কেস ৩: অভিশপ্ত বৃত্ত
পর্ব ৯: মৃত মানুষের ছায়া
রাত সাড়ে দশটা।
মারুফের অফিসের তদন্তকক্ষে চারজন চুপচাপ বসে আছে।
টেবিলের ওপর ছড়িয়ে আছে তিনটি কেসের ছবি, মানচিত্র, ফরেনসিক রিপোর্ট এবং ড. আরিফ সালেহের পুরোনো গবেষণার কাগজপত্র।
ঘরের একমাত্র শব্দ ছিল দেয়ালের ঘড়ির টিকটিক।
হঠাৎ মেহেদী নীরবতা ভাঙল।
"আমি একটা প্রশ্ন করছি।"
"যদি ড. আরিফ সত্যিই NEXUS তৈরি করে থাকেন..."
"...তাহলে তিনি কোথায়?"
কেউ উত্তর দিতে পারল না।
---
মিতু ল্যাপটপে পুরোনো সরকারি নথি খুলে বলল,
"ড. আরিফকে আঠারো বছর আগে নিখোঁজ ঘোষণা করা হয়েছিল।"
সৌরভ অবাক হয়ে বলল,
"লাশও পাওয়া যায়নি?"
"না।"
"মৃত ঘোষণা করা হয়?"
"আইনগতভাবে নয়।"
মেহেদী চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করল।
"তাহলে..."
"...তিনি মারা গেছেন, এই ধারণারও কোনো প্রমাণ নেই।"
---
ঠিক তখনই শাহীনুর একটি ফাইল টেবিলে রাখল।
"এটা দেখ।"
ফাইলটি প্রথম ভিকটিম আবদুল কাদেরের ব্যাংক হিসাবের।
মৃত্যুর মাত্র তিন দিন আগে তার অ্যাকাউন্টে পাঁচ লাখ টাকা জমা হয়েছে।
মারুফ ভ্রু কুঁচকে বললেন,
"একজন সাধারণ কৃষকের হিসাবে এত টাকা?"
মিতু বলল,
"আরও অদ্ভুত ব্যাপার আছে।"
"টাকাটা পাঠিয়েছে একটি গবেষণা ট্রাস্ট।"
"নাম?"
Aster Foundation for Cognitive Research
ঘরে আবার নীরবতা।
---
মেহেদী ধীরে ধীরে ফাইল বন্ধ করল।
"ASTER টাকা দিল।"
"NEXUS হত্যা করল।"
"নাকি..."
"...দুটোই একই খেলার অংশ?"
---
এই সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো।
একজন কনস্টেবল ভেতরে ঢুকে একটি খাম দিল।
"স্যার, বাইরে একজন মোটরসাইকেল আরোহী এটা দিয়ে চলে গেছে।"
"লোকটাকে ধরতে পারেননি?"
"না স্যার। হেলমেট পরে ছিল।"
---
খামের ওপর শুধু লেখা,
"মেহেদীর জন্য। একা পড়বে।"
মারুফ বললেন,
"সাবধানে খোল।"
মেহেদী গ্লাভস পরে খাম খুলল।
ভেতরে একটি পুরোনো সাদা-কালো ছবি।
ছবিতে চারজন মানুষ দাঁড়িয়ে।
তিনজনের মুখ স্পষ্ট।
চতুর্থ ব্যক্তির মুখ কালো কালি দিয়ে ঘষে মুছে ফেলা।
ছবির পেছনে হাতে লেখা একটি বাক্য।
> "যে মানুষটাকে তুমি খুঁজছ, সে কখনো নিজের নাম ব্যবহার করে না।"
---
মেহেদী ছবিটা আলোয় ধরতেই তার চোখ আটকে গেল।
ডান পাশে দাঁড়ানো মানুষটিকে সে চিনতে পারল।
"এটা..."
মারুফ ছবির দিকে তাকালেন।
"চেনিস?"
"হ্যাঁ।"
"উনি ড. আরিফ।"
সবাই অবাক হয়ে তাকাল।
---
মিতু হঠাৎ ছবির নিচের অংশে আঙুল রাখল।
"এক মিনিট..."
সেখানে একটি ছায়া দেখা যাচ্ছে।
চারজন মানুষ দাঁড়িয়ে থাকলেও...
মাটিতে পড়েছে পাঁচজনের ছায়া।
সৌরভ হেসে বলল,
"ক্যামেরার ভুল?"
মেহেদী মাথা নাড়ল।
"না।"
"সূর্যের অবস্থান অনুযায়ী এটা সম্ভব না।"
---
সে ছবিটা বড় করে দেখল।
ধীরে ধীরে রহস্যটা পরিষ্কার হলো।
পঞ্চম ছায়াটি কোনো মানুষের নয়।
ক্যামেরার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা আরেকজনের।
অর্থাৎ...
ছবিটি যিনি তুলেছেন, তিনিও এত কাছে দাঁড়িয়েছিলেন যে তাঁর ছায়াও ফ্রেমে পড়েছে।
---
মেহেদীর চোখ জ্বলে উঠল।
"ছবি কে তুলেছে?"
মারুফ বললেন,
"পেছনে কি স্টুডিওর নাম আছে?"
ছবির উল্টো পাশে ছোট্ট একটি সিল।
রূপালী স্টুডিও, ময়মনসিংহ।
---
ঠিক তখনই মিতুর কম্পিউটার থেকে একটি সতর্কবার্তার শব্দ এল।
"মেহেদী!"
"কী হয়েছে?"
"আমি ছবিটা ফেস রিকগনিশন সফটওয়্যারে চালিয়েছি।"
"ফলাফল?"
মিতুর গলা শুকিয়ে গেল।
"ড. আরিফের পাশে দাঁড়ানো মানুষটার মুখ..."
"...মারুফ স্যারের সঙ্গে ৯১ শতাংশ মিল পাচ্ছে।"
ঘরের বাতাস যেন জমে গেল।
মারুফ হতবাক।
"অসম্ভব!"
মেহেদী সঙ্গে সঙ্গে স্ক্রিনের দিকে এগিয়ে গেল।
সে কয়েক সেকেন্ড মনোযোগ দিয়ে ছবিটা দেখল।
তারপর ধীরে বলল,
"না।"
"সফটওয়্যার ভুল করেনি..."
"...কিন্তু সিদ্ধান্ত ভুল হবে।"
সৌরভ জিজ্ঞেস করল,
"মানে?"
মেহেদী ছবির মানুষটির কপালের দিকে আঙুল দেখাল।
"দেখো..."
"লোকটার ডান ভ্রুর ওপর একটি কাটা দাগ আছে।"
সে মারুফের দিকে তাকাল।
"আপনার নেই।"
মারুফ মাথা নাড়লেন।
"না।"
মেহেদী শান্ত গলায় বলল,
"মুখের গঠন মিললেই একই মানুষ হয় না।"
"এটা হতে পারে..."
"...আপনার কোনো আত্মীয়।"
মারুফ কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে ফিসফিস করে বললেন,
"আমার বড় ভাই..."
"...মাহির।"
"তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞানী ছিলেন।"
"প্রায় কুড়ি বছর আগে নিখোঁজ হন।"
ঘরের সবাই একসঙ্গে তাঁর দিকে তাকাল।
মারুফ এতদিন কখনও তাঁর ভাইয়ের কথা বলেননি।
মেহেদী ধীরে ছবিটা আবার হাতে নিল।
তার মনে হলো...
কেসটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নয়।
এটি এমন একটি অতীতের দরজা খুলছে, যেখানে ASTER, NEXUS, ড. আরিফ... এবং মারুফের নিজের পরিবারও জড়িয়ে আছে।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।