কেস ৪: অঘোরী রুদ্রের ছায়া
পর্ব ২৯: মুখোশের আড়ালে
শ্মশান থেকে ফেরার পথে পুরো গাড়িতে অস্বাভাবিক নীরবতা।
সবাই একই বিষয় নিয়ে ভাবছে।
যাকে তারা এতদিন অঘোরী রুদ্র বলে খুঁজছিল, সে যদি আসল রুদ্র না হয়, তাহলে আসল মানুষটা কোথায়?
মারুফ স্টিয়ারিংয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, "একটা বিষয় মাথায় ঢুকছে না। এত বড় একটা নেটওয়ার্ক, এত যন্ত্রপাতি, এত পরিকল্পনা... গ্রামের সাধারণ মানুষ টের পেল না কীভাবে?"
মেহেদী জানালার বাইরে তাকিয়ে উত্তর দিল, "কারণ মানুষ যেটা বিশ্বাস করতে চায়, সেটাই সবচেয়ে সহজে বিশ্বাস করে। কেউ যদি বলে এটা অলৌকিক শক্তি, তাহলে খুব কম মানুষই লুকানো প্রজেক্টর বা রাসায়নিকের কথা ভাববে।"
মিতু ল্যাপটপটা আবার চালু করল।
এবার আগের ভিডিও নেই।
শুধু একটি ফোল্ডার।
নাম...
DON'T OPEN
সৌরভ হেসে বলল, "এই নাম দিলে তো সবাই খুলবে।"
মেহেদী বলল, "এটাও মনোবিজ্ঞানের অংশ। নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি মানুষের কৌতূহল স্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।"
সে ফোল্ডারটি খুলল।
ভেতরে মাত্র একটি অডিও ফাইল।
অডিও চালু হতেই কর্কশ একটি কণ্ঠ শোনা গেল।
"যদি এই রেকর্ড শুনতে পাও... তার মানে Node-03 ধরা পড়েছে।"
"তাতে সমস্যা নেই।"
"কারণ প্রতিটি Node শুধুমাত্র নিজের অংশটাই জানে।"
"কেউ পুরো পরিকল্পনা জানে না।"
অডিও থেমে গেল।
মারুফ ধীরে বললেন, "অর্থাৎ একজন ধরা পড়লেও পুরো সংগঠন ধরা পড়বে না।"
মেহেদী মাথা নাড়ল।
"এটা অনেক গোপন সংগঠনের পরিচিত কৌশল। তথ্যকে ভাগ করে রাখা হয়, যাতে কেউ ধরা পড়লেও পুরো নেটওয়ার্ক ফাঁস না হয়।"
ঠিক তখন মিতু আরেকটি ফাইল খুঁজে পেল।
ফাইলটির নাম...
Village_Map
মানচিত্র খুলতেই সবাই অবাক হয়ে গেল।
চন্দ্রপুর গ্রামের প্রতিটি বাড়ি লাল, হলুদ আর সবুজ রঙে চিহ্নিত।
শাহীনুর বলল, "এগুলো কী?"
মেহেদী জুম করল।
প্রতিটি চিহ্নের পাশে সংখ্যা লেখা।
কেউ ১২।
কেউ ৪৭।
কেউ ৮৯।
কোনোটার পাশে আবার ৯৮।
মিতু কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে বলল, "এগুলো বয়স না।"
"তাহলে?"
"সম্ভবত স্কোর।"
"কিসের স্কোর?"
কেউ উত্তর দিতে পারল না।
হঠাৎ মেহেদীর চোখ পড়ল একটি বাড়ির ওপর।
ওই বাড়ির পাশে লেখা...
100
আর সেই বাড়িটাই আজ রাতে মৃত ব্যক্তির।
মেহেদী চুপ হয়ে গেল।
সে দ্রুত আগের নিহতদের ঠিকানা বের করতে বলল।
মারুফ থানায় ফোন করলেন।
কয়েক মিনিট পর তথ্য এলো।
মিতু একে একে মানচিত্রে মিলিয়ে দেখল।
প্রথম নিহত...
স্কোর ৯৮।
দ্বিতীয়...
৯৯।
তৃতীয়...
১০০।
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে গেল।
সৌরভ নিচু গলায় বলল,
"মানে..."
"ওরা মানুষ বেছে বেছে মারছে?"
মেহেদী মাথা নাড়ল।
"না..."
"তার চেয়েও ভয়ংকর কিছু।"
"ওরা আগে থেকেই মানুষদের পর্যবেক্ষণ করছে।"
ঠিক তখনই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো।
একজন বৃদ্ধ ঢুকলেন।
এই সেই বৃদ্ধ, যিনি আশ্রমের সামনে মেহেদীকে সতর্ক করেছিলেন।
কিন্তু এবার তার মুখে ভয়ের বদলে অপরাধবোধ।
তিনি কাঁপা গলায় বললেন,
"আমি আর চুপ থাকতে পারছি না।"
মারুফ তাকে বসতে বললেন।
বৃদ্ধ বললেন,
"আমি রুদ্রকে চিনি।"
মেহেদী সামনে ঝুঁকে এল।
"আসল রুদ্রকে?"
বৃদ্ধ ধীরে মাথা নাড়লেন।
"হ্যাঁ।"
"কোথায় সে?"
বৃদ্ধ উত্তর দিলেন,
"এই গ্রামে না।"
"তাহলে?"
"সে কখনো এই গ্রামে ছিলই না।"
সবাই একসঙ্গে তার দিকে তাকাল।
বৃদ্ধ বললেন,
"গত পাঁচ বছর ধরে যাকে সবাই অঘোরী রুদ্র ভেবেছে..."
"...সে প্রতি ছয় মাসে বদলে গেছে।"
সৌরভ হতবাক।
"বদলে গেছে মানে?"
"একেক সময় একেকজন মানুষ সেই মুখোশ পরে এসেছে।"
"কিন্তু গ্রামের কেউ বুঝতে পারেনি।"
মেহেদীর চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফুটে উঠল।
"কারণ তারা মুখ চিনত না..."
"...তারা শুধু চরিত্রটাকে চিনত।"
বৃদ্ধ ধীরে পকেট থেকে একটি পুরোনো ছবি বের করলেন।
"এটা আমি লুকিয়ে রেখেছিলাম।"
ছবিতে চারজন মানুষ দাঁড়িয়ে।
তিনজনের মুখে কালো দাগ টেনে মুছে ফেলা হয়েছে।
কিন্তু চতুর্থ ব্যক্তির মুখ স্পষ্ট।
মারুফ ছবিটা হাতে নিয়েই থমকে গেলেন।
"না..."
মেহেদী ছবির দিকে তাকিয়ে বলল,
"আপনি চেনেন?"
মারুফের কণ্ঠ শুকিয়ে গেল।
"চিনি..."
"এটা..."
"...বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ড. সামিউল করিম।"
ঘরের সবাই স্তব্ধ।
কারণ একজন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ যদি এই সংগঠনের সঙ্গে জড়িত থাকে...
তাহলে তারা অপরাধের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ লুকাতে এতদিন সফল হলো কীভাবে, তার ব্যাখ্যা মিলতে শুরু করেছে।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।