কেস ২: স্মৃতি চোর
পর্ব ২৩: ডায়েরির প্রথম পৃষ্ঠা
ভূগর্ভস্থ কক্ষের বাতাস ভারী হয়ে আছে।
মেহেদীর হাতে ধরা পুরোনো চামড়ার ডায়েরিটা যেন শুধু কাগজের নয়, বহু বছরের গোপন সত্যের ভার বহন করছে।
প্রথম পাতায় স্পষ্ট লেখা,
"যদি আমি মারা যাই, তাহলে সত্যটা এই ডায়েরির ভেতর আছে।"
নিচে স্বাক্ষর।
ড. রাশেদ কবির।
মারুফ ধীরে বললেন,
"এটা এখানেই পড়বি?"
মেহেদী মাথা নাড়ল।
"না। আগে নিশ্চিত হতে হবে এটা আসল ডায়েরি কি না।"
---
থানার ফরেনসিক ল্যাবে ফিরে ডায়েরির কাগজ, কালি আর বাঁধাই পরীক্ষা করা হলো।
রিপোর্ট আসতে সন্ধ্যা হয়ে গেল।
মিতু ফাইলটা টেবিলে রেখে বলল,
"কাগজ অন্তত পঁচিশ থেকে তিরিশ বছরের পুরোনো।"
"কালিও সেই সময়ের।"
"নকল হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।"
মেহেদী দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
"তাহলে পড়া শুরু করা যাক।"
---
সে প্রথম পৃষ্ঠা খুলল।
ডায়েরির লেখা ছিল সুন্দর, পরিপাটি।
> ১৫ মার্চ, ১৯৯৮
> "আজ আমি জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল করেছি। আমি ভেবেছিলাম আমরা স্মৃতিভ্রংশ রোগীদের সাহায্য করার প্রযুক্তি তৈরি করছি। কিন্তু আজ বুঝলাম, আমাদের গবেষণাকে অন্য উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে।"
ঘরে কেউ কথা বলল না।
মেহেদী পড়তে লাগল।
> "ড. আরিফ আমাকে বলেছিলেন, মানুষের স্মৃতি কখনোই জোর করে পরিবর্তন করা উচিত নয়। আমি তখন তাঁর সঙ্গে একমত হইনি। আজ বুঝতে পারছি, তিনিই ঠিক ছিলেন।"
মারুফ ধীরে বললেন,
"তাহলে শুরুতে রাশেদই ভুল পথে ছিল।"
"হ্যাঁ।"
মেহেদী উত্তর দিল।
"কিন্তু মনে হচ্ছে পরে সে মত বদলায়।"
---
পরের পাতায় লেখা,
> "আজ প্রথমবার আটজন শিশুর ওপর পরীক্ষা চালানো হলো। আমাকে বলা হয়েছিল, এটা সম্পূর্ণ নিরাপদ। কিন্তু পরীক্ষা শেষে তিনজন তাদের বাবা-মায়ের নাম মনে করতে পারেনি। একজন নিজের নামও ভুলে গেছে।"
মিতু চোখ বন্ধ করে ফেলল।
"এটা চিকিৎসা নয়।"
"এটা অপরাধ।"
---
আরও কয়েক পৃষ্ঠা এগিয়ে মেহেদী হঠাৎ থেমে গেল।
একটি লাইন তার চোখ আটকে দিল।
> "প্রকল্পের প্রকৃত পরিচালককে আমরা কখনো নাম ধরে ডাকতাম না। সবাই শুধু একটি নাম ব্যবহার করত..."
পরের লাইন।
> "ডিরেক্টর।"
সৌরভ বিরক্ত হয়ে বলল,
"আবার নতুন রহস্য!"
মেহেদী শান্তভাবে বলল,
"বরং এটা গুরুত্বপূর্ণ।"
"যদি সবাই শুধু 'ডিরেক্টর' বলত, তাহলে হয়তো খুব কম মানুষই তার আসল পরিচয় জানত।"
---
ঠিক তখনই শাহীনুর বলল,
"পরের পাতাটা দেখ।"
পাতার মাঝখানে একটি ছবি আটকানো।
ছবিতে পাঁচজন মানুষ দাঁড়িয়ে।
ড. আরিফকে চেনা যাচ্ছে।
ড. রাশেদও আছেন।
বাকি তিনজনের মুখ কালো কালি দিয়ে ঘষে নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু একজনের হাত দেখা যাচ্ছে।
সেই হাতে...
ASTER-এর আংটি।
---
মেহেদী ছবিটা অনেকক্ষণ ধরে দেখল।
তারপর বলল,
"অদ্ভুত।"
মারুফ জিজ্ঞেস করলেন,
"কী?"
"যে লোক ছবিটা নষ্ট করেছে, সে মুখগুলো মুছে দিয়েছে।"
"কিন্তু আংটিটা রেখে দিয়েছে।"
"ইচ্ছা করেই।"
---
ডায়েরির শেষের দিকের একটি পাতায় বড় অক্ষরে লেখা ছিল,
> "যদি কেউ এই ডায়েরি খুঁজে পায়, তাহলে হাসপাতালের পুরোনো শিশু বিভাগে যাবে।"
নিচে একটি ঠিকানা।
ঢাকার একটি সরকারি হাসপাতাল।
আরও নিচে মাত্র একটি বাক্য।
> "সেখানে এমন একজন আছে, যে সবকিছু জানে। কিন্তু সে নিজের নামটাই ভুলে গেছে।"
---
পরদিন সকাল।
মেহেদীরা হাসপাতালে পৌঁছাল।
শিশু বিভাগ বহু বছর আগেই বন্ধ হয়ে গেছে।
দেয়ালের রং উঠে গেছে।
জানালায় ধুলো জমেছে।
কিন্তু এক কোণের ছোট কক্ষে এখনও একজন বৃদ্ধ বসে আছেন।
সাদা চুল।
পাতলা শরীর।
চোখে শূন্য দৃষ্টি।
একজন নার্স বললেন,
"উনি প্রায় পঁচিশ বছর ধরে এখানে আছেন।"
মারুফ অবাক হয়ে বললেন,
"কোনো আত্মীয় নেই?"
"না।"
"নাম?"
নার্স দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
"উনি নিজের নাম বলতে পারেন না।"
---
মেহেদী ধীরে ধীরে বৃদ্ধের সামনে গিয়ে বসল।
"আপনি কি আমাকে শুনতে পাচ্ছেন?"
বৃদ্ধ তার দিকে তাকালেন।
কোনো উত্তর নেই।
মেহেদী পকেট থেকে ASTER-এর প্রতীক খোদাই করা ধাতব মুদ্রাটি বের করে টেবিলে রাখল।
অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটল।
বৃদ্ধের নিস্তেজ চোখ হঠাৎ বড় হয়ে গেল।
তার হাত কাঁপতে শুরু করল।
তিনি ফিসফিস করে মাত্র একটি শব্দ বললেন।
"...ASTER..."
তারপর আরও আস্তে বললেন,
"...পালাও..."
মেহেদী কিছু বলার আগেই বৃদ্ধ হঠাৎ তার কব্জি শক্ত করে চেপে ধরলেন।
তার কণ্ঠ কাঁপছে।
কিন্তু এবার কথাগুলো একদম স্পষ্ট।
> "ডিরেক্টর এখনও বেঁচে আছে..."
ঠিক সেই মুহূর্তে হাসপাতালের পুরো ভবনের বিদ্যুৎ হঠাৎ নিভে গেল।
করিডোর অন্ধকারে ডুবে গেল।
আর অন্ধকারের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে ভেসে এল...
কারও হাঁটার শব্দ।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।