পহেলা বৈশাখ সর্বজনীনতা নাকি নির্মিত এক ধারণা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন, প্রাবন্ধিক
প্রবন্ধ। এপ্রিল ১৪, ২০২৬
“যে উৎসব সবাই সমানভাবে বাঁচে না, তাকে আমরা কত সহজে সর্বজনীন বলে ফেলি?”
প্রশ্নটা যতটা সহজ শোনায়, বাস্তবে ততটা নয়। পহেলা বৈশাখকে আমরা প্রতি বছর ১৪ এপ্রিল এক ধরনের অভিন্ন জাতীয় উৎসব হিসেবে ধরে নিই। শহরের রাস্তায় মঙ্গল শোভাযাত্রা, কোথাও বৈশাখী মেলা, কোথাও পান্তা-ইলিশ—সব মিলিয়ে এক দৃশ্যমান উচ্ছ্বাস তৈরি হয়। এই দৃশ্য দ্রুতই জাতীয় আবহে পরিণত হয়। কিন্তু এই ছবির বাইরে থাকা বাংলাদেশকে ধরতে গেলে বিষয়টা আর সরল থাকে না।
বাংলাদেশে কত মানুষ নববর্ষকে সক্রিয়ভাবে উদযাপন করে—এর কোনো নির্ভরযোগ্য জাতীয় হিসাব নেই। তবে বিভিন্ন সামাজিক পর্যবেক্ষণ এবং একাডেমিক বিশ্লেষণ থেকে যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তাতে বোঝা যায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা মোট জনসংখ্যার তুলনায় তুলনামূলকভাবে সীমিত। অংশগ্রহণও সমানভাবে ছড়ানো নয়; শহরকেন্দ্রিক এলাকাগুলোতেই এর ঘনত্ব বেশি।
গ্রামের অভিজ্ঞতা আবার ভিন্ন। কোথাও হালখাতা হয়, কোথাও লোকমেলা বসে, কোথাও দিনটি কৃষিকাজের হিসাবের সূচনা হিসেবে কাজ করে। ফলে একই উৎসবের একাধিক বাস্তবতা পাশাপাশি অবস্থান করে, যেগুলো একে অপরের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।
এখান থেকেই প্রশ্নটা আরও তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে—যে অভিজ্ঞতা সর্বজনীন নয়, তাকে কীভাবে আমরা অভিন্ন উৎসব বলি?
এই জায়গাতেই “সর্বজনীনতা” শব্দটা একটি বর্ণনা না থেকে একটি নির্মাণে পরিণত হয়। রাষ্ট্রীয় ও সাংস্কৃতিক বয়ান পহেলা বৈশাখকে ধীরে ধীরে এমন এক প্রতীকে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে ধর্ম, শ্রেণি বা অঞ্চলের পার্থক্যকে অদৃশ্য ধরে নেওয়া হয়। আশির দশকের পর থেকে, বিশেষ করে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের সময় থেকে, এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়; বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আন্দোলন এবং রাষ্ট্রীয় সমর্থনের ভেতর দিয়ে নববর্ষ জাতীয় পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে (Ahmed, 1991; Islam, 2005)।
কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা সবসময় এই কাঠামোর সঙ্গে মেলে না।
একটি বড় অংশের মানুষের কাছে এই দিনটি খুব সাধারণ—ছুটি, বাজারের কাজ, কৃষিকাজের হিসাব বা নিছক দৈনন্দিনতার আরেকটি সকাল। অন্যদিকে একটি অংশের কাছে এটি সাংস্কৃতিক প্রকাশের দিন; যেখানে শোভাযাত্রা, সংগীত, রঙ এবং প্রতীকী আচারের মাধ্যমে পরিচয় প্রকাশ পায়।
দুই ধরনের বাস্তবতা একই সমাজে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু ভাষা একটাই—“সর্বজনীন উৎসব”।
এটা কি ভুল? সরলভাবে বললে না, পুরোপুরি নয়।
কারণ এখানে সর্বজনীনতা সংখ্যার হিসাব নয়; এটি একটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আকাঙ্ক্ষা। সবাইকে একই প্রতীকের ভেতরে আনার চেষ্টা। তবে সেই অন্তর্ভুক্তি বাস্তবে অসম।
এই প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে ২০১৬ সালে, যখন জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা মঙ্গল শোভাযাত্রাকে মানবতার অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এই স্বীকৃতি পহেলা বৈশাখকে আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক পরিসরে আরও দৃশ্যমান করে তোলে। আপাতদৃষ্টে এটি বৈচিত্র্যকে একত্র করার স্বীকৃতি। কিন্তু বাস্তবে শহুরে সাংস্কৃতিক বয়ানই আন্তর্জাতিক বৈধতা পেয়েছে—এমনটাই বেশি চোখে পড়ে (UNESCO, 2016)।
এখানে প্রশ্নটা তাই ঝুলে থাকে না; বরং একটি অবস্থান দাঁড়িয়ে যায়।
দেখে মনে হয়, বৈচিত্র্য একত্র হওয়ার চেয়ে একটি নির্দিষ্ট রূপই বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
শহরের বৈশাখ এই নির্মাণকে আরও প্রকাশ্য করে। রঙ, মুখোশ, মিছিল, সংগীত—সব মিলিয়ে এটি একটি সাংস্কৃতিক ভাষা তৈরি করে। অন্যদিকে গ্রামের বৈশাখ অনেক বেশি নীরব এবং জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। সেখানে উৎসব আলাদা কোনো দৃশ্য নয়, বরং জীবনের ভেতরেই মিশে থাকে।
এই দুই বাস্তবতার ব্যবধান অস্বীকার করা কঠিন।
তবু একটি জায়গায় তারা মিলেও যায়। পহেলা বৈশাখ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সক্রিয় উৎসব না হলেও এটি একটি জাতীয় কল্পনার জায়গা তৈরি করে। মানুষকে বাধ্য করে কিছু মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করাতে—আমরা কে, আমাদের সংস্কৃতি কী, এই পরিচয়ের সীমা কোথায়।
এই প্রশ্নগুলোই একে নিছক উৎসবের বাইরে নিয়ে গিয়ে পরিচয়ের আলোচনায় পরিণত করে।
তবে এই নির্মাণের ভেতরে একটি অস্বস্তি থেকেই যায়। যখন কোনো উৎসবকে সর্বজনীন বলা হয়, অথচ বাস্তবে অংশগ্রহণ অসম, তখন তা অদৃশ্য বিভাজন তৈরি করে। শহর ও গ্রামের পার্থক্য, কেন্দ্র ও প্রান্ত, প্রকাশ্য ও প্রায় অদৃশ্য সংস্কৃতি—সবই নীরবে এই ধারণার ভেতরে ঢুকে পড়ে।
শেষ পর্যন্ত সত্যটা সম্ভবত আরও নির্দিষ্টভাবে বলা যায়—পহেলা বৈশাখ সবাই পালন করে না, কিন্তু সবাই কোনো না কোনোভাবে এর সঙ্গে যুক্ত। কেউ স্মৃতিতে, কেউ নীরব অভিজ্ঞতায়, কেউ ছুটির কাঠামোয়, আর কেউ আবার প্রায় সম্পূর্ণ বাইরে থেকে।
এবং এই যুক্ত থাকা-না-থাকার মাঝামাঝি অবস্থানই “সর্বজনীনতা” শব্দটাকে একই সঙ্গে অর্থবহ এবং প্রশ্নবিদ্ধ করে রাখে।
তথ্যসূত্র
Ahmed, Rafiuddin (1991). The Bengal Muslims 1871–1906: A Quest for Identity
Islam, Sirajul (2005). History of Bangladesh (Cultural Sections)
UNESCO (2016). Intangible Cultural Heritage: Mangal Shobhajatra
The Daily Star. 2023. “Pahela Baishakh and the Urban Cultural Space”. 14 April.
Dhaka Tribune. 2023. “How Dhaka Celebrates Bangla New Year”. 14 April.
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।