পর্ব ১৩: কবরের ভেতরের মানুষ
ঘরের ভেতর এমন নীরবতা নেমে এল যে কম্পিউটারের কুলিং ফ্যানের শব্দও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল।
মেহেদী ধীরে ধীরে স্পিকারের দিকে তাকাল।
"তুমি বলছ, যাদের আমরা মৃত ভেবেছি... তারা বেঁচে আছে?"
কোনো উত্তর এল না।
কয়েক সেকেন্ড পর স্ক্রিনে একটি ভিডিও চালু হলো।
ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে একটি হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার।
দুইজন মানুষ স্ট্রেচারে শুয়ে আছে।
তাদের মুখ কাপড়ে ঢাকা।
চারপাশে সাদা পোশাক পরা কয়েকজন ব্যক্তি।
একজনের কণ্ঠ শোনা গেল,
"Subject-03 প্রস্তুত। Subject-08 নিয়ে আসো।"
ভিডিওর ডান পাশে তারিখ লেখা।
মেহেদী চোখ ছোট করে তাকাল।
তারিখটা প্রথম হত্যার আঠারো দিন আগে।
মিতু অবাক হয়ে বলল,
"কিন্তু Subject-03 তো প্রথম খুন হওয়া মানুষ!"
"ঠিক।"
মেহেদী ভিডিও থামিয়ে জুম করল।
স্ট্রেচারে শোয়া মানুষের ডান হাতে একটা পুরোনো পোড়ার দাগ।
সে দ্রুত প্রথম লাশের ছবি বের করল।
দুই ছবির দাগ এক।
একই মানুষ।
অর্থাৎ...
খুনের অনেক আগেই তাকে কোথাও আটকে রাখা হয়েছিল।
---
মারুফ গম্ভীর গলায় বললেন,
"তাহলে খুনি মানুষগুলোকে অপহরণ করত..."
"...অনেক দিন জীবিত রাখত..."
মেহেদী বাকিটা বলল,
"...তারপর কোনো পরীক্ষার অংশ বানাত।"
---
ঠিক তখনই কম্পিউটারের স্ক্রিনে আবার লেখা ভেসে উঠল।
> "যদি সত্য জানতে চাও, মৃতদের কবর খুলো।"
সৌরভ চমকে উঠল।
"এটা কী পাগলামি!"
মেহেদী চুপ।
তার মাথায় একের পর এক তথ্য মিলছে।
কম রক্ত।
মৃত্যুর সময় নিয়ে অসঙ্গতি।
অস্বাভাবিক রাসায়নিক।
ডিএনএর অদ্ভুত ফলাফল।
সবকিছু যেন একটা জায়গায় গিয়ে মিলছে।
সে মারুফের দিকে তাকাল।
"আমি জানি, এটা আইনগতভাবে কঠিন।"
"কিন্তু..."
মারুফ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
"...আমাদের কবর খুলতেই হবে।"
---
পরদিন আদালতের বিশেষ অনুমতি পাওয়ার পর গ্রামের কবরস্থানে কাজ শুরু হলো।
পুরো এলাকা পুলিশ ঘিরে রেখেছে।
গ্রামের মানুষ আতঙ্কিত।
কেউ বলছে, "মৃতদের শান্তি নষ্ট করা হচ্ছে।"
কেউ বলছে, "অভিশাপ আরও বাড়বে।"
মেহেদী কারও কথায় কান দিল না।
প্রথম কবর খোঁড়া হলো।
কফিন ওপরে তোলা হলো।
মারুফ নিজে দাঁড়িয়ে আছেন।
ধীরে ধীরে ঢাকনা খুলল।
সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে রইল।
তারপর...
মিতু হঠাৎ এক পা পিছিয়ে গেল।
"এটা..."
কফিনের ভেতরে একজন মানুষের কঙ্কাল নেই।
আছে প্রায় অক্ষত একটি দেহ।
মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ পর কোনো দেহের এমন থাকার কথা নয়।
মেহেদী নিচু হয়ে পরীক্ষা করল।
তারপর সে থমকে গেল।
"এটা..."
সে মৃতের ডান কানটা দেখল।
কানের নিচে তিনটি সূক্ষ্ম ছিদ্র।
ঠিক আগের রিপোর্টের মতো।
কিন্তু আরও অদ্ভুত কিছু ছিল।
মৃতের ঘাড়ের পেছনে একটি ক্ষুদ্র অস্ত্রোপচারের দাগ।
আগে কেউ খেয়ালই করেনি।
---
মিতু দাগটা পরীক্ষা করে বলল,
"এটা সাধারণ অস্ত্রোপচার নয়।"
"কেন?"
"কারণ কাটাটা মেরুদণ্ডের একেবারে ওপরে।"
সে ধীরে বলল,
"এখানে সাধারণত নিউরোসার্জারিতে কাজ করা হয়।"
মেহেদীর বুক ধক করে উঠল।
---
ঠিক তখনই দ্বিতীয় কবর খোঁড়া হলো।
সেখানেও একই অবস্থা।
একই দাগ।
একই তিনটি ছিদ্র।
একই ধরনের সংরক্ষিত দেহ।
মারুফ অবিশ্বাসের গলায় বললেন,
"এটা কীভাবে সম্ভব?"
মিতু উত্তর দিল,
"কেউ মৃত্যুর আগে এমন কিছু রাসায়নিক ব্যবহার করেছে, যাতে দেহের পচন অনেক ধীর হয়েছে।"
---
সন্ধ্যায় ল্যাবে ফিরে মেহেদী একা বসে দুই মৃতের এক্স-রে দেখতে লাগল।
হঠাৎ তার চোখ থেমে গেল।
সে দ্রুত স্ক্রিন বড় করল।
ঘাড়ের পেছনে...
মেরুদণ্ডের গোড়ায়...
একটি ক্ষুদ্র ধাতব বিন্দু।
প্রথমে মনে হয় এক্স-রের ত্রুটি।
কিন্তু দ্বিতীয় এক্স-রেতেও একই জিনিস।
মেহেদী চিৎকার করে উঠল,
"মিতু!"
মিতু দৌড়ে এল।
"কী হয়েছে?"
মেহেদী স্ক্রিন দেখাল।
মিতুর মুখ সাদা হয়ে গেল।
"এটা..."
"হ্যাঁ।"
"ইমপ্লান্ট?"
"সম্ভবত।"
---
রাত আটটা।
ফরেনসিক সার্জন অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ধাতব বস্তুটি বের করলেন।
সেটা ছিল চালের দানার থেকেও ছোট।
সৌরভ লেন্সে দেখে বলল,
"এটা তো চিপের মতো!"
ল্যাবের মাইক্রোস্কোপে বস্তুটি পরীক্ষা করা হলো।
সার্জন ধীরে বললেন,
"এটা চিকিৎসায় ব্যবহৃত কোনো সাধারণ ইমপ্লান্ট নয়।"
মেহেদী চুপচাপ তাকিয়ে আছে।
ঠিক তখনই সৌরভ সেটাকে একটি বিশেষ রিডারের কাছে নিতেই...
বিপ...
যন্ত্রটি সাড়া দিল।
সবার চোখ বড় হয়ে গেল।
সৌরভ ফিসফিস করে বলল,
"এটার ভেতরে এখনও বিদ্যুৎ আছে..."
পরের মুহূর্তেই কম্পিউটারের স্ক্রিন নিজে থেকেই জ্বলে উঠল।
কোনো কিবোর্ড ছাড়াই লেখা ভেসে উঠল।
> IMPLANT S-03 DETECTED
তারপর দ্বিতীয় লাইন।
> MEMORY ARCHIVE AVAILABLE
মেহেদীর বুকের ভেতর ধাক্কা লাগল।
সে ধীরে ধীরে স্ক্রিনের দিকে এগিয়ে গেল।
যদি এই চিপ সত্যিই স্মৃতি সংরক্ষণ করে...
তাহলে হয়তো...
একজন মৃত মানুষের শেষ দেখা মুহূর্তগুলো এখনও এর ভেতরে জীবিত আছে।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।