পান্তা ইলিশ ঐতিহ্য না পরিচয়ের নির্মাণ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন, প্রাবন্ধিক
প্রবন্ধ। এপ্রিল ১৪, ২০২৬
“আমরা যা উদযাপন করি, তা কি সত্যিই অতীত থেকে আসে, নাকি আমরা নিজেরাই তাকে অতীতের রঙে রাঙিয়ে নিই?”
বাংলা নববর্ষের সকালে এখন একটি দৃশ্য প্রায় অবধারিত—সাদা-লাল পোশাকে মানুষ, চারদিকে উৎসবের আমেজ, আর সামনে পান্তা ভাতের সঙ্গে ইলিশ মাছ। এই ছবিটি এতটাই পরিচিত হয়ে গেছে যে অনেকেই একে বাঙালির শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্য হিসেবে ধরে নেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই ধারণা কি সত্যিই ইতিহাসের গভীরে প্রোথিত, নাকি এটি আধুনিক সময়ের তৈরি একটি সাংস্কৃতিক নির্মাণ?
এই প্রবন্ধের মূল অবস্থান হলো—পান্তা ইলিশ কোনো প্রাচীন ঐতিহ্য নয়, বরং আধুনিক নগর সংস্কৃতির নির্মিত পরিচয়ের একটি প্রতীকী রূপ।
ঐতিহ্য শব্দটি নিজেই স্থির নয়। এটি সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়, নতুন অর্থ পায় এবং কখনো কখনো সচেতনভাবে নির্মিতও হয়। একে বলা যায় একটি নির্মিত ঐতিহ্য, যা সমাজের প্রয়োজন, আবেগ এবং আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান থেকে গড়ে ওঠে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সব নির্মাণই “মিথ্যা” নয়; কিছু নির্মাণ সময়ের সঙ্গে সামাজিক স্বীকৃতি পেয়ে ঐতিহ্যের মর্যাদা অর্জন করে।
ঐতিহাসিকভাবে গ্রামীণ বাংলার খাদ্যসংস্কৃতিতে “পান্তা ভাত” ছিল মূলত শ্রমজীবী ও দরিদ্র মানুষের দৈনন্দিন খাবার। আগের দিনের ভাত পানি দিয়ে ভিজিয়ে রেখে সকালে খাওয়া—এটি ছিল অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং গরম আবহাওয়ায় শরীর ঠান্ডা রাখার একটি কার্যকর পদ্ধতি। এতে উৎসবের কোনো নির্দিষ্ট প্রতীকী অবস্থান ছিল না।
অন্যদিকে ইলিশ মাছ ছিল নদীমাতৃক বাংলার একটি মূল্যবান ও মৌসুমি খাদ্য। এটি সব শ্রেণির মানুষের দৈনন্দিন খাদ্য ছিল না। ফলে পান্তা ও ইলিশকে একত্রে নববর্ষের নির্দিষ্ট ঐতিহ্য হিসেবে উপস্থাপন করার শক্ত ঐতিহাসিক ভিত্তি পাওয়া যায় না।
তবে এখানেই আলোচনাটা থেমে যায় না।
একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, বাঙালির জলভিত্তিক কৃষিজীবী জীবনে পান্তা ভাত দীর্ঘদিনের খাদ্যচর্চার অংশ। সেই অর্থে এটি সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা বহন করে। কিন্তু ধারাবাহিকতা থাকলেই সেটি উৎসব-প্রতীকে পরিণত হয় না—এই পার্থক্যটাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৯০-এর দশক থেকে দৈনিক সংবাদপত্র ও সাংস্কৃতিক প্রতিবেদনে পান্তা-ইলিশকে নববর্ষের প্রতীক হিসেবে ব্যাপকভাবে দেখা যেতে শুরু করে। এর নির্দিষ্ট সূচনা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও, এটি স্পষ্ট যে শহুরে মধ্যবিত্ত সংস্কৃতি এবং গণমাধ্যম এই প্রতীক নির্মাণে বড় ভূমিকা রেখেছে।
১৯৬৭ সাল থেকে ছায়ানট রমনা বটমূলে নববর্ষ উদযাপন শুরু করলেও, খাদ্য-প্রতীক হিসেবে পান্তা ইলিশ পরে যুক্ত হয়। এই সময় থেকেই এটি একটি দৃশ্যমান সাংস্কৃতিক প্রতীকে পরিণত হয়—যেখানে গ্রামীণ সরলতা এবং শহুরে উৎসববোধ একসঙ্গে মিশে যায়।
এখানেই খাদ্য শুধু খাদ্য থাকে না; এটি পরিচয়ের চিহ্নে পরিণত হয়। অর্জুন আপাদুরাই–এর মতে, খাদ্যাভ্যাস সামাজিক পরিচয় নির্মাণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
তবে এই ব্যাখ্যাকে একমাত্র সত্য হিসেবে ধরা যাবে না। কারণ একদল গবেষকের মতে, পান্তা ইলিশ জলভিত্তিক কৃষিজীবী সংস্কৃতির ধারাবাহিক প্রতীক। কিন্তু এই যুক্তির সীমাবদ্ধতা হলো—ধারাবাহিকতা থাকলেই সেটি উৎসব-প্রতীকে পরিণত হয় না। উৎসব-প্রতীক তৈরি হয় সামাজিক স্বীকৃতি, মিডিয়া প্রচার এবং নগর সংস্কৃতির রুচিনির্ধারণের মাধ্যমে।
অন্যদিকে, পুরো বিষয়টিকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করাও যুক্তিসংগত নয়। পান্তা ইলিশ কোনো ইতিহাসবিচ্ছিন্ন কৃত্রিম আয়োজন নয়; এটি একটি সময়নির্ভর সাংস্কৃতিক নির্মাণ, যা সমাজ গ্রহণ করেছে এবং অর্থ দিয়েছে।
আমরা যাকে ঐতিহ্য বলি, তা অনেক সময় জন্মগত নয়—বরং বাছাইকৃত এবং পুনর্গঠিত।
ঐতিহ্য কি সত্যিই সময় থেকে আসে, নাকি সময়ের ভেতর দিয়ে তৈরি হয়—এই প্রশ্নই আসলে পুরো বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।
শেষ পর্যন্ত পান্তা ইলিশ তাই না পুরোপুরি ইতিহাস, না পুরোপুরি কৃত্রিমতা। এটি একটি মধ্যবর্তী সাংস্কৃতিক রূপ, যা বাঙালির আধুনিক আত্মপরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে।
যা একসময় ছিল প্রয়োজনের খাবার, তা আজ রূপ নিয়েছে পরিচয়ের প্রতীকে।
তথ্যসূত্র
১. , , Cambridge University Press, 1983।
২. , বাংলার লোকজ সংস্কৃতি, ঢাকা, ২০১৫।
৩. , “Gastro-Politics in Hindu South Asia”, American Ethnologist, 1981।
৪. , Routledge, 2011।
৫. প্রথম আলো, নববর্ষ ও বৈশাখ বিশেষ সংখ্যা, ১৯৯৫–১৯৯৯; ভোরের কাগজ, নববর্ষ বিশেষ প্রতিবেদন, ১৯৯৩–১৯৯৮।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।