কেস ২: স্মৃতি চোর
পর্ব ২৫: পর্যবেক্ষক M-17
রাত তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা।
থানার তদন্তকক্ষের টেবিলে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ফাইল। দেয়ালের সাদা বোর্ডে লাল মার্কার দিয়ে লেখা হয়েছে কয়েকটি নাম।
ASTER
ডিরেক্টর
M-17
প্রজেক্ট নির্বাণ
সবগুলোর মাঝখানে একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন।
মেহেদী অনেকক্ষণ ধরে নিজের ফাইলটির দিকে তাকিয়ে ছিল।
হঠাৎ সে ফাইলের ডান নিচের কোণে খুব ছোট একটি সংখ্যা দেখতে পেল।
Log-73
"সৌরভ, এটা দেখ।"
সৌরভ ফাইলটা বড় করে স্ক্রিনে তুলল।
"মনে হচ্ছে এটা কোনো লগ নম্বর।"
মেহেদী বলল,
"হার্ডডিস্কে Log-73 নামে কিছু আছে কি না খুঁজে দেখ।"
---
পাঁচ মিনিট পরে সৌরভ বলে উঠল,
"পেয়েছি!"
একটি এনক্রিপ্টেড অডিও ফাইল।
ফাইলটি চালু হতেই প্রথমে শুধু স্ট্যাটিক শব্দ।
তারপর একটি পুরুষ কণ্ঠ।
"পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট, লগ নম্বর তিয়াত্তর।"
"বিষয়: মেহেদী হাসান।"
ঘরের সবাই চুপ হয়ে গেল।
কণ্ঠটি বলতে লাগল,
"আজ বিষয়টি স্কুলের বিজ্ঞান মেলায় অংশ নিয়েছে।"
"সমস্যা সমাধানের সময় অন্যদের তুলনায় গড়ে ৪২ শতাংশ দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।"
"মানসিক চাপেও স্থির থেকেছে।"
"ফেজ-৪-এর জন্য সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাচ্ছে।"
রেকর্ডিং শেষ।
কেউ কিছু বলল না।
---
মারুফ ধীরে বললেন,
"মানে... তোকে শুধু অনুসরণ করা হয়নি।"
"তোর আচরণ বিশ্লেষণও করা হয়েছে।"
মেহেদী মাথা নাড়ল।
"আর সেটা বছরের পর বছর।"
---
মিতু হঠাৎ বলল,
"একটা জিনিস খেয়াল করেছ?"
"কী?"
"রিপোর্টে কোথাও 'পরীক্ষা' শব্দ নেই।"
"শুধু 'পর্যবেক্ষণ' লেখা।"
মেহেদী ভ্রু কুঁচকে বলল,
"মানে?"
"মানে হয়তো ওরা তখনও তোকে স্পর্শ করেনি।"
"শুধু দেখছিল।"
---
ঠিক তখনই থানার ডিউটি অফিসার দরজায় নক করলেন।
"স্যার, একজন ভদ্রলোক এসেছেন।"
"কার সঙ্গে দেখা করতে?"
"মেহেদী সাহেবের সঙ্গে।"
মারুফ অবাক হলেন।
"নাম?"
"বলছেন, নাম বলতে পারবেন না।"
---
মারুফ সতর্ক হয়ে গেলেন।
"তাকে ভেতরে আনুন।"
কয়েক সেকেন্ড পর প্রায় সত্তর বছরের এক বৃদ্ধ ভেতরে ঢুকলেন।
সাদা পাঞ্জাবি।
মোটা ফ্রেমের চশমা।
হাতে পুরোনো কাঠের লাঠি।
লোকটিকে দেখে প্রথম নজরে সাধারণ মানুষই মনে হলো।
তিনি সরাসরি মেহেদীর দিকে তাকালেন।
"তুমি কি মেহেদী?"
"জি।"
"তোমার সঙ্গে একা কথা বলতে চাই।"
---
মারুফ সঙ্গে সঙ্গে বললেন,
"অসম্ভব।"
বৃদ্ধ হালকা হেসে বললেন,
"আপনার সন্দেহ করাটা স্বাভাবিক।"
তিনি ধীরে পকেট থেকে একটি ছোট ধাতব ব্যাজ বের করলেন।
ব্যাজে সরকারি প্রতীক।
কিন্তু অনেক পুরোনো।
তার নিচে লেখা,
জাতীয় স্নায়ুবিজ্ঞান গবেষণা পরিষদ
মারুফ ব্যাজটি ভালো করে দেখে বললেন,
"এই প্রতিষ্ঠান তো প্রায় বিশ বছর আগে বন্ধ হয়ে গেছে।"
বৃদ্ধ শান্ত গলায় বললেন,
"হ্যাঁ।"
"বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।"
---
তিনি টেবিলের ওপর একটি খাম রাখলেন।
"এটা তোমার জন্য।"
"এর ভেতরে কী আছে?"
"আমি চলে যাওয়ার পর খুলবে।"
---
মেহেদী প্রশ্ন করল,
"আপনি কে?"
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন,
"আমি এমন একজন..."
"...যে M-17-কে চিনত।"
ঘরের ভেতর যেন হঠাৎ বাতাস থেমে গেল।
মেহেদী উঠে দাঁড়াল।
"তিনি কে?"
বৃদ্ধ ধীরে মাথা নাড়লেন।
"আজ সেটা বলব না।"
"কেন?"
"কারণ এখনও তোমরা প্রস্তুত নও।"
---
এই বলে তিনি দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করলেন।
মারুফ দ্রুত দুই কনস্টেবলকে ইশারা করলেন।
"ভদ্রলোককে বাইরে পর্যন্ত পৌঁছে দাও।"
কিন্তু মাত্র বিশ সেকেন্ড পরই দুই কনস্টেবল দৌড়ে ফিরে এল।
"স্যার!"
"লোকটা নেই!"
"মানে?"
"বাইরে বের হয়েই যেন উধাও হয়ে গেছে!"
মারুফ নিজেই বাইরে গেলেন।
পুরো থানা চত্বর খুঁজেও বৃদ্ধের কোনো চিহ্ন পাওয়া গেল না।
---
ভেতরে ফিরে এসে মেহেদী ধীরে ধীরে খামটি খুলল।
ভেতরে মাত্র একটি পুরোনো ছবি।
ছবিতে চারজন মানুষ দাঁড়িয়ে।
তিনজনের মুখ চেনা।
ড. আরিফ।
ড. রাশেদ।
আর হাসপাতালের সেই নাম-ভুলে-যাওয়া বৃদ্ধ।
চতুর্থ ব্যক্তির মুখ ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে।
কিন্তু ছবির পেছনে হাতে লেখা একটি লাইন এখনও অক্ষত।
> "M-17 কখনও ASTER-এর সদস্য ছিল না। সে আমাদের ভেতরের গুপ্তচর ছিল।"
মেহেদী ছবিটা শক্ত করে ধরে রইল।
এতদিন সে ভেবেছিল M-17 শত্রুপক্ষের লোক।
কিন্তু যদি এই বার্তাটা সত্যি হয়...
তাহলে M-17 হয়তো বছরের পর বছর নিজের জীবন ঝুঁকিতে রেখে ASTER-এর ভেতর থেকে তথ্য পাচার করছিল।
ঠিক তখনই সৌরভ কম্পিউটারের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল।
"মেহেদী!"
"কী হয়েছে?"
"হার্ডডিস্কে নতুন একটা ফাইল নিজে থেকেই খুলে গেছে!"
স্ক্রিনে শুধু একটি বাক্য জ্বলছে।
> "তুমি যদি M-17-কে খুঁজতে চাও, তাহলে আগামীকাল সকাল ৮টায় পুরোনো রেলস্টেশনে একা এসো।"
তার নিচে একটি কাউন্টডাউন শুরু হয়েছে।
১১ ঘণ্টা ১২ মিনিট বাকি।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।