অনেকের ধারণা, قلب (কলব) এবং فؤاد (ফু'আদ) একই অর্থের দুটি শব্দ। কারণ উভয়েরই বাংলা অর্থ "হৃদয়"। কিন্তু কোরআনের শব্দচয়ন লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এই দুটি শব্দ কখনোই বিনা কারণে একে অপরের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়নি। প্রতিটি শব্দ নির্দিষ্ট মানসিক অবস্থাকে প্রকাশ করে।
قلب (কলব) শব্দটি সাধারণত মানুষের চিন্তা, উপলব্ধি, ঈমান, সিদ্ধান্ত এবং বিবেকের কেন্দ্র বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ যে হৃদয় সত্যকে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করে, চিন্তা করে এবং উপলব্ধি করে।
আল্লাহ বলেন,
> أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَىٰ قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا
"তারা কি কোরআন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে না? নাকি তাদের হৃদয়ের ওপর তালা লাগানো আছে?"
(সূরা মুহাম্মাদ, ৪৭:২৪)
এখানে قلوب (হৃদয়সমূহ) বলতে অনুভূতির নয়, বরং চিন্তা ও উপলব্ধির কেন্দ্রকে বোঝানো হয়েছে।
অন্যদিকে فؤاد (ফু'আদ) শব্দটি এমন হৃদয়কে বোঝায়, যা প্রবল আবেগ, ব্যথা, উদ্বেগ বা গভীর অনুভূতিতে আলোড়িত।
এর সবচেয়ে সুন্দর উদাহরণ হযরত মূসা (আ.)-এর মা। যখন তিনি নিজের শিশুপুত্রকে নদীতে ভাসিয়ে দিলেন, তখন আল্লাহ বলেন,
> وَأَصْبَحَ فُؤَادُ أُمِّ مُوسَىٰ فَارِغًا
"মূসার মায়ের হৃদয় শূন্য হয়ে গেল।"
(সূরা আল-কাসাস, ২৮:১০)
এখানে قلب নয়, فؤاد ব্যবহৃত হয়েছে। কারণ এটি ছিল এক মায়ের তীব্র আবেগ, উৎকণ্ঠা ও মানসিক যন্ত্রণার মুহূর্ত। এমন অবস্থায় فؤاد শব্দটিই সবচেয়ে উপযুক্ত।
অর্থাৎ, কোরআন যখন চিন্তা, উপলব্ধি ও ঈমানের কথা বলে, তখন قلب ব্যবহার করে। আর যখন প্রবল আবেগ, দুঃখ, ভালোবাসা বা মানসিক অস্থিরতার কথা বলে, তখন فؤاد ব্যবহার করে।
এটি এমন একটি সূক্ষ্ম ভাষাগত পার্থক্য, যা অনুবাদে সাধারণত হারিয়ে যায়। বাংলায় আমরা উভয় ক্ষেত্রেই শুধু "হৃদয়" লিখি। কিন্তু আরবি মূল পাঠে শব্দ দুটি আলাদা অর্থের স্তর বহন করে।
কোরআনের এই শব্দ নির্বাচন প্রমাণ করে, এর প্রতিটি শব্দ অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বাছাই করা হয়েছে। একই অর্থের কাছাকাছি দুটি শব্দও সেখানে উদ্দেশ্যহীনভাবে ব্যবহৃত হয়নি। ভাষার এই সূক্ষ্মতা কোরআনের অন্যতম বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।