আগুনের বৈশাখ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন, প্রাবন্ধিক
প্রবন্ধ। এপ্রিল ১৩, ২০২৬
বাংলা সাহিত্যে বৈশাখ কেন আগুন হয়ে ফিরে আসে—ফুল হয়ে নয়? প্রশ্নটা সোজা শোনায়। ভেতরটা ততটা সরল নয়। বাঙালি সাধারণত ঋতুকে সাজিয়ে দেখে—রং, গন্ধ, একটু আরাম। বৈশাখ সেই ছবিতে দাগ কাটে। হাওয়া গরম। ধুলো উড়ে। দুপুরে রাস্তায় হাঁটলে চোখ জ্বলে। এই তীব্রতার সাহিত্যিক রূপান্তর চোখে পড়ার মতো। এটা শুধু আবহাওয়া নয়। ভেতরের বদলের চিহ্ন।
চৈত্রের শেষ বিকেলটা মনে করুন, পাঠক। ফ্যানের নিচে বসেও জামা পিঠে লেগে থাকে। হঠাৎ দূরে মেঘ জমে। কালবৈশাখীর আগে বাতাস থেমে যায়। তারপর ঝাপটা। ধুলো, গন্ধ, বিদ্যুতের রেখা। এই দৃশ্যটাই বৈশাখকে বোঝার প্রথম পাঠ।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর কবিতায় বৈশাখ আসে ডাক হয়ে—আরাম দেওয়ার জন্য নয়, ঝেড়ে ফেলার জন্য। তিনি লিখেছিলেন—“দাও ঝড়ের ঝাপটা, দাও দহন-দাহ”—শব্দগুলোতে অনুরোধ আছে, কিন্তু স্বস্তি নেই। এখানে আগুন ধ্বংসের ছবি নয়; অপ্রয়োজনীয় জিনিস সরানোর এক পদ্ধতি। বছরের শেষে যে ক্লান্তি জমে, যে অবসাদ গায়ে লেগে থাকে, সেগুলো কাটানোর জন্যই যেন এই আগমন।
এখানে একটা অবস্থান পরিষ্কার করা দরকার। বাংলা সাহিত্যে আগুন মানে কেবল ভয় নয়। আগুন মানে সরানো। সাফ করা। জায়গা বানানো। রবীন্দ্রনাথের বৈশাখ সেই কাজটাই করে। সে কোমল নয়। দরকারও নেই।
কিন্তু একই আগুন অন্য হাতে অন্য ভাষা পায়।
কাজী নজরুল ইসলাম-এর লেখায় এই দহন ভেতরে থেমে থাকে না। বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর “বিদ্রোহী” কবিতার লাইন—“আমি চির-বিদ্রোহী বীর”—শুধু ব্যক্তিগত ঘোষণা নয়; সময়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ভাষা। এখানে আগুন মানে প্রতিবাদ। অন্যায় ঠেলে সরানোর শক্তি। এই আগুন শুধু মনের নয়, মিছিলেরও। বৈশাখের ঝড় তখন কেবল ঋতুর পরিবর্তন নয়; এক ধরনের অস্বীকৃতি।
দুই কবির ভেতরে পার্থক্য আছে। একজন ভেতরটা পরিষ্কার করেন। অন্যজন বাইরে আঘাত করেন। তবু একটা জায়গায় তারা মিলিত। স্থিরতা তাদের কারও পছন্দ নয়।
এখানে এসে একটা প্রচলিত ধারণা ভাঙতে হয়। সাহিত্য মানেই কোমলতা—এই ভাবনাটা বেশ আরামদায়ক। কিন্তু ঠিক নয়। কিছু সৌন্দর্য আছে, যা অস্বস্তি তৈরি করে। কিছু দৃশ্য আছে, যা আপনাকে শান্ত করে না—বরং নাড়া দেয়। বৈশাখ সেই ধরনের এক প্রতীক। আরাম নেই। চাপ আছে।
তাই বৈশাখ ফুল হয়ে আসে না। ফুল স্থির। বৈশাখ স্থির নয়।
বৈশাখ ভাঙে।
নোটিস দেয় না।
বাস্তবের সঙ্গে মিল খুঁজলে বিষয়টা আরও পরিষ্কার হয়। আমরা বছরের ভেতর জমাই—অভ্যাস, ক্লান্তি, অপ্রয়োজনীয় টান। এগুলো পরত বানায়। জমাট বাঁধে। একসময় এগুলো সরানো ছাড়া উপায় থাকে না। বৈশাখ সেই মুহূর্তের নাম।
এই জায়গায়, পাঠক, প্রশ্নটা তোমার দিকেই ঘুরে আসে। আমরা কি এই দহনকে গ্রহণ করি? নাকি শুধু উৎসবটুকুই দেখি? পান্তা-ইলিশ, মেলা, নতুন জামা—এসব চোখে পড়ে সহজে। কিন্তু এর ভেতরের কঠিন বার্তা আমরা এড়িয়ে যাই। হয়তো ইচ্ছে করেই।
বৈশাখের আগুন তোমাকে কী বলে?
এড়িয়ে যাও? নাকি কাজে লাগাও? পুরনো বোঝা সরাতে?
সব প্রশ্নের এক উত্তর হয় না, পাঠক। বৈশাখকে একভাবে বেঁধে ফেলা কঠিন। এতে শুদ্ধির দিক আছে, বিদ্রোহেরও আছে, আবার শুরুরও আভাস মেলে। এই জটিলতাই তাকে শক্তিশালী করে।
তবু শেষ কথাটা আমি এড়িয়ে যেতে চাই না।
আমার কাছে বৈশাখ এখনও আগুন। পোড়ায়। কিন্তু সেই ছাই থেকেই নতুন কিছু জন্মায়।
তথ্যসূত্র
১. (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) — রবীন্দ্ররচনা, কবিতা: “বৈশাখ”, সংকলন: কল্পনা
২. (কাজী নজরুল ইসলাম) — অগ্নিবীণা, “বিদ্রোহী”, ১৯২১
৩. — গোলাম মুরশিদ
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।