পর্ব ৬: মৃত্যুর কাউন্টডাউন
"সবাই পিছিয়ে যাও!"
মেহেদীর চিৎকার শেষ হতেই মারুফ এক ঝটকায় মিতু আর সৌরভকে টেনে সরিয়ে দিলেন। শাহীনুর মাটিতে গড়িয়ে পাশের একটি কংক্রিটের স্তম্ভের আড়ালে চলে গেল।
চারদিকে নিস্তব্ধতা।
শুধু ছোট্ট ট্র্যাকারটির ভেতর থেকে ভেসে আসছে...
বিপ... বিপ... বিপ...
প্রতিটি শব্দ যেন বুকের ভেতর আঘাত করছিল।
দশ সেকেন্ড।
বিশ সেকেন্ড।
ত্রিশ সেকেন্ড।
কিছুই হলো না।
মেহেদী ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
"আংকেল... কেউ কাছে যাবেন না।"
সে ব্যাগ থেকে একটি লম্বা ধাতব স্কেল বের করল। স্কেলের মাথা দিয়ে ট্র্যাকারটিকে আলতো করে উল্টাতেই নিচে একটি ভাঁজ করা কাগজ বেরিয়ে এল।
মারুফ কপাল কুঁচকে বললেন,
"বোমা নয়?"
মেহেদী শান্ত গলায় বলল,
"না।"
"তাহলে এই শব্দ?"
"ইচ্ছাকৃত।"
সে ট্র্যাকারটা হাতে তুলে দেখাল।
"এটা মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ। মানুষ 'বিপ' শব্দ শুনলেই ধরে নেয় বোমা। অপরাধী চায় আমরা আতঙ্কিত হই, ভুল করি।"
সৌরভ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
"লোকটা আমাদের মাথা নিয়ে খেলছে।"
"ঠিক সেটাই।"
---
কাগজটি খুলতেই সবাই স্তব্ধ।
ভেতরে একটি মানচিত্র।
পুরো কালোছায়া গ্রামের।
লাল কালি দিয়ে বারোটি জায়গায় গোল চিহ্ন আঁকা।
এর মধ্যে দুটি গোলের ওপর বড় করে ক্রস চিহ্ন।
মেহেদী ফিসফিস করে বলল,
"দুটি হত্যাস্থল..."
অর্থাৎ বাকি দশটি লাল গোল?
মিতুর গলা শুকিয়ে গেল।
"এগুলো কি... ভবিষ্যতের হত্যাস্থল?"
কেউ উত্তর দিল না।
---
পরদিন সকাল।
মেহেদী, মারুফ এবং পুরো টিম মানচিত্রের তৃতীয় লাল চিহ্নে পৌঁছাল।
জায়গাটি গ্রামের পুরোনো পানি তোলার পাম্পঘর।
বহু বছর ধরে পরিত্যক্ত।
দরজায় বিশাল তালা।
মারুফ তালা ভাঙার নির্দেশ দিলেন।
দরজা খুলতেই এক ধরনের ঠান্ডা বাতাস বেরিয়ে এল।
ঘরের ভেতর ধুলোর স্তর।
কিন্তু মেহেদী এক জায়গায় থেমে গেল।
মেঝের ওপর ধুলো জমেছে।
তবু এক ফুট চওড়া একটি সরু দাগ একেবারে পরিষ্কার।
যেন ভারী কিছু টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
"আলো দাও।"
সৌরভ টর্চ ধরতেই দেখা গেল দাগটি দেয়ালের কাছে গিয়ে শেষ হয়েছে।
মেহেদী দেয়ালে হাত বুলাতে লাগল।
হঠাৎ...
খট।
দেয়ালের একটি অংশ ভেতরের দিকে সরে গেল।
গোপন দরজা।
---
সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতেই সবাই অবাক।
মাটির নিচে বিশাল একটি কক্ষ।
দেয়ালজুড়ে বৈদ্যুতিক তার।
জেনারেটর।
বাতাস চলাচলের পাইপ।
আর সারি সারি স্টিলের খাঁচা।
খাঁচাগুলো খালি।
কিন্তু প্রতিটির গায়ে নম্বর লেখা।
S-01
S-02
...
S-17
মিতুর গলা কেঁপে উঠল।
"ভিডিওর Subject-17..."
মেহেদী মাথা নাড়ল।
"হ্যাঁ।"
সে খাঁচাগুলো পরীক্ষা করতে লাগল।
একটিতে শুকিয়ে যাওয়া রক্ত।
অন্যটিতে মানুষের চুল।
আরেকটিতে নখের ভাঙা অংশ।
মারুফ দাঁত চেপে বললেন,
"এখানে মানুষকে আটকে রাখা হতো।"
---
ঠিক তখনই শাহীনুর একটি টেবিলের নিচে ছোট্ট কাঁচের শিশি দেখতে পেল।
ভেতরে আবার সেই নীল তরল।
মিতু গ্লাভস পরে তুলে নিল।
"এটা ল্যাবে পাঠাতে হবে।"
মেহেদী বলল,
"না।"
সবাই তার দিকে তাকাল।
"এর অল্প অংশ এখানেই পরীক্ষা করা যায়।"
সে নিজের ব্যাগ থেকে একটি ছোট UV টর্চ বের করল।
নীল আলো ফেলতেই তরলটি অদ্ভুত সবুজ আভা ছড়াতে লাগল।
মিতু বিস্ময়ে বলল,
"এটা সাধারণ রাসায়নিক না।"
মেহেদী উত্তর দিল,
"না। এর মধ্যে ফ্লুরোসেন্ট মার্কার মেশানো হয়েছে।"
"কেন?"
"যাতে শরীরে প্রবেশ করার পর বিশেষ আলোয় মানুষকে ট্র্যাক করা যায়।"
মারুফ স্তব্ধ।
"মানে... পরীক্ষার মানুষগুলো পালালেও তাদের খুঁজে পাওয়া যেত?"
"সম্ভবত।"
---
ঠিক তখনই সৌরভ চিৎকার করে উঠল।
"এইদিকে আসো!"
সে একটি কম্পিউটারের সামনে দাঁড়িয়ে।
পুরোনো ডেস্কটপ।
অদ্ভুতভাবে এখনও চালু।
স্ক্রিনে মাত্র একটি ফাইল খোলা।
শিরোনাম:
Selection Criteria
মেহেদী পড়তে শুরু করল।
প্রথম লাইন।
> "পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত ব্যক্তিদের অবশ্যই একটি নির্দিষ্ট ঘটনার সাক্ষী হতে হবে।"
দ্বিতীয় লাইন।
> "তাদের বয়স ৩০ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে।"
তৃতীয় লাইন।
> "তারা সবাই জমিদারবাড়ির মালিকানা মামলার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত।"
ঘরের সবাই একে অপরের দিকে তাকাল।
এখন আর সন্দেহ নেই।
হত্যাগুলো এলোমেলো নয়।
সবাইকে বেছে নেওয়া হয়েছে।
---
হঠাৎ কম্পিউটার স্ক্রিন নিজে থেকেই ঝিলমিল করতে শুরু করল।
তারপর লেখা ভেসে উঠল।
WELCOME, MEHEDI.
সৌরভ হতভম্ব।
"এটা... আমাদের নাম জানে!"
পরের লাইন।
তুমি আমার ল্যাবে দাঁড়িয়ে আছ।
মারুফ সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে তাকালেন।
"কেউ আমাদের দেখছে!"
এরপর আরেকটি লাইন।
উপরে তাকাও।
সবাই একসঙ্গে ছাদের দিকে তাকাল।
চার কোণায় ছোট ছোট কালো কাচ।
ক্যামেরা।
মেহেদী ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
"তুমি যদি এত বুদ্ধিমান হও, তাহলে সামনে এসে কথা বলো।"
দুই সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর স্পিকারে ভেসে এল এক বিকৃত কণ্ঠ।
"দাবার প্রথম চাল আমি দিয়েছিলাম।"
"এখন তুমি বোর্ডে ঢুকে পড়েছ।"
"কিন্তু একটা ভুল করেছ, মেহেদী।"
"তুমি ভাবছ, তান্ত্রিকরাই আমার দল।"
কয়েক সেকেন্ড থেমে কণ্ঠটি আবার বলল,
"ওরা শুধু অভিনেতা।"
"আসল খেলোয়াড়দের তুমি এখনও দেখোনি।"
ঠিক তখনই কম্পিউটারের স্ক্রিনে একটি ছবি ভেসে উঠল।
ছবিটি দেখে মেহেদীর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
ছবিতে দেখা যাচ্ছে...
আজ সকালে ক্যাম্প থেকে বের হওয়ার সময় তোলা একটি ছবি।
অর্থাৎ...
খুনি শুধু তাদের দেখছে না। সে তাদের প্রতিটি পদক্ষেপের ছবি তুলছে।
আর ছবির একেবারে পেছনে, গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছে একটি অস্পষ্ট মানুষ।
যাকে এতক্ষণ পর্যন্ত...
কেউই লক্ষ্য করেনি।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।