একটি ধারাবাহিক প্রেমের গল্প
নীল সাগরের ওপারে
পর্ব ১ : প্রথম দেখা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | ১৭ জুন ২০২৬
নিশি লম্বা করে শ্বাস টানল।
সামনে শুধু সমুদ্র। ঢেউয়ের একটানা শব্দ কানে বাজছে। গায়ে লাগছে নোনা বাতাস, আর পশ্চিম আকাশে সূর্যটা একটু একটু করে নেমে যাচ্ছে। জায়গাটা অন্যরকম। একেবারেই অন্যরকম।
সমস্যা হলো, সে এখানে কীভাবে এলো, সেটাই মনে করতে পারছে না।
শেষ যেটুকু মনে আছে—পার্টিটা আর নিতে পারছিল না। চুপচাপ বেরিয়ে এসে রাস্তায় দাঁড়ানো প্রথম বাসটায় উঠে পড়েছিল। কোথায় নামবে, কেন যাবে—এসব ভাবার ধৈর্য ছিল না।
বালির ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ নিজের ওপরই মেজাজ খারাপ হলো। ফিসফিস করে বলল,
“নিশি, তুই করছিসটা কী? হাঁটতে হাঁটতে একদম কোথায় চলে এসেছিস দেখ।”
নিজের কথায় নিজেই হেসে ফেলল। কবে থেকে নিজের সঙ্গে এভাবে কথা বলা শুরু করেছে, মনে নেই। তবে ইদানীং নিজের ওপর রাগ করাটা প্রায় রোজকার ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অভিক চুপচাপ দাঁড়িয়ে সমুদ্র দেখছিল।
হঠাৎ চোখ গেল একটু দূরে। একটা মেয়ে। একই জায়গায় বারবার পায়চারি করছে। থামছে। আবার কী যেন বলছে নিজের সঙ্গে।
দেখে অভিকের ঠোঁটের কোণে হাসি চলে এলো। অদ্ভুত। কিন্তু এই অদ্ভুত ভাবটাই মেয়েটাকে ভিড়ের থেকে আলাদা করেছে বলে মনে হলো।
কথা বলতে ইচ্ছে করল। এক পা এগিয়েও গিয়েছিল।
ঠিক তখনই পাশে এসে দাঁড়াল একজন।
“বেব, তুমি এখানে? আমি ভেবেছি সিগারেট খেতে বের হয়েছ।”
অভিকের মুখটা সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেল। এই যে একটু আগের নীরবতাটা, সেটা কেউ যেন টেনে ছিঁড়ে দিল।
“ভেতরে যাচ্ছিলামই। তুমি ভেতরে থাকলেই পারতে।”
গলায় বিরক্তি লুকানোর চেষ্টা করল না।
চলে যাওয়ার আগে আরেকবার তাকাল মেয়েটার দিকে। নামটা জানা হয়নি। মনে মনে ভাবল, আবার যদি দেখা হয়, নামটা অন্তত জিজ্ঞেস করব।
সূর্যটা প্রায় ডুবে গেছে।
শেষ আলোটা সমুদ্রের পানিতে কমলা রঙ ছড়াচ্ছে। নিশি তাকিয়ে থাকল। কেন জানি চোখ ভিজে এলো। এত মন দিয়ে সূর্যাস্ত সে আগে কখনো দেখেনি।
আস্তে করে বলল,
“কী সুন্দর... ইশ, আমি যদি সূর্যের মতো হতাম। নিজের ইচ্ছেয় আসতাম, নিজের ইচ্ছেয় চলে যেতাম।”
কথাটা বলেও কান্না থামল না। সে নিজেও নিশ্চিত না, কিসের জন্য কাঁদছে। এই রঙের জন্য? নাকি আজ সন্ধ্যার সেই ঘটনার জন্য?
বাবা এমন একটা সিদ্ধান্ত নেবেন, ভাবতেও পারেনি।
পার্টির দৃশ্যটা চোখের সামনে ভেসে উঠল। সে বাবার সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করেছিল,
“বাবা, এটা কী? এজন্যই আমাকে এত সাজতে বলেছিলে?”
বাবার চোখে কোনো দ্বিধা ছিল না। গলাটা একদম ঠান্ডা।
“তোমার ভালোর জন্যই করছি।”
আর কিছু শোনেনি নিশি। বেরিয়ে এসেছিল। মাথার ভেতর শুধু রাগ আর অপমান। তার জীবনের এত বড় সিদ্ধান্ত হয়ে গেল, অথচ তাকে একবারও জিজ্ঞেস করার দরকার মনে করেনি কেউ। একজন অচেনা লোকের সঙ্গে তার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। এটা সে মানতে পারছিল না।
“মা, তুমি থাকলে হয়তো আজ এমন হতো না।”
চোখ মুছতে মুছতে দৌড়েছিল। পায়ে পার্টির হিল। খুলে ফেলার কথা মাথায় আসেনি। রাস্তায় একটা বাস দাঁড়িয়ে ছিল। কিছু না ভেবেই উঠে পড়েছিল। সেই বাসই তাকে নামিয়ে দিয়েছে এই অচেনা বিচে।
জায়গাটা চেনে না। তবু বুকের ভেতরের চাপটা এখানে এসে একটু হালকা লাগছিল।
রাত হয়ে গেছে। নিশি তখনও বসে আছে।
আশপাশে লোকজন। কেউ পানিতে পা ভেজাচ্ছে। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করছে। কেউ আবার জোড়ায় জোড়ায়। একটু দূরে একটা কাপল নিজেদের নিয়ে এত ব্যস্ত যে চারপাশে কী হচ্ছে খেয়াল নেই।
দেখে নিশির মেজাজ আরও খারাপ হলো। মনে মনে বলল, “এসবের জন্য কি আর জায়গা পায় না মানুষ?”
ছেলেটার চোখ তখনই পড়ল তার দিকে। একটা বাঁকা হাসি দিল, যেন ইচ্ছে করেই খোঁচাচ্ছে।
নিশির আর সহ্য হলো না। পায়ের কাছে ছোট একটা নুড়ি ছিল। তুলে ছুড়ে মারল।
“প্রাপ্য ছিল!”
বলেই হাঁটা দিল।
দু’পা যেতেই থেমে যেতে হলো। কেউ হাত চেপে ধরেছে। শক্ত করে।
“মিস, আমার ঠোঁটের স্বাদ নিতে চান নাকি?”
ঘুরে তাকাল নিশি। সেই ছেলেটা। যাকে পাথর মেরেছিল।
রাগটা আর সামলাতে পারল না। সোজা ঘুষি চালিয়ে দিল ছেলেটার চোয়ালে। নিজের হাতের গাঁটে ব্যথা লাগল, কিন্তু পাত্তা দিল না।
ছেলেটার চোখে আগুন। নিশি উল্টো হেসে দিল। সারাদিনের জমে থাকা রাগটা যেন একটু বের হলো।
“এটা তোমার পাওনা। সারাদিন মেজাজ খারাপ আমার। তার ওপর তুমি এসব সাহস দেখাও। আমার হাত ধরেছ, এটাই তোমার কপাল। নইলে আরও খারাপ হতো।”
ছেলেটা হাত তুলতে যাবে, ঠিক তখনই আরেকজন তার বাহু খপ করে ধরে ফেলল।
ছেলেটা ঘুরে তাকাল। আর মুহূর্তেই তার মুখের রং পাল্টে গেল। যে ধরেছে, তাকে দেখে ভয়টা স্পষ্ট।
লোকটা শান্ত গলায় বলল, “তুমি এখনো বদলাওনি, ইগনিও?”
এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না ছেলেটা। দৌড়ে পালাল।
নিশি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর ফিক করে হেসে বলল, “কাপুরুষ!”
কিন্তু তার মন বলছে, সামনে দাঁড়ানো মানুষটা সাধারণ কেউ না। কে সে, জানে না। কিন্তু লোকটার উপস্থিতিতে একটা অদ্ভুত নিরাপত্তা কাজ করছে।
এই অচেনা সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে নিশি টের পেল, তার জীবনের গল্পটা হয়তো নতুন করে শুরু হচ্ছে।
চলবে...
#নীল_সাগরের_ওপারে
#অভিক_ও_নিশি
#ধারাবাহিক_গল্প
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।