কেস ৪: অঘোরী রুদ্রের ছায়া
পর্ব ৩৪: খামের ভেতরের সমীকরণ
রাত সাড়ে আটটা।
মেহেদীদের গাড়ি এসে থামল শহরের পুরোনো বাজারের এক সরু গলিতে। গলির শেষ মাথায় ছোট্ট একটি সাইনবোর্ড ঝুলছে।
RK Costume Studio
দোকানের শাটার অর্ধেক খোলা।
ভেতরে সব আলো জ্বলছে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, পুরো দোকানে একজন মানুষও নেই।
মারুফ হাত তুলে সবাইকে সতর্ক করলেন।
"কেউ কিছু স্পর্শ করবে না। আগে চারপাশ পরীক্ষা করা হবে।"
দুজন পুলিশ পুরো দোকান ঘুরে দেখল।
কোনো লুকানো মানুষ নেই।
কোনো সংগ্রামের চিহ্নও নেই।
সবকিছু অস্বাভাবিকভাবে গোছানো।
---
কাউন্টারের ওপর একটি সাদা খাম।
লাল কালিতে লেখা।
"গোয়েন্দা মেহেদীর জন্য।"
মারুফ বললেন,
"এটা খুলব?"
মেহেদী মাথা নাড়ল।
"গ্লাভস পরে খুলুন।"
---
খামের ভেতরে মাত্র একটি কাগজ।
তাতে লেখা...
«"যে মানুষ উত্তর খোঁজে, সে প্রশ্নের দাস।
যে মানুষ প্রশ্ন খোঁজে, সে সত্যের কাছাকাছি।"»
নিচে একটি অদ্ভুত সমীকরণ।
17 × 19 = 323
তার নিচে আবার লেখা।
323 = 17
---
সৌরভ বিরক্ত হয়ে বলল,
"এটা আবার কী ধরনের ধাঁধা?"
---
মিতু কিছুক্ষণ কাগজটার দিকে তাকিয়ে রইল।
"সমীকরণটা ভুল নয়।"
"কিন্তু দ্বিতীয় লাইনটা অদ্ভুত।"
---
মেহেদী দোকানের চারপাশে হাঁটতে লাগল।
তার চোখ বারবার কস্টিউমগুলোর দিকে যাচ্ছে।
ডাক্তার।
পুলিশ।
পুরোহিত।
জাদুকর।
সন্ন্যাসী।
রাজা।
ভিখারি।
সব ধরনের পোশাক আছে।
হঠাৎ সে থেমে গেল।
---
"এই দোকানটা শুধু পোশাক বিক্রি করে না।"
শাহীনুর জিজ্ঞেস করল,
"তাহলে?"
"এখানে মানুষ পরিচয় বদলায়।"
---
মারুফ বললেন,
"মানে?"
"একজন মানুষ যখন অন্য কারও পোশাক পরে..."
"...তখন আশেপাশের মানুষ তার কথাও সহজে বিশ্বাস করতে শুরু করে।"
---
মিতু যোগ করল,
"এটাকে সামাজিক মনোবিজ্ঞানে Authority Effect-এর একটি রূপ বলা যায়। মানুষ অনেক সময় পোশাক বা প্রতীকের কারণে কাউকে বেশি বিশ্বাস করে।"
---
ঠিক তখনই সৌরভ একটি আলমারি খুলে চিৎকার করে উঠল।
"এইদিকে আসো!"
সবাই দৌড়ে গেল।
আলমারির ভেতরে ঝুলছে অন্তত বিশটি একই রকম পোশাক।
সবগুলোই...
অঘোরী রুদ্রের।
---
একই কালো চাদর।
একই মালা।
একই মুখোশ।
একই ছাই মাখার সরঞ্জাম।
---
মারুফ অবাক হয়ে বললেন,
"তাহলে..."
"যে কেউ রুদ্র সেজে বের হতে পারে।"
---
মেহেদী ধীরে মাথা নাড়ল।
"এটাই ওদের পরিকল্পনা।"
"মানুষ কোনো ব্যক্তিকে অনুসরণ করছে না।"
"একটি চরিত্রকে অনুসরণ করছে।"
---
ঠিক তখনই মিতু আবার সেই সমীকরণের দিকে তাকাল।
323 = 17
সে হঠাৎ বলল,
"মেহেদী!"
"আমার মনে হয় এটা গণিত না।"
---
মেহেদী কাগজটা হাতে নিল।
"ব্যাখ্যা কর।"
---
"১৭ আর ১৯ গুণ করলে ৩২৩ হয়।"
"কিন্তু নিচে ৩২৩-এর সঙ্গে আবার ১৭ লেখা।"
"মানে হয়তো ৩২৩ থেকে ১৭ বের করতে হবে।"
---
মেহেদী কয়েক সেকেন্ড চুপ রইল।
তারপর হঠাৎ দোকানের দেয়ালে ঝোলানো র্যাকগুলোর দিকে তাকাল।
প্রতিটি র্যাকে নম্বর লেখা।
৩০১...
৩০৮...
৩১৫...
৩২০...
৩২৩...
---
সে দ্রুত ৩২৩ নম্বর র্যাকের সামনে গেল।
র্যাকে মাত্র একটি কাঠের বাক্স।
বাক্স খুলতেই ভেতরে একটি ছোট চাবি।
আর একটি কাগজ।
তাতে লেখা...
Locker - 17
---
সৌরভ উত্তেজিত হয়ে বলল,
"মানে ৩২৩ নম্বর র্যাক থেকে ১৭ নম্বর লকার!"
---
দোকানের পেছনের ঘরে সত্যিই একটি ছোট লকার রুম ছিল।
সারি সারি লকার।
তাদের মধ্যে...
১৭ নম্বর।
---
মারুফ সাবধানে চাবি ঢুকিয়ে লকার খুললেন।
ভেতরে একটি মোটা ফাইল।
ফাইলের ওপর লেখা—
PROJECT MIRROR
---
মেহেদীর বুক ধক করে উঠল।
সে ধীরে ধীরে ফাইল খুলল।
প্রথম পাতায় কয়েকজন মানুষের ছবি।
প্রতিটি ছবির নিচে একটি শব্দ।
পর্যবেক্ষণ।
অনুকরণ।
বিশ্বাস।
নিয়ন্ত্রণ।
---
দ্বিতীয় পাতায় আরও অদ্ভুত তথ্য।
বিভিন্ন পেশার মানুষের ছবি।
শিক্ষক।
পুলিশ।
ডাক্তার।
ইমাম।
সাংবাদিক।
প্রত্যেকের পাশে একটি স্কোর।
---
মিতু নিচু গলায় বলল,
"এগুলো কি লক্ষ্যবস্তু?"
মেহেদী উত্তর দিল,
"না..."
"সম্ভবত প্রভাবশালী মানুষদের তালিকা।"
---
শেষ পাতায় একটি মাত্র বাক্য লেখা ছিল।
«"একজন মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে তাকে বোঝাও।
এক হাজার মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে, যাকে তারা বিশ্বাস করে তাকে নিয়ন্ত্রণ করো।"»
পাতার নিচে আবার সেই প্রতীক।
তিনটি বৃত্ত।
মাঝখানে একটি চোখ।
কিন্তু এবার তার নিচে প্রথমবারের মতো একটি নাম লেখা।
ডিরেক্টর: A. KARIM
মারুফ ধীরে বললেন,
"A. Karim..."
"ড. সামিউল করিম?"
মেহেদী মাথা নাড়ল।
"হয়তো..."
"অথবা আরেকজন করিম।"
"এখনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আসেনি।"
ঠিক তখনই দোকানের ভেতরের পুরোনো ল্যান্ডলাইন ফোনটা নিজে থেকেই বেজে উঠল।
একবার...
দুবার...
তিনবার...
ঘরের সবাই নিঃশব্দ।
মেহেদী ধীরে রিসিভার তুলল।
ওপাশ থেকে একটি শান্ত কণ্ঠ ভেসে এলো।
"অভিনন্দন, মেহেদী।"
"তুমি অবশেষে আমার দরজায় পৌঁছেছ।"
মেহেদী জিজ্ঞেস করল,
"তুমি কে?"
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর উত্তর এলো,
"আমি সেই মানুষ... যে তোমাকে তদন্ত করতে শিখিয়েছিল।"
লাইন কেটে গেল।
মেহেদী স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
কারণ তার মনে হঠাৎ ভেসে উঠল বহু বছর আগের একটি অস্পষ্ট স্মৃতি...
একজন অচেনা মানুষ তাকে ছোটবেলায় বলেছিলেন,
"প্রমাণকে নয়, প্রমাণের অনুপস্থিতিকেও পরীক্ষা করবে।"
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।