পর্ব ১৮: শেষ দরজা
লাল জরুরি বাতির আলোয় পুরো গবেষণাগারটাকে যেন রক্তে রাঙানো মনে হচ্ছিল।
স্পিকারে নির্লিপ্ত যান্ত্রিক কণ্ঠ বারবার ঘোষণা করছে,
> "Self-Destruct Sequence Active."
> "Time Remaining: 08 Minutes 47 Seconds."
মারুফ মেহেদীর কাঁধ শক্ত করে ধরে বললেন,
"তুই কোথাও যাচ্ছিস না। সবাই একসঙ্গে বের হব।"
মেহেদী শান্ত গলায় বলল,
"আংকেল, এতগুলো মানুষকে উদ্ধার করেছি। যদি এই ল্যাবের আসল তথ্য ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে আমরা আবার শূন্যে ফিরে যাব।"
"কিন্তু তোর জীবন?"
"এই কেসটা শুরুই হয়েছে সত্য খুঁজতে। এখন ফিরে গেলে সত্যটাই হারিয়ে যাবে।"
মারুফ কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
"পাঁচ মিনিট। পাঁচ মিনিটের বেশি নয়।"
"ঠিক আছে।"
---
মেহেদী আর সৌরভ ডান পাশের করিডোরে দৌড়াতে লাগল।
মিতু ও শাহীনুর রায়হানকে নিয়ে বাইরে যাওয়ার পথে রওনা দিল। মারুফ শেষবারের মতো পেছনে তাকিয়ে বললেন,
"কোনো বিপদ দেখলেই বেরিয়ে আসবি।"
মেহেদী শুধু মাথা নাড়ল।
---
করিডোরের শেষে একটি বিশাল স্টিলের দরজা।
দরজার ওপর লেখা,
ARCHIVE ROOM
দরজার পাশে একটি কার্ড রিডার।
সৌরভ বিরক্ত হয়ে বলল,
"আবার লক!"
মেহেদী চারদিকে তাকাল।
দেয়ালের পাশে একটি ভাঙা কনসোল।
স্ক্রিনে লেখা,
Emergency Override
তার নিচে তিনটি সুইচ।
কিন্তু সুইচগুলোর পাশে কোনো নির্দেশনা নেই।
সৌরভ বলল,
"যেটা খুশি চাপি?"
মেহেদী মাথা নাড়ল।
"না।"
সে সুইচগুলোর ওপর জমে থাকা ধুলো লক্ষ্য করল।
প্রথম সুইচে ধুলো নেই।
দ্বিতীয়টায় আংশিক।
তৃতীয়টায় অনেক ধুলো।
সে মৃদু হেসে বলল,
"যেটা সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয়েছে, সেটাই আসল।"
প্রথম সুইচ টিপতেই...
ঠাস!
দরজার লক খুলে গেল।
সৌরভ বিস্ময়ে বলল,
"তুই এটা বুঝলি কীভাবে?"
মেহেদী উত্তর দিল,
"মানুষ নিজের অভ্যাস লুকাতে পারে না।"
---
ঘরে ঢুকেই দুজন থেমে গেল।
এটা কোনো ল্যাব নয়।
বরং বিশাল একটি আর্কাইভ।
চারদিকে সারি সারি হার্ডডিস্ক।
ফাইল ক্যাবিনেট।
ভিডিও টেপ।
হাজার হাজার কাগজ।
দেয়ালের মাঝখানে একটি বড় ডিজিটাল মানচিত্র।
বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় লাল বিন্দু জ্বলছে।
সৌরভ বিস্ময়ে বলল,
"এতগুলো বিন্দু?"
মেহেদী ধীরে বলল,
"এগুলো যদি গবেষণাকেন্দ্র হয়..."
"...তাহলে আমাদের ধারণার চেয়ে এই নেটওয়ার্ক অনেক বড়।"
---
ঠিক তখনই তার চোখ পড়ল কাচের বাক্সে রাখা একটি নীল ফাইলে।
ফাইলের ওপর লেখা,
PROJECT NIRVANA
ORIGINAL PROPOSAL
সে দ্রুত ফাইল খুলল।
প্রথম পাতায় ড. আরিফ সালেহর স্বাক্ষর।
দ্বিতীয় পাতায় প্রকল্পের উদ্দেশ্য।
> "মস্তিষ্কে আঘাতপ্রাপ্ত রোগীদের হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি পুনর্গঠনের জন্য পরীক্ষামূলক নিউরাল ম্যাপিং প্রযুক্তি।"
মিতুর কথাগুলো তার মনে পড়ল।
এটা প্রথমে চিকিৎসার গবেষণা ছিল।
মেহেদী আরও পড়তে লাগল।
তৃতীয় পাতায় লাল কালি দিয়ে লেখা—
> "সামরিক ব্যবহারের সম্ভাবনা বিবেচনা করুন।"
তার নিচে আরেকটি হাতে লেখা মন্তব্য।
> "প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করছি। গবেষণাটি চিকিৎসার জন্য, মানুষের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য নয়।"
স্বাক্ষর...
ড. আরিফ সালেহ।
মেহেদী ফিসফিস করে বলল,
"তাহলে..."
"...তিনি শুরু থেকেই বিরোধিতা করেছিলেন।"
---
হঠাৎ সৌরভ চিৎকার করে উঠল।
"মেহেদী!"
একটি কম্পিউটার নিজে থেকেই চালু হয়েছে।
স্ক্রিনে একটি লাইভ ক্যামেরা।
ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে...
মারুফ, মিতু আর শাহীনুর রায়হানকে নিয়ে বের হচ্ছে।
কিন্তু তাদের পেছনে...
প্রায় ত্রিশ মিটার দূরে...
কালো পোশাক পরা একজন মানুষ ধীরে ধীরে হাঁটছে।
তার হাতে একটি সাইলেন্সার লাগানো পিস্তল।
"আংকেল!"
মেহেদী চিৎকার করলেও কোনো লাভ নেই।
এটা শুধু লাইভ ভিডিও।
সে দ্রুত ঘরের ইন্টারকম চালু করার চেষ্টা করল।
কাজ করছে না।
---
কাউন্টডাউন নেমে এসেছে।
03:42...
সৌরভ বলল,
"আমাদের বের হতে হবে!"
মেহেদী শেষবারের মতো তাকাল আর্কাইভের দিকে।
এত প্রমাণ ফেলে যাওয়া যায় না।
সে দ্রুত মূল হার্ডডিস্ক, নীল ফাইল আর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নথি ব্যাগে ভরে নিল।
ঠিক তখনই কম্পিউটারের স্ক্রিনে একটি নতুন বার্তা ভেসে উঠল।
> "ভালো করেছ, মেহেদী।"
> "তুমি ঠিক সেই সিদ্ধান্তটাই নিয়েছ, যেটা আমি আশা করেছিলাম।"
মেহেদীর চোখ সরু হয়ে গেল।
"তুমি আবার..."
কণ্ঠটি শান্তভাবে বলল,
> "তুমি ভাবছ, এই ল্যাব ধ্বংস করলে আমি হেরে যাব।"
> "না। এটা ছিল শুধু একটি ঘুঁটি।"
তারপর শেষ লাইনটি ভেসে উঠল।
> "আসল খেলা এখন শুরু।"
ঠিক সেই মুহূর্তে বাইরে থেকে একটি গুলির শব্দ ভেসে এল।
ঠাস!
মেহেদী আর সৌরভ একে অপরের দিকে তাকাল।
দুজনই একসঙ্গে দৌড় দিল দরজার দিকে।
তাদের মনে একটাই প্রশ্ন।
গুলিটা কাকে লক্ষ্য করে ছোড়া হয়েছে?
চলবে...
> গল্প-সংক্রান্ত নোট: এখান থেকে প্রথম কেস ধীরে ধীরে শেষের দিকে যাবে এবং পরবর্তী পর্বগুলোতে গুলির ঘটনা, ড. রাশেদ, ড. আরিফ এবং রহস্যময় সংগঠনের সম্পর্ক স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে পরবর্তী বড় কেসের বীজও রোপণ করা হবে। এতে গল্পটি ১০-১২টি আলাদা কিন্তু পরস্পর-সংযুক্ত কেসে স্বাভাবিকভাবে এগোবে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।