পর্ব ১৬: আয়নার ওপারের মানুষ
হলঘরের বাতাস যেন এক মুহূর্তে ভারী হয়ে উঠল।
কাঁচের কক্ষের ভেতরে শুয়ে থাকা যুবকটি ধীরে ধীরে চোখ খুলে তাকিয়ে আছে।
তার মুখ...
চোয়ালের গঠন...
নাক...
কপালের ডান পাশে ছোট্ট তিল...
সবকিছু মেহেদীর মতো।
সৌরভ অবিশ্বাসের গলায় বলল,
"এটা... এটা কীভাবে সম্ভব?"
শাহীনুর দুই পা পিছিয়ে গেল।
"আমি কি ভুল দেখছি?"
মারুফও কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা বলতে পারলেন না।
শুধু মিতু শান্ত থাকার চেষ্টা করছিল।
সে কাঁচের কাছে গিয়ে ভালো করে তাকাল।
তারপর ধীরে বলল,
"না..."
"পুরোপুরি এক না।"
সবাই তার দিকে তাকাল।
"কী বলতে চাইছিস?"
মিতু আঙুল তুলে দেখাল।
"মেহেদীর বাম ভ্রুর ওপরে ছোট একটা কাটা দাগ আছে। ছোটবেলায় সাইকেল থেকে পড়ে গিয়েছিল, তাই না?"
মেহেদী মাথা নাড়ল।
"হ্যাঁ।"
"কিন্তু এই ছেলেটার সেই দাগ নেই।"
ঘরের ভেতর যেন সবাই একসঙ্গে নিঃশ্বাস ফেলল।
অন্তত একটা বিষয় পরিষ্কার।
লোকটি মেহেদী নয়।
কিন্তু তার সঙ্গে আশ্চর্য রকম মিল আছে।
---
মেহেদী কাঁচের গায়ে হাত রাখল।
ভেতরের যুবকটিও ধীরে ধীরে নিজের হাত তুলল।
দুজনের হাত কাঁচের দুই পাশে এসে মিলল।
হঠাৎ...
যুবকটি কাঁপতে কাঁপতে ঠোঁট নাড়ল।
শব্দ বের হলো না।
মেহেদী ঠোঁট পড়ার চেষ্টা করল।
একবার...
দুবার...
তারপর সে ফিসফিস করে বলল,
"সে বলছে..."
"...পালাও..."
ঠিক তখনই কক্ষের ভেতর লাল সতর্কবাতি জ্বলে উঠল।
একটি যান্ত্রিক কণ্ঠ ভেসে এল।
> Containment breach detected.
> Automatic sedation initiated.
কাঁচের কক্ষের ভেতর ছাদের দিক থেকে সাদা গ্যাস বের হতে শুরু করল।
যুবকটি হাত দিয়ে কাঁচে আঘাত করতে লাগল।
মেহেদী চিৎকার করে উঠল,
"দরজা খুঁজো!"
---
সৌরভ কন্ট্রোল প্যানেলের সামনে দৌড়ে গেল।
সেখানে একটি বায়োমেট্রিক লক।
পাসওয়ার্ড।
ফিঙ্গারপ্রিন্ট।
রেটিনা স্ক্যান।
সবকিছু চাইছে।
"এটা খুলতে পারছি না!"
মেহেদী চারদিকে তাকাল।
তার চোখ পড়ল দেয়ালে ঝোলানো একটি জরুরি অগ্নিনির্বাপণ বাক্সে।
সে বাক্সটি ভেঙে একটি ছোট অক্সিজেন সিলিন্ডার বের করল।
"সরে দাঁড়াও!"
ধাতব সিলিন্ডার দিয়ে সে কাঁচে আঘাত করল।
একবার।
দুইবার।
তিনবার।
কাঁচে ফাটল ধরল।
চতুর্থ আঘাতে কাঁচ ভেঙে গেল।
সাদা গ্যাস বাইরে ছড়িয়ে পড়ল।
মিতু সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঢেকে ফেলল।
"সবাই নিচু হও!"
---
যুবকটিকে টেনে বাইরে আনা হলো।
সে অচেতন।
কিন্তু নাড়ি চলছে।
মিতু দ্রুত পরীক্ষা করল।
"শ্বাস স্বাভাবিক। সম্ভবত ঘুমের ওষুধজাতীয় গ্যাস।"
ঠিক তখনই যুবকটি কাঁপতে কাঁপতে চোখ খুলল।
সে প্রথমে মেহেদীর দিকে তাকাল।
তারপর খুব কষ্ট করে বলল,
"তুমি..."
"...অবশেষে এসেছ।"
মেহেদী হাঁটু গেড়ে বসল।
"তুমি কে?"
যুবকটি উত্তর দেওয়ার আগেই কাশতে শুরু করল।
কয়েক সেকেন্ড পর সে ফিসফিস করে বলল,
"আমার নাম..."
"...রায়হান।"
---
"রায়হান?"
মেহেদী নামটা আগে কখনও শোনেনি।
রায়হান কষ্ট করে বলল,
"ওরা..."
"...আমাকে তোমার মতো বানাতে চেয়েছিল।"
ঘরের সবাই থমকে গেল।
মারুফ অবাক হয়ে বললেন,
"কী বলছ?"
রায়হান চোখ বন্ধ করে আবার বলল,
"আমি... অনাথ আশ্রমে বড় হয়েছি..."
"...তারপর একদিন..."
"...একজন ডাক্তার আমাকে নিয়ে যায়..."
তারপর সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলল।
---
ঠিক তখনই সৌরভ চিৎকার করে উঠল।
"মেহেদী!"
কন্ট্রোল রুমের একটি মনিটরে নতুন ভিডিও চালু হয়েছে।
স্ক্রিনে আবার সেই অদৃশ্য কণ্ঠের মানুষ।
তবে এবার মুখ পুরোপুরি অন্ধকারে নয়।
তার চোয়ালের এক পাশ দেখা যাচ্ছে।
সে শান্ত স্বরে বলল,
"অভিনন্দন।"
"তুমি আমার সবচেয়ে পুরোনো পরীক্ষাগুলোর একজনকে বাঁচিয়েছ।"
মেহেদী দাঁত চেপে বলল,
"তুমি কী চাও?"
লোকটি উত্তর দিল,
"সত্য।"
"কারণ তুমি এখনও ভুল প্রশ্ন করছ।"
"তুমি বারবার জিজ্ঞেস করছ, 'খুনি কে?'"
সে মৃদু হেসে বলল,
"আসল প্রশ্ন হওয়া উচিত..."
> "কেন তোমার মতো দেখতে একজন মানুষ তৈরি করার প্রয়োজন হলো?"
স্ক্রিনে সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটি পুরোনো নথি ভেসে উঠল।
Project Nirvana - Phase 1
Project Nirvana - Phase 2
Project Nirvana - Phase 3
তারপর শেষ ফাইলটির নাম দেখে মেহেদীর বুক কেঁপে উঠল।
Project Nirvana - Phase 4
Subject Selected: Mehedi Hasan
স্ক্রিন কালো হয়ে গেল।
মেহেদী ধীরে ধীরে মুঠো শক্ত করল।
এখন সে নিশ্চিত।
সে এই রহস্যে দুর্ঘটনাক্রমে জড়িয়ে পড়েনি।
অনেক বছর আগে থেকেই তাকে এই প্রকল্পের জন্য বেছে রাখা হয়েছিল।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।