পর্ব ১২: যে মৃত মানুষটি এখনও বেঁচে আছে
ছবিটার দিকে তাকিয়ে মেহেদীর হাত কেঁপে উঠল।
হুইলচেয়ারে বসা বৃদ্ধের মুখ শুকিয়ে গেছে, গালের হাড় বেরিয়ে এসেছে, মাথার বেশির ভাগ চুল সাদা। কিন্তু চোখ দুটো...
সেই চোখ।
ভিডিওতে দেখা ড. আরিফ সালেহর চোখের সঙ্গে হুবহু মিল।
মারুফ ধীরে বললেন,
"তুই নিশ্চিত?"
মেহেদী ছবিটা জুম করল।
"নিশ্চিত হওয়ার আগে একটা জিনিস যাচাই করতে হবে।"
সে ভিডিও থেকে ড. আরিফের মুখের একটি ফ্রেম বের করল। তারপর ছবির বৃদ্ধের মুখের ওপর সেটি বসিয়ে তুলনা করতে লাগল।
সৌরভ বিস্ময়ে বলল,
"এটা তো প্রায় একই মানুষ!"
মেহেদী মাথা নাড়ল।
"প্রায় না..."
"...একই মানুষ।"
ঘরে আবার নীরবতা নেমে এল।
সরকারি নথি বলছে, মানুষটি আট বছর আগে মারা গেছে।
কিন্তু তিনি জীবিত।
---
মারুফ সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালের তথ্য খুঁজতে শুরু করলেন।
ছবিটি তোলা হয়েছিল তিন দিন আগে।
ঢাকার একটি বেসরকারি নিউরোলজি হাসপাতালে।
কিন্তু হাসপাতালের রোগীর তালিকায় 'ড. আরিফ সালেহ' নামে কেউ ভর্তি নেই।
বরং হুইলচেয়ারে থাকা রোগীর নাম লেখা হয়েছে...
"মো. আজিজুর রহমান"
বয়স: ৭৪।
পেশা: অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক।
মিতু ধীরে বলল,
"ভুয়া পরিচয়।"
---
পরদিন ভোরে মেহেদী, মারুফ, সৌরভ, শাহীনুর আর মিতু সাধারণ পোশাকে হাসপাতালে গেল।
রিসেপশনে মারুফ পরিচয় গোপন রেখে বললেন,
"আজিজুর রহমান সাহেবকে দেখতে এসেছি।"
রিসেপশনিস্ট কম্পিউটারে দেখে বলল,
"স্যার, উনাকে গতকাল রাতেই ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।"
"কে নিয়ে গেছে?"
"একজন ডাক্তার।"
"নাম?"
মেয়েটি স্ক্রিনে তাকিয়ে বলল,
"ড. রাশেদ কবির।"
মারুফের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
---
হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ জোগাড় করতে বেশি সময় লাগল না।
ভিডিও চালু হতেই দেখা গেল...
রাত ১টা ১৭ মিনিট।
ড. রাশেদ একটি হুইলচেয়ার ঠেলে করিডোর দিয়ে যাচ্ছেন।
চেয়ারে বসে আছেন সেই বৃদ্ধ।
কিন্তু ভিডিওর এক জায়গায় মেহেদী হঠাৎ বলল,
"থামাও!"
সৌরভ ভিডিও থামাল।
"আরও জুম কর।"
হুইলচেয়ারের ডান চাকার পাশে একটা ছোট কালো বাক্স লাগানো।
প্রথম দেখায় সাধারণ যন্ত্রাংশ মনে হয়।
মেহেদী বলল,
"এটা যন্ত্রাংশ না।"
"তাহলে?"
"GPS ট্রান্সমিটার।"
---
হঠাৎ মিতু আরেকটা বিষয় খেয়াল করল।
"এক মিনিট..."
সে বৃদ্ধের ডান হাতের দিকে আঙুল দেখাল।
হাতটা অস্বাভাবিকভাবে শক্ত।
আঙুলগুলো একটুও নড়ছে না।
মিতু বলল,
"এটা স্বাভাবিক পক্ষাঘাতের মতো না।"
মেহেদী জিজ্ঞেস করল,
"কেন?"
"কারণ মুখের পেশি সচল। কিন্তু হাতের পেশি পুরো শক্ত।"
সে কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
"সম্ভবত ওনাকে দীর্ঘদিন ধরে কোনো নিউরোমাসকুলার ব্লকার দেওয়া হচ্ছে।"
মারুফ ধীরে বললেন,
"অর্থাৎ..."
"...তিনি হয়তো ইচ্ছা করলেও নড়তে পারছেন না।"
---
হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার সময় একজন বয়স্ক পরিচ্ছন্নতাকর্মী আস্তে করে মেহেদীর হাতে একটি কাগজ গুঁজে দিল।
"ওই ডাক্তার সাহেব রেখে গেছেন।"
"কোন ডাক্তার?"
লোকটি শুধু বলল,
"যিনি কাল রাতে এসেছিলেন।"
এরপর দ্রুত চলে গেল।
কাগজে একটি ঠিকানা।
ঢাকার বাইরে একটি পুরোনো ওষুধ কারখানা।
নিচে মাত্র একটি বাক্য।
> "যদি সত্য জানতে চাও, আজ রাতের আগে এসো।"
---
সন্ধ্যা নামতেই পুরো টিম কারখানার দিকে রওনা দিল।
কারখানাটি অন্তত পনেরো বছর ধরে বন্ধ।
ভাঙা চিমনি।
মরিচা ধরা গেট।
চারদিকে আগাছা।
কিন্তু ভেতরে ঢুকেই মেহেদী থেমে গেল।
মেঝেতে টাটকা টায়ারের দাগ।
"কেউ কয়েক ঘণ্টা আগেই এসেছে।"
---
ভেতরের একটি কক্ষে পৌঁছাতেই তারা দেখল, চারদিকে অসংখ্য কাঁচের জার।
প্রতিটিতে মানুষের মস্তিষ্কের ত্রিমাত্রিক মডেল।
দেয়ালে ঝুলছে নিউরনের বিশাল চিত্র।
মাঝখানে একটি আধুনিক কম্পিউটার।
স্ক্রিন এখনও জ্বলছে।
স্ক্রিনে মাত্র একটি বাক্য।
> "স্বাগতম, মেহেদী।"
ঠিক তার নিচে আরেকটি লাইন নিজে থেকেই টাইপ হতে শুরু করল।
> "তুমি অবশেষে সেই জায়গায় এসেছ, যেখানে প্রজেক্ট নির্বাণের জন্ম।"
হঠাৎ ঘরের স্পিকার থেকে পরিচিত সেই বিকৃত কণ্ঠ ভেসে এল।
"তুমি এখনও ভাবছ, আমি খুনি।"
"এটাই তোমার সবচেয়ে বড় ভুল।"
মেহেদী শান্ত গলায় বলল,
"তাহলে তুমি কে?"
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর উত্তর এল।
> "আমি খুন থামানোর চেষ্টা করছি।"
ঘরে উপস্থিত সবাই একে অপরের দিকে তাকাল।
মারুফ পিস্তল শক্ত করে ধরলেন।
কণ্ঠটি আবার বলল,
> "যাদের তুমি খুনি ভাবছ, তারা আসল খেলোয়াড় নয়।"
> "আর যাদের তুমি ভুক্তভোগী ভাবছ..."
এক মুহূর্ত থেমে সে শেষ কথাটি বলল।
> "...তাদের কয়েকজন এখনও জীবিত।"
মেহেদীর বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
প্রথম চারজন নিহত মানুষের কথা তার মাথায় ঘুরতে লাগল।
ফরেনসিক রিপোর্টে মৃত্যু নিশ্চিত ছিল।
লাশও পাওয়া গিয়েছিল।
তবু...
যদি সত্যিই তাদের মধ্যে কেউ জীবিত থাকে, তাহলে এতদিন যাদের কবর দেওয়া হয়েছে... তারা আসলে কারা?
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।