কেস ৩: অভিশপ্ত বৃত্ত
পর্ব ১২: যে মানুষটিকে কেউ মনে রাখেনি
মেহেদীর হাত থেকে ছবিটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
সে দ্রুত ছবিটা আবার চোখের সামনে তুলে ধরল।
ড. আরিফ সালেহ।
মাহির রহমান।
আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি...
হালকা দাড়ি, সাধারণ শার্ট, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা।
চেহারায় এমন কিছু নেই যা আলাদা করে মনে থাকে।
কিন্তু ঠিক এই কারণেই মেহেদীর মনে পড়ে গেল।
প্রথম কেসের সেই গ্রামে...
যখন সবাই তান্ত্রিককে ঘিরে হৈচৈ করছিল, তখন একজন নীরব ওঝা মানুষের ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিল।
তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই সে অদৃশ্য হয়ে যায়।
তখন কেউ গুরুত্ব দেয়নি।
মেহেদীও না।
---
সৌরভ ছবিটা দেখে বলল,
"তুই নিশ্চিত?"
"একশো ভাগ না।"
"কিন্তু নব্বই ভাগ নিশ্চিত।"
মিতু বলল,
"তুই আগে বলিসনি কেন?"
মেহেদী হালকা হেসে বলল,
"কারণ তখন ওকে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি।"
"আমার ভুল হয়েছে।"
---
ঠিক তখনই মেহেদীর চোখে আরেকটি বিষয় পড়ল।
ছবির নিচে একটি তারিখ।
১৪ আগস্ট, ২০০৮
সে ভ্রু কুঁচকে বলল,
"অসম্ভব।"
মারুফ জিজ্ঞেস করলেন,
"কী হয়েছে?"
"ড. আরিফ তো এর অনেক আগেই নিখোঁজ হয়েছিলেন।"
"তাহলে ২০০৮ সালের ছবি কীভাবে সম্ভব?"
ঘরে আবার নীরবতা।
---
মিতু ছবিটা স্ক্যান করে বড় করল।
কিছুক্ষণ পরীক্ষা করে সে বলল,
"ছবিটা পরিবর্তন করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না।"
"অন্তত সাধারণ সম্পাদনার কোনো চিহ্ন নেই।"
মেহেদী ছবিটা হাতে নিয়ে জানালার আলোয় ধরল।
"তাহলে দুটি সম্ভাবনা আছে।"
"এক..."
"আমাদের কাছে ড. আরিফের নিখোঁজ হওয়ার তথ্য ভুল।"
"দুই..."
"...কেউ তাঁর পরিচয় ব্যবহার করছিল।"
---
হঠাৎ গবেষণাকক্ষের দেয়ালে লাগানো একটি পুরোনো মনিটর নিজে থেকেই চালু হয়ে গেল।
স্ক্রিনে সেই পরিচিত কালো পোশাকের মানুষ।
তবে এবার তার কণ্ঠে আগের মতো ব্যঙ্গ নেই।
বরং অদ্ভুত এক শান্ত ভাব।
"মেহেদী..."
"তুমি কি জানো, মানুষের স্মৃতি কত সহজে বদলে যায়?"
সে টেবিল থেকে দুটি ছবি তুলল।
দুটি একই রকম।
কিন্তু একটিতে একজন অতিরিক্ত মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।
সে বলল,
"এই দুটি ছবি একশো জনকে দেখানো হয়েছিল।"
"এক সপ্তাহ পরে তাদের জিজ্ঞেস করা হয়..."
"...প্রথম ছবিতে কতজন মানুষ ছিল?"
"অধিকাংশ মানুষ ভুল উত্তর দিয়েছিল।"
---
সে আবার বলল,
"স্মৃতি ক্যামেরা নয়।"
"প্রতিবার মনে করার সময় স্মৃতি নতুন করে গঠিত হয়।"
"এই কারণেই সাক্ষীর বক্তব্য সব সময় নির্ভুল হয় না।"
মেহেদী চুপচাপ শুনছিল।
লোকটির কথায় বৈজ্ঞানিক সত্যের ছাপ আছে।
কিন্তু সে এটাও জানে...
সত্য ব্যবহার করেও মানুষকে প্রতারণা করা যায়।
---
ভিডিওর শেষ দিকে লোকটি একটি ফাইল ক্যামেরার সামনে ধরল।
ফাইলের ওপর বড় অক্ষরে লেখা।
PROJECT ECHO
তারপর সে বলল,
"ASTER মানুষের বিশ্বাস নিয়ে কাজ করেছিল।"
"NEXUS মানুষের প্রতিক্রিয়া নিয়ে কাজ করছে।"
"কিন্তু ECHO..."
সে কয়েক সেকেন্ড থামল।
"...মানুষের স্মৃতি নিয়ে কাজ করবে।"
ভিডিও শেষ।
---
ঠিক তখনই শাহীনুর গবেষণাকক্ষের বুকশেলফের পেছনে একটি লুকানো ড্রয়ার খুঁজে পেল।
ড্রয়ারের ভেতরে পুরোনো ডায়েরি নয়...
বরং একটি ক্যাসেট।
আর তার সঙ্গে একটি ছোট কাগজ।
> "মাহির রহমানের শেষ সাক্ষাৎকার।"
মারুফের হাত কেঁপে উঠল।
তিনি ধীরে ক্যাসেটটি তুলে নিলেন।
"এটা..."
"...আমার ভাইয়ের কণ্ঠ হতে পারে।"
---
সৌরভ দ্রুত পুরোনো ক্যাসেট প্লেয়ার খুঁজে বের করল।
সবাই নিঃশ্বাস আটকে অপেক্ষা করছে।
ক্যাসেট চালু হলো।
কিছুক্ষণ শুধু শোঁ শোঁ শব্দ।
তারপর...
একজন মানুষের ক্লান্ত কণ্ঠ।
"আমার নাম মাহির রহমান।"
মারুফের চোখ ভিজে উঠল।
ঘরে কেউ কথা বলল না।
কণ্ঠটি আবার শোনা গেল।
"যদি কেউ এই রেকর্ড শুনে..."
"...তাহলে বুঝবে আমরা ব্যর্থ হয়েছি।"
"আমরা এমন কিছু আবিষ্কার করেছি..."
"...যেটা কোনো রাষ্ট্রের হাতে থাকা উচিত নয়।"
হঠাৎ রেকর্ডিংয়ে বিকট শব্দ হলো।
তারপর আরেকজনের কণ্ঠ ভেসে এল।
একেবারে পরিষ্কার।
"মাহির..."
"রেকর্ডিং বন্ধ করো।"
মেহেদীর শরীর কেঁপে উঠল।
এই কণ্ঠ...
সে আগে শুনেছে।
কোথায়?
কয়েক সেকেন্ড পর তার চোখ বড় হয়ে গেল।
সে ধীরে ধীরে মারুফের দিকে তাকাল।
"আংকেল..."
"এই কণ্ঠটা..."
"...আমি আগেও শুনেছি।"
মারুফ উদ্বিগ্ন গলায় বললেন,
"কার?"
মেহেদী ধীরে উত্তর দিল,
"আপনার অফিসে।"
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।