কেস ৪: অঘোরী রুদ্রের ছায়া
পর্ব ৪৩: বিশ্বাসঘাতক
ভ্যানের মনিটর নিভে যাওয়ার পরও কেউ একটাও কথা বলল না।
সবাই একে অপরের মুখের দিকে তাকাচ্ছে।
একটা প্রশ্ন সবার মাথায় ঘুরছে।
দলের ভেতরে কি সত্যিই একজন বিশ্বাসঘাতক আছে?
---
সৌরভ নীরবতা ভেঙে বলল,
"এটা আমাদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি করার জন্যও হতে পারে।"
মেহেদী মাথা নাড়ল।
"হ্যাঁ।"
"একটা শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হলো তাদের নিজেদের একে অপরকে সন্দেহ করতে বাধ্য করা।"
---
মারুফ বললেন,
"তাহলে?"
"আমরা কাউকে সন্দেহ করব না।"
"কিন্তু..."
"সবাইকে যাচাই করব।"
---
থানায় ফিরে মেহেদী একটি অদ্ভুত পরিকল্পনা করল।
সে দলের চারজন সদস্যকে আলাদা আলাদা তথ্য দিল।
মারুফকে বলল,
"আগামীকাল আমরা পুরোনো হাসপাতাল যাচ্ছি।"
মিতুকে বলল,
"আগামীকাল আমরা নদীর ঘাটে অভিযান চালাব।"
সৌরভকে বলল,
"আমাদের লক্ষ্য পুরোনো রেলস্টেশন।"
শাহীনুরকে বলল,
"আমরা কলেজের ভূগর্ভস্থ কক্ষ খুঁজব।"
আসলে...
চারটিই ছিল মিথ্যা।
---
মিতু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
"তুমি সবাইকে আলাদা কথা বললে কেন?"
মেহেদী উত্তর দিল,
"যদি তথ্য বাইরে যায়..."
"...তাহলে কোন তথ্য গেছে, সেটাই বলে দেবে ফাঁসটা কোথা থেকে হয়েছে।"
---
পরদিন সকাল।
সাড়ে নয়টা।
মেহেদীর ফোনে একটি এনক্রিপ্টেড বার্তা এল।
«"রেলস্টেশনে এসো না। সেখানে তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছি না।"»
মেহেদী বার্তাটা পড়ে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তারপর ফোনটা মারুফের হাতে দিল।
মারুফ ধীরে বললেন,
"রেলস্টেশনের কথা তো শুধু..."
তিনি বাকিটা বললেন না।
সবাই বুঝে গেছে।
সেই তথ্যটি শুধু সৌরভ জানত।
---
ঘরে অস্বস্তিকর নীরবতা।
সৌরভ হতভম্ব।
"তোমরা কি ভাবছ আমি খবর দিয়েছি?"
মেহেদী শান্ত গলায় বলল,
"আমি এখনো কিছু ভাবছি না।"
"আমি শুধু তথ্য দেখছি।"
---
সৌরভ উত্তেজিত হয়ে উঠল।
"আমি কাউকে কিছু বলিনি!"
"আমি শপথ করে বলছি।"
মারুফ তার কাঁধে হাত রাখলেন।
"শান্ত হও।"
---
ঠিক তখনই মিতু ল্যাপটপ নিয়ে দৌড়ে এল।
"একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পেয়েছি!"
"কী?"
"বার্তাটা বাইরে থেকে আসেনি।"
সবাই অবাক।
"মানে?"
---
"বার্তাটি এমন একটি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেছে, যার সিগন্যাল থানার ভেতর থেকেই শুরু হয়েছে।"
---
মারুফ বিস্মিত।
"থানার ভেতর?"
---
মিতু মাথা নাড়ল।
"হ্যাঁ।"
"কিন্তু সুনির্দিষ্ট কক্ষ এখনো বের করতে পারিনি।"
---
মেহেদী ধীরে হেঁটে জানালার কাছে গেল।
বাইরে পুলিশ সদস্যরা স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে।
তারপর সে হঠাৎ বলল,
"সৌরভ..."
"তুই গতকাল রাতে কোথায় ছিলি?"
সৌরভ উত্তর দিল,
"বাড়িতে।"
"কেউ প্রমাণ দিতে পারবে?"
"আমার মা।"
---
মেহেদী মাথা নাড়ল।
"ঠিক আছে।"
তারপর সে মারুফের দিকে তাকাল।
"আপনি?"
মারুফ একটু হেসে বললেন,
"এখন আমাকেও জিজ্ঞেস করছ?"
"সবাইকেই।"
---
এক এক করে সবাই নিজেদের অবস্থান জানাল।
কেউ অসঙ্গত কিছু বলল না।
---
হঠাৎ মেহেদীর চোখ পড়ল কনফারেন্স রুমের দেয়ালে ঝোলানো ডিজিটাল ঘড়ির দিকে।
সে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল।
তারপর চেয়ারের ওপর উঠে ঘড়িটা খুলে ফেলল।
সবাই অবাক।
ঘড়ির ভেতরে...
একটি ক্ষুদ্র ইলেকট্রনিক ডিভাইস।
মিতু দ্রুত পরীক্ষা করে বলল,
"এটা একটি লুকানো ট্রান্সমিটার।"
---
মারুফ বিস্ময়ে বললেন,
"মানে..."
---
"মানে কেউ থানার ভেতরের কথাবার্তা শুনছিল।"
---
সৌরভ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
"তাহলে..."
"আমি বিশ্বাসঘাতক নই?"
মেহেদী মৃদু হেসে বলল,
"এখন পর্যন্ত প্রমাণ তা-ই বলছে।"
---
ঠিক তখনই ডিভাইসটির ছোট লাইটটি একবার জ্বলে উঠল।
মিতু বলল,
"এক মিনিট..."
"এটা এখনো সক্রিয়!"
মেহেদী টেবিলের ওপর ডিভাইসটা রাখল।
তারপর খুব স্পষ্ট গলায় বলল,
"শুনে রাখো।"
"আজ রাত বারোটায় আমরা শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছি।"
মারুফ অবাক হয়ে তার দিকে তাকালেন।
কিন্তু কিছু বললেন না।
ডিভাইসটি তখনও নীরবে সব রেকর্ড করছে।
মেহেদী নিচু গলায় ফিসফিস করে বলল,
"এবার..."
"আমরাই ওদের জন্য ফাঁদ পাতব।"
ঠিক সেই সময়...
শহরের অন্য প্রান্তে একটি অন্ধকার কক্ষে বসে একজন মুখোশধারী মানুষ হেডফোন খুলে মৃদু হাসল।
তার সামনে একটি মানচিত্র।
সে লাল কলম দিয়ে একটি নতুন বৃত্ত আঁকল।
বৃত্তটির মাঝখানে লিখল...
"০০:০০"
তারপর আস্তে বলল,
"খুব ভালো, মেহেদী।"
"দেখি..."
"এবার কে কাকে ফাঁদে ফেলে।"
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।