কেস ৩: অভিশপ্ত বৃত্ত
পর্ব ২০: মাহির রহমানের প্রত্যাবর্তন
ঘরের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।
মারুফের চোখ স্থির হয়ে আছে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির ওপর।
বিশ বছর ধরে যে মানুষটিকে মৃত কিংবা হারিয়ে যাওয়া বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল...
সে আজ তাদের সামনে দাঁড়িয়ে।
জীবিত।
---
মারুফ ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন।
"মাহির..."
শব্দটা বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
লোকটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর খুব শান্তভাবে বলল,
"হ্যাঁ, মারুফ।"
"আমি মাহির।"
---
মুহূর্তের মধ্যে মারুফের চোখে রাগ, কষ্ট আর বিস্ময় একসঙ্গে ফুটে উঠল।
তিনি মাহিরের কলার ধরে ফেললেন।
"তুই বেঁচে ছিলি?"
"বিশ বছর!"
"একবারও খবর দিলি না?"
মাহির কোনো প্রতিরোধ করল না।
শুধু নিচু স্বরে বলল,
"কারণ আমি জানতাম..."
"...আমি ফিরে এলে অনেক মানুষ মারা যাবে।"
---
মারুফ তাকে ছেড়ে দিলেন।
"মিথ্যা কথা।"
"তুই আমাদের ছেড়ে গিয়েছিলি।"
মাহিরের চোখে এক মুহূর্তের জন্য অপরাধবোধ দেখা গেল।
"না।"
"আমি পালাইনি।"
"আমি লুকিয়ে ছিলাম।"
---
মেহেদী এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল।
সে এবার এগিয়ে এল।
"আপনি যদি সত্যিই মাহির রহমান হন..."
"...তাহলে একটা প্রশ্নের উত্তর দিন।"
মাহির তার দিকে তাকাল।
"বল।"
"Subject M-7 কে?"
---
ঘরে আবার নীরবতা।
মাহিরের মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল।
সে ধীরে ধীরে মেহেদীর দিকে তাকাল।
যেন বহু বছর পর কোনো পুরোনো পরিচিত মুখ দেখছে।
তারপর বলল,
"তুমি।"
---
সৌরভ এক পা পিছিয়ে গেল।
মিতু চুপ হয়ে গেল।
মারুফ অবিশ্বাসের চোখে তাকালেন।
"অসম্ভব।"
মাহির ধীরে মাথা নাড়ল।
"না, মারুফ।"
"এটাই সত্য।"
---
মেহেদী শান্ত থাকার চেষ্টা করল।
"প্রমাণ?"
মাহির হালকা হাসল।
"তোমার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্যটাই তোমার প্রমাণ।"
"কোনটা?"
"তুমি কোনো কিছু সহজে বিশ্বাস করো না।"
"সবকিছু বিশ্লেষণ করো।"
"প্যাটার্ন খোঁজো।"
"এটা সাধারণ প্রতিভা না।"
---
মেহেদী বলল,
"এগুলো জেনেটিকও হতে পারে।"
মাহির মাথা নাড়ল।
"হতে পারে।"
"তাই শুধু এটুকু যথেষ্ট নয়।"
---
সে পকেট থেকে একটি ছোট ডিভাইস বের করল।
পুরোনো ধরনের মেমোরি রিডার।
তার ভেতর একটি চিপ।
"এটা তোমার।"
মেহেদী নিল না।
"কী আছে এতে?"
মাহির বলল,
"তোমার আসল স্মৃতি।"
---
ঘরে নীরবতা।
মেহেদী চিপটির দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,
"যদি এটা সত্য হয়..."
"...তাহলে আমার এতদিনের জীবন?"
মাহির ধীরে উত্তর দিল,
"সব মিথ্যা নয়।"
"এটাই ECHO-এর সবচেয়ে ভয়ংকর দিক।"
"তারা পুরো স্মৃতি মুছে দেয়নি।"
"তারা কিছু সত্যের সঙ্গে কিছু তৈরি করা স্মৃতি মিশিয়ে দিয়েছে।"
---
মিতু অবাক হয়ে বলল,
"এটা কীভাবে সম্ভব?"
মাহির তার দিকে তাকাল।
"মানুষের মস্তিষ্ক কম্পিউটার না।"
"এখানে ফাইল ডিলিট করে নতুন ফাইল বসানো যায় না।"
"বরং..."
"পুরোনো স্মৃতির সঙ্গে নতুন অভিজ্ঞতা জুড়ে দেওয়া হয়।"
"মানুষ তখন বুঝতেই পারে না কোনটা আসল আর কোনটা তৈরি।"
---
মেহেদী ধীরে বলল,
"আর আপনি?"
"আপনি এই পরীক্ষার অংশ ছিলেন?"
মাহিরের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।
"আমি ছিলাম গবেষক।"
"ড. আরিফ ছিল প্রধান বিজ্ঞানী।"
"আমরা মানুষের স্মৃতি নিয়ে গবেষণা করছিলাম।"
"উদ্দেশ্য ছিল..."
সে থামল।
"যুদ্ধ থেকে ফিরে আসা মানুষদের ট্রমা কমানো।"
"ভয়ংকর স্মৃতি নিয়ন্ত্রণ করা।"
---
সৌরভ বলল,
"কিন্তু পরে এটা অপব্যবহার করা হলো?"
মাহির মাথা নাড়লেন।
"হ্যাঁ।"
"NEXUS তৈরি হয়েছিল সেই অপব্যবহারের জন্য।"
---
মেহেদী বলল,
"আর ড. আরিফ?"
মাহিরের চোখে অদ্ভুত ছায়া নেমে এল।
"ড. আরিফ..."
"...একই সঙ্গে নায়ক এবং অপরাধী।"
"তিনি প্রকল্প শুরু করেছিলেন মানুষকে সাহায্য করার জন্য।"
"কিন্তু পরে বুঝতে পারেন..."
"...যে সৃষ্টি করা জ্ঞান ধ্বংসও করতে পারে।"
---
ঠিক তখনই মেহেদীর হাতে থাকা চিপটি হঠাৎ জ্বলে উঠল।
ছোট স্ক্রিনে একটি ভিডিও চালু হলো।
একটি আট বছরের ছেলে।
সাদা ল্যাব কোট পরা একজন মানুষের সামনে বসে আছে।
লোকটি বলছে,
"মেহেদী, ভয় পেয়ো না।"
"তোমার মস্তিষ্ক খুব বিশেষ।"
ছেলেটি জিজ্ঞেস করল,
"আমি কি আবার বাসায় যেতে পারব?"
লোকটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
"হ্যাঁ।"
"কিন্তু তার আগে..."
"...তোমাকে কিছু জিনিস ভুলে যেতে হবে।"
---
ভিডিওতে শিশুটির মুখ পরিষ্কার হলো।
মেহেদী নিজের মুখের সঙ্গে মিল খুঁজে পেল।
তারপর স্ক্রিনে শেষ লাইন ভেসে উঠল।
> Memory Reconstruction Started: 18:40
ভিডিও বন্ধ।
---
মেহেদী চোখ বন্ধ করল।
তার মাথার ভেতর হঠাৎ কিছু অস্পষ্ট ছবি ভেসে উঠতে লাগল।
একটি ল্যাব।
একটি আয়না।
ড. আরিফ।
মাহির।
আর...
একটি ছোট ছেলে কাঁদছে।
---
হঠাৎ মেহেদী চোখ খুলে বলল,
"একটা জিনিস..."
"কী?"
"আপনি বললেন, আমাকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল।"
"হ্যাঁ।"
"তাহলে..."
"...আমার স্মৃতি ফিরে আসছে কেন?"
মাহির কিছু বলার আগেই বাইরে প্রচণ্ড শব্দ হলো।
একটি বিস্ফোরণ নয়...
বরং পুরো ভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সক্রিয় হওয়ার শব্দ।
লাল আলো জ্বলে উঠল।
একটি যান্ত্রিক কণ্ঠ ঘোষণা করল—
> "ECHO PROTOCOL RESTARTED."
মাহিরের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
সে ফিসফিস করে বলল,
"না..."
"এটা সম্ভব না।"
মেহেদী তাকাল।
"কী হয়েছে?"
মাহির ধীরে বলল,
"কারণ ECHO আবার চালু হলে..."
"...শুধু তোমার স্মৃতি ফিরবে না।"
"...পুরো শহরের মানুষের স্মৃতি বদলে যেতে পারে।"
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।