ষত।
আর চোখ দুটি সম্পূর্ণ খোলা।
মনে হচ্ছে মৃত্যুর আগে মানুষটি ভয়ঙ্কর কিছু দেখেছিল।
মিতু হাঁটু গেড়ে বসে পরীক্ষা করতে লাগল।
কয়েক মিনিট পর সে ফিসফিস করে বলল,
"অদ্ভুত..."
"কী?"
"এই মানুষটার শরীরে কোনো পরিচয়পত্র নেই।"
"সেটা তো স্বাভাবিক।"
"না... আমি সেটা বলছি না।"
সে মৃতের দুই হাত তুলে দেখাল।
সবাই অবাক হয়ে গেল।
লোকটির আঙুলে কোনো ফিঙ্গারপ্রিন্টই নেই।
মনে হচ্ছে আঙুলের চামড়া অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তুলে ফেলা হয়েছে।
---
মারুফ গম্ভীর গলায় বললেন,
"এটা কি মৃত্যুর পরে করা হয়েছে?"
মিতু মাথা নাড়ল।
"না। ক্ষত শুকিয়ে গেছে। অন্তত এক সপ্তাহ আগে করা হয়েছে।"
মেহেদী এতক্ষণ চুপ ছিল।
হঠাৎ সে মৃতের জুতোর দিকে তাকাল।
জুতোর নিচে শুকিয়ে থাকা কাদা।
সে ছুরি দিয়ে সামান্য অংশ তুলে কাগজে রাখল।
সৌরভ অবাক হয়ে বলল,
"কাদা নিয়েও তদন্ত হবে?"
মেহেদী শান্ত গলায় বলল,
"সবচেয়ে বেশি মিথ্যা বলে মানুষ। সবচেয়ে কম মিথ্যা বলে মাটি।"
---
ফরেনসিক টিম লাশ নিয়ে চলে গেল।
কিন্তু মেহেদী বাড়ির পেছনের পুরো এলাকাটা ঘুরে দেখতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর সে আমগাছের গায়ে একটা ছোট্ট আঁচড় দেখতে পেল।
খুবই সরু।
যেন ধারালো ধাতু দিয়ে কাটা হয়েছে।
সে নিচু হয়ে মাটি পরীক্ষা করল।
তারপর মারুফকে ডাকল।
"এখানে দেখুন।"
মাটিতে পাশাপাশি দুটি অদ্ভুত দাগ।
সাইকেলের চাকার মতো নয়।
গাড়িরও নয়।
খুব সরু।
সমান দূরত্বে।
মারুফ বললেন,
"কীসের দাগ?"
মেহেদী সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না।
সে নিজের নোটবুক খুলে আগের দুইটি হত্যাস্থলের ছবি বের করল।
সেখানে...
একই দাগ।
তার চোখে এক ঝলক উজ্জ্বলতা ফুটে উঠল।
"আমরা এতদিন বড় বড় প্রমাণের পেছনে ছুটেছি..."
"...আসল সূত্রটা আমাদের পায়ের নিচেই ছিল।"
---
সেদিন বিকেলে কাদার নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হলো।
রাতের দিকে রিপোর্ট এল।
মাটিতে প্রচুর ম্যাগনেটাইট কণা পাওয়া গেছে।
সাধারণ গ্রামের মাটিতে এত পরিমাণে ম্যাগনেটাইট থাকার কথা নয়।
সৌরভ ভ্রু কুঁচকে বলল,
"এটা কোথা থেকে এলো?"
মেহেদী বলল,
"যেখানে ভারী শিল্পযন্ত্র চলে, সেখানে এই ধরনের কণা পাওয়া যায়।"
"মানে?"
"খুনি হয় কোনো শিল্পকারখানায় কাজ করে..."
সে একটু থামল।
"...অথবা এমন কোনো যন্ত্র ব্যবহার করছে, যেটাতে শক্তিশালী চুম্বক আছে।"
---
ঠিক তখনই মিতুর ফোনে ফরেনসিক ল্যাব থেকে আরেকটি খবর এল।
সে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে শুনল।
তারপর ধীরে ফোনটা নামিয়ে রাখল।
তার মুখের রঙ বদলে গেছে।
"মেহেদী..."
"হ্যাঁ?"
"এই মৃত মানুষটার ডিএনএ কোনো জাতীয় ডেটাবেসে নেই।"
মারুফ বললেন,
"বিদেশি?"
"হতে পারে।"
মিতু আবার বলল,
"কিন্তু আরও অদ্ভুত একটা বিষয় আছে।"
"কী?"
"তার রক্তে সেই একই নীল রাসায়নিক পাওয়া গেছে..."
সবাই একসঙ্গে তাকাল।
"...কিন্তু এর ঘনত্ব আগের তিনজনের তুলনায় প্রায় দশ গুণ বেশি।"
ঘরে নীরবতা।
মেহেদী ধীরে ধীরে জানালার দিকে এগিয়ে গেল।
তার মাথায় যেন একের পর এক হিসাব মিলছে।
"যদি এই রাসায়নিক মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ব্যবহার করা হয়..."
"...তাহলে মাত্রা বাড়ালে কী হবে?"
মিতু উত্তর দিল,
"সম্ভবত মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কাজ পুরোপুরি ভেঙে পড়বে।"
---
ঠিক সেই মুহূর্তে সৌরভ ল্যাপটপ নিয়ে দৌড়ে এল।
"আমি হার্ডডিস্ক থেকে একটা ভিডিও উদ্ধার করেছি!"
সবাই স্ক্রিনের সামনে বসল।
ভিডিও শুরু হলো।
ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন একজন মধ্যবয়স্ক বিজ্ঞানী।
এবার মুখ ঝাপসা নয়।
স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
তার চোখে অদ্ভুত ক্লান্তি।
তিনি বললেন,
> "আমার নাম ড. আরিফ সালেহ।"
ঘরের সবাই নিঃশ্বাস আটকে শুনছে।
তিনি আবার বললেন,
> "যদি এই ভিডিও কেউ দেখে, তাহলে ধরে নেবে আমি হয় মৃত... নয়তো আমাকে মৃত বানানো হয়েছে।"
ভিডিওতে তিনি টেবিলের ওপর একটি ফাইল রাখলেন।
ফাইলের ওপর বড় করে লেখা—
PROJECT NIRVANA
ড. আরিফ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বললেন,
> "আমি মানুষকে অমর করার গবেষণা করিনি।"
> "আমি গবেষণা করছিলাম..."
তিনি থামলেন।
তারপর এমন একটি বাক্য বললেন, যা শুনে মেহেদীর শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
> "আমি গবেষণা করছিলাম, কীভাবে একজন মানুষের স্মৃতি অন্য একজন মানুষের মস্তিষ্কে স্থানান্তর করা যায়।"
ভিডিও হঠাৎ কেটে গেল।
স্ক্রিন কালো হয়ে গেল।
ঘরে কেউ কোনো কথা বলল না।
কারণ এই একটি তথ্য পুরো কেসটাকে নতুন দিকে ঘুরিয়ে দিল।
এখন প্রশ্ন শুধু খুনি কে, সেটা নয়।
প্রশ্ন হলো... এই রহস্যের কেন্দ্রে কি শুধু খুন, নাকি মানুষের স্মৃতি নিয়েও ভয়ঙ্কর এক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা চলছে?
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।