কেস ৩: অভিশপ্ত বৃত্ত
পর্ব ২২: দুই মেহেদী
ঘরের ভেতর কেউ কোনো কথা বলল না।
শুধু ECHO সিস্টেমের যান্ত্রিক শব্দ।
বিপ... বিপ... বিপ...
মেহেদীর চোখ আটকে আছে ছবিটার ওপর।
ছবিতে দুটি শিশু।
দুজনের বয়স প্রায় একই।
দুজনের হাতেই একই ধরনের আয়না।
আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার...
দুজনের নামও একই।
মেহেদী হাসান।
---
সৌরভ প্রথমে নীরবতা ভাঙল।
"এটা অসম্ভব।"
"একই পরীক্ষায় একই নামে দুইজন?"
লোকটি শান্তভাবে বলল,
"তুমি যেটাকে অসম্ভব ভাবছ, সেটাই ছিল ECHO-এর মূল উদ্দেশ্য।"
---
মেহেদী তার দিকে তাকাল।
"তুমি কে?"
লোকটি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
"আমার নাম আদনান।"
"আমি ECHO প্রকল্পের নিউরোসায়েন্স টিমে ছিলাম।"
মাহির রাগে বললেন,
"তুমি ছিলে না।"
"তুমি ছিলে সেই মানুষ, যে প্রকল্পকে অন্য পথে নিয়ে গিয়েছিল।"
---
আদনান মৃদু হাসল।
"মানুষ সব সময় ইতিহাসকে সহজ করে দেখতে চায়।"
"কেউ ভালো।"
"কেউ খারাপ।"
"কিন্তু সত্যি হলো..."
"প্রত্যেক আবিষ্কারের ভেতর সম্ভাবনা আর বিপদ দুটোই থাকে।"
---
মেহেদী বলল,
"আমার প্রশ্নের উত্তর দাও।"
"দুইজন মেহেদী কেন?"
আদনান ধীরে ছবিটার দিকে তাকাল।
"কারণ ECHO পরীক্ষা করছিল..."
"...একই পরিবেশে বড় হওয়া দুইটি মস্তিষ্ক কি একই সিদ্ধান্ত নেয়?"
---
মিতু অবাক হয়ে বলল,
"মানে?"
আদনান বলল,
"আমরা দেখতে চেয়েছিলাম..."
"মানুষের ব্যক্তিত্ব কতটা জন্মগত..."
"আর কতটা অভিজ্ঞতার ফল।"
---
মেহেদী বুঝতে পারল।
এটা শুধু স্মৃতি নিয়ে পরীক্ষা ছিল না।
এটা ছিল মানুষ তৈরির চেষ্টা।
---
মাহির কঠিন গলায় বললেন,
"মিথ্যা বলো না।"
"তোমরা শিশুদের ব্যবহার করেছিলে।"
আদনান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
"হ্যাঁ।"
"এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল।"
---
ঘরের সবাই অবাক হলো।
কারণ প্রথমবারের মতো লোকটি নিজের ভুল স্বীকার করল।
---
মেহেদী বলল,
"প্রথম M-7-এর কী হয়েছিল?"
আদনানের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
"সে ব্যর্থ হয়েছিল।"
"কিন্তু যেভাবে তোমরা ভাবছ, সেভাবে নয়।"
"তার বুদ্ধি বা স্মৃতি ব্যর্থ হয়নি।"
"ব্যর্থ হয়েছিল..."
"...তার মানসিক ভারসাম্য।"
---
মেহেদী চুপ করে গেল।
আদনান আবার বলল,
"একজন মানুষের স্মৃতি বদলানো যায়।"
"কিন্তু তার নিজের পরিচয় যদি ভেঙে যায়..."
"...তাহলে সে আর জানে না সে কে।"
---
হঠাৎ কম্পিউটার স্ক্রিনে একটি সতর্কবার্তা এল।
> MEMORY SYNC: 72% COMPLETE
মিতু চমকে উঠল।
"আমাদের হাতে খুব কম সময় আছে।"
---
মেহেদী বলল,
"বন্ধ করার উপায়?"
আদনান তার দিকে তাকাল।
"আছে।"
"কিন্তু তার জন্য তোমাকে একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে।"
"কী সিদ্ধান্ত?"
"তুমি কি তোমার সব স্মৃতি ফিরে পেতে চাও?"
---
মেহেদী অবাক হলো।
"এটা আবার প্রশ্ন কেন?"
আদনান বলল,
"কারণ সব স্মৃতি সুখের হয় না।"
"তোমার ভেতরে এমন কিছু স্মৃতি আছে..."
"...যেগুলো তোমার মস্তিষ্ক নিজেই ভুলে যেতে চেয়েছিল।"
---
মারুফ বললেন,
"ওকে এসব বলার অধিকার তোমার নেই।"
আদনান শান্তভাবে উত্তর দিল,
"কিন্তু সত্য বলার দায়িত্ব আমার আছে।"
---
ঠিক তখনই ECHO সিস্টেমে আরেকটি ফাইল খুলে গেল।
নাম:
M-7 FINAL EVALUATION
মেহেদী তাকাল।
তার হাত ধীরে ধীরে মাউসের দিকে গেল।
সে ফাইলটি খুলল।
প্রথম লাইন:
> Subject M-7 showed abnormal resistance to memory alteration.
দ্বিতীয় লাইন:
> Unlike other subjects, he questioned implanted memories.
তৃতীয় লাইন:
> Reason: Natural investigative behavior.
---
মেহেদী থেমে গেল।
কারণ এই লাইনগুলো পড়ে সে বুঝতে পারল...
তার গোয়েন্দা হওয়ার ইচ্ছা...
তার সবকিছু বিশ্লেষণ করার অভ্যাস...
হয়তো শুধু তার ব্যক্তিত্ব নয়।
হয়তো তার মস্তিষ্কের ওপর করা সেই পুরোনো পরীক্ষার ফলও।
---
হঠাৎ শেষ লাইনে চোখ পড়ল।
> Final Note: Subject M-7 must never learn the identity of Subject M-8.
---
মেহেদীর বুক কেঁপে উঠল।
"M-8?"
সে ধীরে বলল।
"আরেকজন?"
আদনানের মুখ এবার সত্যিই চিন্তিত।
"হ্যাঁ।"
"আর M-8..."
সে থেমে গেল।
মাহির ফিসফিস করে বললেন,
"না..."
"এটা হতে পারে না।"
---
মেহেদী তাকাল।
"আপনি জানেন?"
মাহির চোখ বন্ধ করলেন।
তারপর খুব আস্তে বললেন,
"হ্যাঁ।"
"M-8 ছিল..."
"...ECHO-এর সবচেয়ে সফল পরীক্ষা।"
---
ঠিক তখনই দরজা খুলে গেল।
বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে দেখে সবাই থমকে গেল।
কারণ সে দেখতে...
হুবহু মেহেদীর মতো।
একই মুখ।
একই চোখ।
শুধু পার্থক্য একটাই।
তার চোখে কোনো বিস্ময় নেই।
শুধু ঠান্ডা আত্মবিশ্বাস।
সে বলল,
"অনেকদিন পর দেখা হলো, M-7।"
মেহেদী স্তব্ধ।
লোকটি হাসল।
"আমি M-8।"
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।