পেশ করছি পরবর্তী পর্ব।
কেস ৪: অঘোরী রুদ্রের ছায়া
পর্ব ৭৩: বিশ বছর পর
রাত ১০টা ৪৭।
শালবন গ্রামের আকাশ কালো মেঘে ঢাকা।
মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকানি পুরো গ্রামকে এক মুহূর্তের জন্য আলোকিত করে আবার অন্ধকারে ডুবিয়ে দিচ্ছে।
পুলিশের গাড়িগুলো গ্রামের বাইরে থেমে আছে।
মেহেদী ইচ্ছা করেই কাউকে সঙ্গে নিল না।
শুধু মারুফ, মিতু আর সৌরভ দূর থেকে নজর রাখছে।
রুদ্রের শর্ত ছিল পরিষ্কার।
"একাই আসবি।"
---
অনাথ আশ্রমের লোহার গেটটি আধখোলা।
জং ধরা গেট বাতাসে কাঁপছে।
মেহেদী ভেতরে পা রাখতেই একটি পুরোনো ঘণ্টা নিজে থেকেই বেজে উঠল।
ঢং...
একবার।
দুবার।
তারপর আবার নীরবতা।
---
আশ্রমের মূল ভবনে ঢুকতেই সে দেখল, ধুলোমাখা করিডোরে ছোট ছোট পায়ের ছাপ।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়...
সব পায়ের ছাপ একই মানুষের।
ইচ্ছে করেই বিভিন্ন মাপের জুতা ব্যবহার করা হয়েছে, যেন মনে হয় এখানে অনেক লোক চলাফেরা করেছে।
মেহেদী মৃদু হেসে বলল,
"এখনও একই কৌশল..."
---
করিডোরের শেষ প্রান্তে একটি কাঠের টেবিল।
টেবিলের ওপর সেই পুরোনো কাঠের বাক্স।
যেটি ছবিতে দেখা গিয়েছিল।
বাক্সের ঢাকনায় খোদাই করা দুটি নাম।
মেহেদী
রুদ্র
---
মেহেদী ধীরে বাক্সটি খুলল।
ভেতরে কোনো অস্ত্র নেই।
কোনো নথিও নেই।
শুধু দুটি কাঁচের গুলি, একটি লাল কাপড়ের বল, আর একটি ভাঁজ করা চিঠি।
চিঠিটি শিশুসুলভ হাতের লেখায় লেখা।
«"যদি আমরা বড় হয়ে আলাদা হয়ে যাই, তাহলে যে আগে এই বাক্স খুলবে, সে অন্যজনকে খুঁজে বের করবে। আমরা কেউ খারাপ মানুষ হব না।"»
নিচে দুটি ছোট্ট স্বাক্ষর।
মেহেদী
রুদ্র
---
মেহেদীর চোখ ভিজে উঠল।
সে ফিসফিস করে বলল,
"আমরা কথা রাখতে পারিনি..."
---
ঠিক তখনই পেছন থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে এল।
"না।"
"তুই কথা রেখেছিস।"
---
মেহেদী ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে রুদ্র।
আজ তার হাতে কোনো অস্ত্র নেই।
মুখে কোনো মুখোশও নেই।
শুধু চোখে গভীর ক্লান্তি।
---
দুজন কয়েক সেকেন্ড একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল।
কেউ কথা বলল না।
বিশ বছরের দূরত্ব যেন সেই নীরবতার মধ্যেই দাঁড়িয়ে আছে।
---
রুদ্র মৃদু হেসে বলল,
"তুই অনেক বদলে গেছিস।"
---
মেহেদী উত্তর দিল,
"তুইও।"
---
রুদ্র মাথা নাড়ল।
"না।"
"আমি বদলাইনি।"
"আমাকে বদলে দেওয়া হয়েছে।"
---
বাতাস হঠাৎ জোরে বইতে শুরু করল।
পুরোনো জানালাগুলো কাঁপতে লাগল।
---
মেহেদী এক পা সামনে এগিয়ে এল।
"চল।"
"সব শেষ করি।"
---
রুদ্র দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
"সব শেষ করার সময় অনেক আগেই চলে গেছে।"
"আজ শুধু সত্য বলার সময়।"
---
সে পকেট থেকে একটি ছোট রেকর্ডার বের করে মেঝেতে রাখল।
"এটার ভেতরে সব আছে।"
"Project Mirror।"
"কামরান।"
"আমাদের অপহরণ।"
"সব।"
---
মেহেদী রেকর্ডারের দিকে এগোতেই রুদ্র হাত তুলে থামাল।
"একটা কথা আগে শুন।"
---
"বল।"
---
রুদ্র ধীরে বলল,
"বিশ বছর আগে..."
"সেদিন ওরা দুজনকে নিয়ে গিয়েছিল।"
"কিন্তু পরীক্ষার জন্য একজনকেই বেছে নিয়েছিল।"
---
মেহেদীর বুক ধক করে উঠল।
"তাহলে..."
---
রুদ্র তিক্ত হেসে বলল,
"তোর পরীক্ষা সফল হয়েছিল।"
"আমারটা হয়নি।"
---
সে চোখ বন্ধ করল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
«"আমি কখনো কামরানের প্রথম পছন্দ ছিলাম না, মেহেদী।"»
«"আমি ছিলাম... তার ব্যর্থ পরীক্ষার ফল।"»
ঠিক সেই মুহূর্তে...
আশ্রমের বাইরে গুলির শব্দ ভেসে এল।
ধাম!
ধাম!
মারুফের কণ্ঠ ওয়্যারলেসে চিৎকার করে উঠল,
"মেহেদী! বের হয়ে আসো!"
"আমরা হামলার মুখে পড়েছি!"
রুদ্র চোখ বন্ধ করল।
তার মুখে কোনো বিস্ময় নেই।
সে যেন আগেই জানত।
ধীরে বলল,
«"সে এসে গেছে..."»
মেহেদী ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল,
"কে?"
রুদ্র ধীরে চোখ খুলল।
তার চোখে প্রথমবার ভয় স্পষ্ট।
সে বলল,
«"কামরান।"»
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।