কেস ২: স্মৃতি চোর
পর্ব ২৪: অন্ধকারের অতিথি
হাসপাতালের পুরো ভবন মুহূর্তের মধ্যে অন্ধকারে ডুবে গেল।
জরুরি বিদ্যুৎও চালু হলো না।
করিডোরে শুধু জানালার ফাঁক দিয়ে আসা বিকেলের ক্ষীণ আলো।
আর সেই নীরবতার মধ্যে...
টক... টক... টক...
কারও জুতোর শব্দ ধীরে ধীরে কাছে আসছে।
মারুফ মুহূর্তের মধ্যে কোমর থেকে পিস্তল বের করলেন।
"সবাই নিচু হয়ে থাকো।"
মিতু বৃদ্ধ মানুষটিকে বিছানার পাশে সরিয়ে নিল।
সৌরভ দরজার পাশে দাঁড়িয়ে মোবাইলের টর্চ জ্বালাতে গেল।
মেহেদী সঙ্গে সঙ্গে তার হাত চেপে ধরল।
"না।"
"কেন?"
"অন্ধকারে যে আলো জ্বালাবে, তাকেই আগে দেখা যাবে।"
সৌরভ নিঃশব্দে মাথা নাড়ল।
---
পায়ের শব্দ থেমে গেল।
মনে হলো, লোকটি ঠিক দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।
কয়েক সেকেন্ড...
তারপর দরজার নিচের ফাঁক দিয়ে একটি ছোট খাম ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো।
এরপর আবার সেই পায়ের শব্দ।
কিন্তু এবার দূরে সরে যাচ্ছে।
মারুফ দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেলেন।
করিডোর ফাঁকা।
দুই প্রান্তেই কেউ নেই।
জানালাগুলো বন্ধ।
সিঁড়িঘরও খালি।
যেন কয়েক সেকেন্ড আগে সেখানে কেউ ছিলই না।
---
ঘরে ফিরে মেহেদী খামটি খুলল।
ভেতরে একটি দাবার গুটি।
একটি কালো নাইট (ঘোড়া)।
সঙ্গে একটি ছোট কাগজ।
তাতে লেখা—
> "তুমি এখনও সৈন্যদের সঙ্গে লড়ছ। রাজাকে খুঁজতে শিখো।"
নিচে কোনো স্বাক্ষর নেই।
শুধু ASTER-এর সেই একই প্রতীক।
---
সৌরভ বিরক্ত হয়ে বলল,
"এরা কি সব সময় ধাঁধায় কথা বলে?"
মেহেদী দাবার গুটিটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
"ধাঁধা না।"
"এটা বার্তা।"
"দাবায় নাইট এমনভাবে চলে, যেটা অন্য কোনো গুটি পারে না।"
"মানে..."
"...আমাদের শত্রু সরাসরি আক্রমণ করছে না।"
"সব সময় ঘুরে আঘাত করছে।"
---
ঠিক তখনই মিতু চিৎকার করে উঠল।
"মেহেদী!"
সবাই বৃদ্ধের দিকে তাকাল।
কয়েক সেকেন্ড আগেও যিনি কথা বলছিলেন, তিনি এখন সম্পূর্ণ নিশ্চুপ।
মিতু দ্রুত নাড়ি পরীক্ষা করল।
তারপর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
"মারা যাননি।"
"তাহলে?"
"আবার গভীর অচেতন অবস্থায় চলে গেছেন।"
---
মেহেদী বৃদ্ধের হাত পরীক্ষা করতে গিয়ে একটি বিষয় লক্ষ করল।
ডান হাতের তর্জনীতে কালো কালি লেগে আছে।
যেন তিনি কোথাও লিখছিলেন।
সে পুরো কক্ষ খুঁজতে শুরু করল।
পাঁচ মিনিট পর জানালার পাশে রাখা একটি পুরোনো টেবিলের নিচে ছোট্ট একটি নোটবুক পাওয়া গেল।
নোটবুকের শেষ পাতায় কাঁপা হাতে লেখা মাত্র তিনটি শব্দ।
> "সে ডাক্তার নয়।"
আর কিছু নেই।
---
মারুফ ভ্রু কুঁচকে বললেন,
"কার কথা বলা হয়েছে?"
মেহেদী উত্তর দিল না।
সে শুধু নোটবুকটা বন্ধ করল।
কারণ তার মাথায় নতুন প্রশ্ন জন্ম নিয়েছে।
যদি ডিরেক্টর ডাক্তার না হন...
তাহলে এত বড় বৈজ্ঞানিক প্রকল্পের নেতৃত্ব কে দিচ্ছিল?
---
সন্ধ্যায় তারা থানায় ফিরে এল।
সৌরভ উদ্ধার করা হার্ডডিস্ক থেকে ডেটা বের করার চেষ্টা করছিল।
হঠাৎ সে চিৎকার করে উঠল।
"পেয়ে গেছি!"
সবাই তার পাশে গেল।
হার্ডডিস্কের একটি লুকানো ফোল্ডার খুলেছে।
নাম—
RECRUITMENT
ভেতরে শত শত ফাইল।
প্রতিটি ফাইলে একজন মানুষের ছবি।
নাম।
বয়স।
শিক্ষাগত যোগ্যতা।
বিশেষ দক্ষতা।
মেহেদী দ্রুত স্ক্রল করতে লাগল।
হঠাৎ তার হাত থেমে গেল।
সে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না।
একটি ফাইলের নাম—
MEHEDI_HASAN.pdf
ঘরে নিস্তব্ধতা নেমে এল।
মারুফ ধীরে বললেন,
"খুলে দেখ।"
মেহেদী ফাইলটি খুলল।
প্রথম পাতায় তার নিজের ছবি।
ছবিটি অন্তত ছয় বছর আগের।
যখন সে নবম শ্রেণিতে পড়ত।
নিচে লেখা—
> পর্যবেক্ষণ শুরু: বয়স ১৪ বছর।
> যুক্তি বিশ্লেষণ ক্ষমতা: অত্যন্ত উচ্চ।
> চাপের মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ: অসাধারণ।
> সম্ভাব্য ব্যবহার: ফেজ-৪।
আর শেষ লাইনে লেখা—
> "বিষয়টি এখনও জানে না যে তাকে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।"
মেহেদীর হাত ধীরে ধীরে কাঁপতে শুরু করল।
সে বুঝতে পারল...
এই লড়াই শুরু হয়েছে আজ থেকে নয়।
কমপক্ষে ছয় বছর আগে থেকেই কেউ তার প্রতিটি পদক্ষেপ লক্ষ্য করছিল।
ঠিক তখনই সৌরভ আরেকটি বিষয় খেয়াল করল।
ফাইলের একেবারে নিচে ছোট্ট একটি লাইন।
> পর্যবেক্ষক: M-17
মেহেদী ধীরে ফিসফিস করে বলল,
"এবার আমাদের খুঁজে বের করতে হবে..."
"...M-17 কে?"
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।